আজিমপুর মাতৃসদনে লুটপাট : ফাঁসছেন ২ ডিজিসহ ২৭ জন

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১

ঢাকা : রেজিস্ট্রেশন না করার অজুহাতে প্রসব যন্ত্রণায় কাতর ছিন্নমূল নারী পারভীনকে হাসপাতাল থেকে রাস্তায় বের করে দেওয়ার ঘটনাটি মনে আছে? ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর আজিমপুরের মাতৃসদন থেকে বের করে দেওয়ার পর যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রাস্তায় সন্তান প্রসব করেন ওই নারী। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

অথচ আজিমপুরের মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নামের বিশেষায়িত এ হাসপাতালে নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা। পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের আওতায় হাসপাতালটি ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে আধুনিক চিকিৎসাসেবার সুবিধা নিয়ে ২০০০ সালে নতুন করে যাত্রা শুরু হয়। আর এ হাসপাতালটিতেই ঘটেছে নির্দয় আলোচিত ঘটনা।

শুধু ওষুধ নয়, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও প্যাথলজি আইটেম ক্রয়ের নামে সেখানে চলেছে হরিলুট। বাজার দরের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে হয়েছে কেনাকাটা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও তদন্তে মিলেছে প্রমাণও।

ওষুধ-সরঞ্জাম ক্রয়ের নামে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে ১৭ জন চিকিৎসক ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতরের আট জনকে আসামি চারটি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় প্রধান আসামি করা হয় আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক ইসরাত জাহানকে।

মামলাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে দুদক। এতে নতুন করে দুই ভিআইপি আসামিকে সংযুক্ত করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিতে যাচ্ছে তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মো. আবু বকর সিদ্দিক। তদন্তে আসা আসামিদের মধ্যে রয়েছে- পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. কাজী মোস্তফা সারোয়ার ও মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন। শিগগিরই নতুন দুই আসামিসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে চার মামলায় চার্জশিট কমিশন থেকে অনুমোদন হতে যাচ্ছে বলে ঊর্ধ্বতন একটি সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, মামলাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই। চার্জশিট অনুমোদন হলে জনসংযোগ দফতর থেকে জানতে পারবেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. কাজী মোস্তফা সারোয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদনে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের দরপত্র বিজ্ঞপ্তির আওতাধীন মেডিসিন, সার্জিক্যাল-যন্ত্রপাতি ও প্যাথলজিক্যাল আইটেম ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০০৮ (বিধিমালার-৮, ১০, ১১ ও ৯৮ ধারা) লঙ্ঘন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে তিনি প্রতারণা ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে এমআরপি ও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মূল্য তালিকা অনুযায়ী মেডিসিন এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকাশিত মেডিকেল অ্যান্ড সার্জিক্যাল রিকুইজিট (এম.এস.আর সামগ্রীর মূল্য তালিকা অনুযায়ী) করেননি।

শুধু তাই নয়, দরপত্রের সর্বনিম্ন দরদাতার দর অনুমোদন না করে মনগড়া ও ভিত্তিহীন দরকে বিবেচনা করেছেন এবং স্ট্যান্ডার্ড রেটের বেশি দরে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ঠিকাদারকে মোট এক কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার ৫৯ টাকা আত্মসাতে সরাসরি সহায়তা করেছেন।

বাঁ থেকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন ও ডা. কাজী মোস্তফা সারোয়ার

তদন্তে নাম আসা অপর আসামি মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদনে একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতারণা ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে তিনি ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে দরপত্রের আওতাধীন মেডিসিন ও সার্জিক্যাল আইটেম ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা লঙ্ঘন করেছেন, যা এমআরপি ও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মূল্য তালিকা বহির্ভূত। এমনকি ওষুধ ও সার্জিক্যাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং বিদ্যমান বাজার দর অনুসরণ করা হয়নি।

