গরমে পুড়ে যেভাবে শেষ হয়ে গেল কানাডার একটি গ্রাম

শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২১

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জুন মাসের শেষের দিকে কানাডায় প্রচণ্ড গরমের কারণে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ছোট্ট একটি গ্রাম উঠে এসেছিল আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে। সে সময় এমন গরম পড়েছিল যা কানাডার ইতিহাসে কখনো হয়নি। লিটন নামের ওই গ্রামে তাপমাত্রা পৌঁছেছিল ৪৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

সেখানকার একজন বাসিন্দা মেরিয়েল বারবার বলেন, ‘এত গরম যে ভাষায় বোঝানোর মতো নয়। আমি ভোর ৪ টায় উঠে যাচ্ছিলাম বাইরের কাজগুলো সেরে ফেলার জন্য। কারণ এত গরম যে দুপুর বেলায় কাজ করার কোনো উপায় ছিল না।’

গ্রামের অন্যান্য অধিবাসীরাও ঠাণ্ডা থাকার জন্য ঘরের ভেতরেই অবস্থান করছিল।

রাস্তাঘাট ছিল নীরব, এমনকি লিটনের মতো একটি গ্রামের তুলনায়ও। এই গ্রামে বাস করত ২৫০ জন লোক। আশপাশের রিজার্ভেও বাস করত আরও প্রায় এক হাজারের মতো আদিবাসী। অপূর্ব প্রাকৃতিক নিসর্গের এই এলাকাটি ভ্যানকুভার থেকে ১৬২ মাইল উত্তর-পূবে। সেখানে থম্পসন এবং ফ্রেসার – এই দুটো নদী একত্রে মিলিত হয়েছে।

বাসিন্দারা বলছেন, এই গ্রামের লোকেরা একত্রে মিলেমিশে বসবাস করত। তাদের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এটা এমন এক জায়গা, একজন বলছিলেন, যেখানে ‘প্রত্যেকেই প্রত্যেককে মোটামুটি চিনত।’

বারবার প্রায় এক দশক আগে এই এলাকায় এসে বসবাস করতে শুরু করেন। এখানকার লোকজনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তার খুব একটা দেরি হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটা জায়গা খুঁজে পেলাম যেখানে এই লোকগুলো থাকত। গ্রামটি যেন আমাকে নানা ভাবে স্বাগত জানাল। আমি তাদের বলি একটি পরিবার।’

তিনি বলছিলেন, যেদিন আগুন লাগে, ৩০ জুন, সেদিন তীব্র গরম পড়েছিল, সেই সঙ্গে ছিল ‘ভয়াবহ’ রকমের বাতাস।

সারাদিনের কাজের শেষে তিনি যখন বাড়িতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সে সময় তিনি শহরের এক জায়গায় কিছু কালো ধোঁয়া উপরের দিকে উঠতে দেখেন।

গ্রীষ্মকালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়াতে আগুন লাগার ঘটনা সাধারণ একটি বিষয়- এ রকমটাই মনে মনে ভাবছিলেন মিস বারবার। তিনি ধরে নিয়েছিলেন খুব শীঘ্রই এই আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হবে।

কাজের গাড়িটি রেখে দিয়ে তিনি যখন শহরের দিকে যাচ্ছিলেন, তিনি দেখলেন দমকল বাহিনীর একটি গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে, ফ্ল্যাশিং লাইট জ্বালিয়ে পাশ দিয়ে ছুটে গেল।

আগুন নেভানোর গাড়িটি রাস্তায় আড়াআড়ি করে রাখা হল। ফলে মিজ বারবারের শহরে যাওয়ার রাস্তাটি বন্ধ হয়ে গেল। অগ্নিনির্বাপক দলের প্রধান তাকে সতর্ক করে দিয়ে জানালেন যে লিটনে আগুন লেগেছে।

‘আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না তিনি কী বলছেন- আসার পথে আমি আগুন দেখেছি, কিন্তু সেটা সবখানে ছড়িয়ে পড়েনি, আগুনটা ছিল একটি মাত্র স্থানে,’ বলেন তিনি।

গাড়িটি তিনি হাইওয়ের একপাশে রেখে বাসিন্দাদের একটি জটলার সাথে দাঁড়িয়ে রইলেন।

গ্রামের টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আগে মিজ বারবার দুটি ফোন করেছিলেন। প্রথম ফোনটি তিনি করেছিলেন তার বয়স্ক কিছু বন্ধু বান্ধব নিরাপদ আছে কীনা সেটা নিশ্চিত হতে। অন্য ফোনটি করেছিলেন নিজের বাড়িওয়ালাকে, তার বাড়ি থেকে বিড়ালটিকে বের করে নেওয়ার জন্য। প্রচণ্ড গরমের কারণে তিনি বিড়ালটিকে ঘরের ভেতরে রেখে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

পরের ৬ ঘণ্টার মধ্যে তিনি খবরে দেখলেন যে তার শহর পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।

লিটনের আরও একজন বাসিন্দা জেমস। তিনি মাত্র স্নান শেষ করে টেলিভিশন দেখছিলেন। এ সময় একটি লোক দৌড়ে তার ঘরের ভেতরে ঢুকে চিৎকার করে বলল, ‘তোমাকে এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে। লিটনে আগুন জ্বলছে।’

জেমস, ৭৬, এক দৌড়ে তার শোওয়ার ঘরে চলে গেলেন। খুব দ্রুত পোশাক বদলে নিলেন তিনি। যাতে তিনি যে কোনো সময়ে বের হয়ে যেতে পারেন এ জন্য আগে থেকেই তার ছোট্ট একটা ব্যাগ গোছানো ছিল। খুব দ্রুত তিনি তার পার্সটা নিলেন, নিলেন গাড়ির চাবি, ফোন এবং মাথার টুপি। তখনও লোকটা তাকে চিৎকার করে বলে যাচ্ছিলেন অবিলম্বে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য।

‘যেই আমি ঘরের বাইরে পা রেখেছি, আমি দেখতে পেলাম গরম ছাইয়ের ভয়ঙ্কর ঝড়,’ তিনি বললেন।

এক লাফে গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লেন তিনি। স্টিয়ারিং হুইল এত গরম ছিল যে তার হাত পুড়ে গেল।

‘আমি গাড়ি চালাতে শুরু করলাম। চলে গেলাম বাড়ি থেকে একটু দূরে। সামান্য কিছু মিটার দূরে আমি একটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেলাম। আমার গাড়ির প্রোপেন গ্যাস ট্যাঙ্ক উড়ে গেছে।’

জেমস তখন গাড়ি নিয়ে ওই এলাকার বাইরে চলে গেলেন। তবে গাড়ি চালাতে তার বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। গাড়ি কোথায় কতোটুকু ঘোরাতে হবে সেটা বুঝতে পারছিলেন না। ছাই-এর কারণে তিনি সবকিছু পরিষ্কার দেখতেও পাচ্ছিলেন না।

তিনি যখন একটি নিরাপদ জায়গায় গিয়ে পৌঁছালেন, একজন নার্স তার হাতে, পায়ে ও মুখে ক্রিম লাগিয়ে দিলেন। গরম ছাইয়ের কারণে তার শরীরের এসব জায়গা পুড়ে গেছে।

আরেক বাসিন্দা ননি ম্যাকক্যান ফ্রেসার নদীর একপাশ থেকে দেখছিলেন ভয়াবহ আগুন কিভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

তার একজন প্রতিবেশীর কাছ থেকে তিনি একটি ফোন কল পান বিকাল প্রায় পাঁচটার দিকে। ওই প্রতিবেশী তার কাছে জানতে চাইছিলেন লিটনের কাছে যে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে তার উৎস সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন কীনা।