বরং বাজার যাচাই কমিটির প্রণীত মনগড়া ও ভিত্তিহীন দরকে বিবেচনায় নিয়ে দুই জন ঠিকাদারকে মোট এক কোটি ৩৯ লাখ ১৩ হাজার ৬৩০ টাকা আত্মসাতে সরাসরি সহায়তা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯/৪২০ ধারা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ১৯৪৭ এর ৫ (২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সাবেক ডিজি মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেনকে ও ১৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক মহাপরিচালক কাজী মোস্তফা সারোয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। জিজ্ঞাসাবাদে তারা কেনাকাটায় অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করে লিখিত বক্তব্য দেন। একই অভিযোগে মামলার অন্যতম প্রধান আসামি আজিমপুর মাতৃসদনের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ইসরাত জাহানকেও ৮ ফেব্রুয়ারি জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক।

২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর পৃথক চারটি মামলা করে দুদক। মামলার পরপরই আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। মামলায় ১৭ জন চিকিৎসক ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতরের আট জনকে আসামি করা হয়। আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক ইসরাত জাহানকে চারটি মামলাতেই আসামি করা হয়।

অন্য আসামিরা হলেন- পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সাবেক অধ্যক্ষ ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য পারভীন হক চৌধুরী, মাতৃসদনের সাবেক সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য মাহফুজা খাতুন, সাবেক সহকারী কো-অর্ডিনেটর (ট্রেনিং অ‌্যান্ড রিসার্চ) ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য চিন্ময় কান্তি দাস, সাবেক মেডিকেল অফিসার ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সাইফুল ইসলাম, মেডিকেল অফিসার (শিশু) ও বাজারদর যাচাই কমিটির সদস্য মাহফুজা দিলারা আকতার।

আরও রয়েছেন- মাতৃসদনের মেডিকেল অফিসার ও বাজারদর যাচাই কমিটির সদস্য নাজরিনা বেগম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সদস্য সচিব-বাজার দর যাচাই কমিটির সদস্য জহিরুল ইসলাম, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য জেবুন্নেসা হোসেন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি) ও বাজার দর যাচাই কমিটির সভাপতি রওশন হোসনে জাহান, মাতৃসদনের সাবেক সহকারী কো-অর্ডিনেটর (ট্রেনিং অ‌্যান্ড রিসার্চ) ও পরিবার পরিকল্পনার অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. লুৎফুল কবীর খান, মেডিকেল অফিসার ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য রওশন জাহান, সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক হালিমা খাতুন, মাতৃসদনের বিভাগীয় প্রধান (শিশু) ও বাজারদর যাচাই কমিটির সদস্য মো. আমীর হোসাইন, সাবেক সমাজসেবা কর্মকর্তা ও বাজার দর যাচাই কমিটির সদস্য মোছা. রইছা খাতুন ও সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান।

এছাড়াও রয়েছেন- পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক কাজী গোলাম আহসান, সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) নাদিরা আফরোজ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. নাছের উদ্দিন, সমাজসেবা কর্মকর্তা বিলকিস আক্তার, মেডিকেল অফিসার আলেয়া ফেরদৌসি।

ঠিকাদারদের মধ্যে রয়েছেন- মনার্ক এস্টাবলিশমেন্টের মালিক মো. ফাতে নূর ইসলাম, মেসার্স নাফিসা বিজনেস কর্নারের মালিক শেখ ইদ্রিস উদ্দিন (চঞ্চল), সান্ত্বনা ট্রেডার্সের মালিক নিজামুর রহমান চৌধুরী।

২০১৪-১৫ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত চার অর্থবছরের কেনাকাটায় দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত করা হয়। প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কার্যাদেশ অনুযায়ী ঠিকাদারকে ওষুধ সরবরাহের বিপরীতে ৩২ লাখ ৯১ হাজার ৭২০ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়।

অথচ খুচরা মূল্য ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মূল্য অনুযায়ী ওই একই ওষুধের সর্বোচ্চ মূল্য ১৬ লাখ ৪৫ হাজার ২৯৮ টাকা। বাকি টাকা অতিরিক্ত দেওয়া হয়েছে। এভাবে চার অর্থবছরে একই প্রক্রিয়ায় টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।