তার একজন বন্ধু তখন তাকে জানাল যে শহরে আগুন লেগেছে। এবং তার কাছে জানতে চাইলেন পানির স্থানীয় একটি পাম্প স্টেশন চালু করার ব্যাপারে তিনি ও তার স্বামী মিলে সাহায্য করতে পারবেন কীনা।

‘বাড়িঘর সব আগুনে পুড়ে যাচ্ছে- এটা দেখে আমরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। চেনা লোকজনের বাড়িঘর পুড়ে যাচ্ছে। ওই পাম্পটি চালু করতে আমরা ব্যর্থ হলাম। ধোঁয়া এতো তীব্র হয়ে উঠল যে একসময় আমরা ফিরে গেলাম,’ বলেন তিনি।

সে সময় তার যেসব অনুভূতি হয়েছিল সেগুলো তিনি স্মরণ করছিলেন। বলছিলেন, ‘আমি যা দেখছিলাম সেটা ছিল চরম ভয়ের, যে বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটছে সেটা প্রচণ্ড কষ্টের এবং উদ্বেগের। এর মধ্যেও আমি আশা করছিলাম যে সবাই নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে পারবে।’

সাহায্য করতে না পেরে তিনি বসে পড়লেন এবং নদীর একপাশ থেকে দেখলেন আরেক পাশে কিভাবে ‘একটার পর একটা ভবনে আগুন লাগছে’ এবং ওপর থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে আগুনের ওপর পানি ফেলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনো উপায় ছিল না। ফলে অনেক প্রশ্নের উত্তর জানতাম না, এমনকি প্রত্যেকে নিরাপদে সরে যেতে পেরেছে কিনা সেটিও আমরা জানতে পারিনি।’

ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বাসিন্দারাও লিটনে তাদের পরিবারের সদস্যদের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তারাও অপেক্ষা করছিলেন সবশেষ খবরের জন্য।

ভের্না মিলার নামের আরেক বাসিন্দা আগুনের কথা জানতে পারেন তার স্বামীর কাছ থেকে। তার স্বামী জেনেছেন খবরের একটি রিপোর্ট থেকে।

তার এক বড় বোন লিটনে বসবাস করছিলেন। এই দম্পতির দেখাও হয়েছিল এই গ্রামে। তাদের এক কাজিন, যিনি ৩০ মিনিট দূরত্বে থাকেন, তিনিও তাকে উদ্ধার করার জন্য ওই গ্রামের দিকে রওনা দিলেন।

কাজিন যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছালেন, তখনও মিজ মিলারের বোন জানতেন না যে গ্রামটি আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

‘আমাদের কাজিন বলছিল: তোমার জিনিসপত্র সাথে নাও। আমাদের হাতে সময় নেই।’ জবাবে আমার বোন বলছিলেন, ‘আমার জুতা খুঁজে বের করতে হবে।’

একসময় তারা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। তার পর পুরো বাড়ি, এবং বাড়িতে আরও যেসব জিনিসপত্র ছিল, সারাজীবন ধরে যেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে, সব এক মুহূর্তে পুড়ে শেষ হয়ে গেল।

হাইওয়ের পাশে কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর মিজ বারবার তার কিছু বন্ধুর সঙ্গে তাদের বাড়িতে চলে গেলেন। এই বাড়িটি আগুনের হাত থেকে বেঁচে গেছে। তার পরের কয়েকদিন তিনি সেখানেই ছিলেন।

তাদের বাড়িতে পানি ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না। রান্নার জন্য প্রোপেন গ্যাসের স্টোভ ব্যবহার করা হতো।

‘যেহেতু আমি খুব জেদি আর একগুঁয়ে ছিলাম…কর্মকর্তাদের বলতে লাগলাম যে তোমরা আমাকে আমার বিড়ালটা এনে দাও, আমি চলে যাব। কিন্তু এই লোকেরা আমাকে বলতে চায় নি যে আমার বাড়ি পুড়ে গেছে এবং বিড়ালটা বাড়ির ভেতরেই ছিল,’ তিনি বলেন।

‘আগুন লাগার দুদিন পরেও আমি সেটিকে খুঁজে পাইনি। মনে হয় আমি তার পরের দিন সেখান থেকে চলে যাই। একটা বিড়ালের জন্য নিজেকে এত বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিলাম।’

পার্লামেন্টের স্থানীয় একজন সদস্য ব্র্যাড ভিসের মতে পুরো লিটনে আগুন লাগতে ১৫ মিনিটের মতো সময় লেগেছিল। গ্রামের ৯০ শতাংশ এবং তার আশপাশের বহু রিজার্ভ অগ্নিকাণ্ডে সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।

এক দম্পতি, যাদের বয়স ছিল ৬০-এর ঘরে, তারা আগুনে মারা গেছে।

ব্র্যাড ভিস এই অগ্নিকাণ্ডকে এক ‘নজিরবিহীন পরিস্থিতি’ বলে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এমনকি পৃথিবীর এই অংশেও, যেখানে দাবানলের মতো ঘটনা প্রতিবছরই ঘটে। দাবানল মোকাবেলায় যারা কাজ করেন তাদের কেউ কেউ আমাকে বলেছেন লিটন গ্রামটা যেভাবে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে, সেভাবে আর কোনো এলাকাকে তারা কখনো পুড়তে দেখেন নি।’

কানাডাতে ২০ সেপ্টেম্বরে যে কেন্দ্রীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে।

লিটন নামের গ্রামটিতে অগ্নিকাণ্ডের আসল কারণ কী – সেটা খুঁজে বের করতে তদন্ত চলছে। কিন্তু এর মধ্যেই এই গ্রামটি অনেকের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের যেসব ঝুঁকি রয়েছে তার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তাপপ্রবাহের প্রবণতা ক্রমশই বাড়ছে এবং গরমও আরো চরম রূপ ধারণ করছে। মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই এরকম হচ্ছে এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বেড়ে যাচ্ছে দাবানলের ঝুঁকিও।

আবহাওয়াবিদরা ইতোমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছেন যে পৃথিবীর তাপমাত্রা শিল্পযুগ শুরু হওয়ার আগে যত ছিল, বর্তমান তাপমাত্রা তার চেয়েও ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার যদি কার্বন নির্গমন কমানোর ব্যাপারে পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে তাপমাত্রা আরো বাড়তেই থাকবে।

অগ্নিকাণ্ডের কারণে লিটনে যারা স্থানচ্যুত হয়েছেন তারা এখন গ্রামটিকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তারা এমনভাবে বাড়িঘর তৈরির চেষ্টা করছেন যাতে গ্রামটি এধরনের অগ্নিকাণ্ড এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারে। জ্বালানীর জন্য তারা বাইরের উৎসের উপরেও কম নির্ভর করতে চান।

মিজ বারবার বর্তমানে তার ভ্যানগাড়িতে বসবাস করছেন। তার পুড়ে যাওয়া বাড়ি থেকে কিছু কিছু জিনিস উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এসবের মধ্যে রয়েছে একটি ভাস্কর্য, তার গহনার বক্স। এছাড়া বাকি সবকিছুই পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে।

‘আমার একটা সন্তান ছিল। সে মারা গেছে। তার সব স্মৃতি আমি সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম। আমার মা এবং অন্যান্যদেরও কিছু জিনিস ছিল। আমার ও অন্যদের কিছু শিল্পকর্ম, যা আমি গত কয়েক বছর ধরে সংগ্রহ করেছি, সেগুলো সবই পুড়ে গেছে। এগুলোর বিকল্প কিছু নেই,’ বলেন তিনি।

এ রকম তীব্র শোকের পরেও তিনিসহ গ্রামের অন্যান্য বাসিন্দারা বলছেন যে তারা এখন তাদের গ্রামের ভবিষ্যতের দিকেই নজর দিচ্ছেন।
খবর বিবিসি বাংলা