বিএনপির আন্দোলনের প্রস্তুতি সরকারে অস্থিরতা

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২১

ঢাকা: গত ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘বিশ^বিদ্যালয় খোলার সঙ্গে সঙ্গে সরকার হটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি নিচ্ছে, শেখ হাসিনার সরকার হটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।’ এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ‘ছাত্রলীগকে আঁটঘাট বেধে নামার ডাক’ দিলেন ওবায়দুল কাদের। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রায়ই চমক লাগানো কথা বলে থাকেন। এ কারণে গণমাধ্যমেও ভালো কভারেজ পান সবসময়। কেউ কেউ তার সম্পর্কে রসিকতা করে এও বলেন যে, পরদিন গণমাধ্যমে কোন বাক্যটি বলবেন, তিনি নাকি রাতেই অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করে নেন। আর কোনটি বললে ভালো কভারেজ পাবেন সেটি তিনি ভালো করেই জানেন, যেহেতু ইতিপূর্বে এক সময় গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।

তবে ওবায়দুল কাদেরের এ বক্তব্যটাকে অনেকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখছেন। বর্তমান সার্বিক প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে দেশে এখন এমনতিই অনেক কানাঘুষা চলছে। আর এ কারণেই ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সারমর্ম খুঁজছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে। দেশে নানা বিষয় নিয়ে একের পর সংকট তৈরি হওয়া, সেইসব সংকট নিরসন তো নয়ই বরং সরকারের নীতিনির্ধারকরাই আরো জটিল করে তোলা, সরকারের মন্ত্রী তথা নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা, এমনকি নানা রকমের স্ববিরোধী ও বিতর্কিত কথাবার্তা প্রভৃতি সরকারের জন্য কুলক্ষণ বলে মনে করা হচ্ছে।

পাশাপাশি প্রধান বিরোধীদল বিএনপির আন্দোলনে নামার তোড়জোড় চলছে এ মুহূর্তে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে এমন তথ্য রয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকার হটানোর একটি ছক এঁকেছে বিএনপি এবং সেই ছককে সামনে রেখে আঁটঘাট বেঁধে মাঠে নামতে যাচ্ছে তারা। অবশ্য, সরকারও এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার অভিযান শুরু করেছে। একই সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার মামলাগুলোও চাঙ্গা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এমনকি খালেদা জিয়াকে পুনরায় জেলে পাঠানোর হুমকিও দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সরকারের এই কৌশলটা অনেক পুরানো। পুরানো কৌশল আদৌ এবার আর তেমন একটা কাজে দেবে বলে মনে করছেন না রাজনীতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, বিএনপি এখন অনেক কৌশলী। দীর্ঘদিন থেকেই তারা চূড়ান্ত একটি আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সেই প্রস্তুতি এবার চূড়ান্ত হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

ইতিপূর্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খোলা হচ্ছিলো না করোনার অজুহাতে। বলা হয়েছিলো, শিক্ষার্থীদেরকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে টিকা দেয়া হবে। টিকার পরেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা হবে। কিন্তু এখন সেটি সম্ভব হচ্ছে না। টিকা সংকটের কারণে শিক্ষার্র্থীদের টিকা দেয়া শুরু করা যায়নি। এদিকে করোনা সংক্রমণের মাত্রা দ্রুত কমে এসেছে গত কিছু দিনে। ফলে এখন আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার জন্য দেশে-বিদেশে প্রচণ্ড সমালোচনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

জাতিসংঘের ইউনিসেফ বার বার তাগাদা দিচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার জন্য। দেশের মধ্যে এই মর্মে সমালোচনা হচ্ছিলো, সরকার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অর্থাৎ ক্ষমতা হারানোর ভয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে সাহস পাচ্ছে না। ছাত্র সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই হুমকি দিয়েছে, সেপ্টেম্বরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না খুললে তারা বৃহত্তর আন্দোলনে যাবে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই এখনই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার উদ্যোগের মধ্যেই তাদেরকে সেই টেনশন তাড়া করে ফিরছে। সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা, সমন্বয়হীনতা, অন্তর্দ্বন্দ্বসহ নানা দুর্বলতাকে পুঁজি করে বিএনপি এবার মাঠে নামছে।

২০১৫ সালে লাগাতার হরতালে ব্যর্থতার পর গত ছয় বছর বিএনপি আর বড় কোনো কর্মসূচি দেয়নি মাঠে-ময়দানে। এই দীর্ঘ সময় শুধু সংগঠনকে শক্তিশালীকরণেই সময় কাটিয়েছে দলটি। অনেক বড় বড় ইস্যু থাকা সত্ত্বেও মাঠে নামেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাতের ভোট, এমনকি দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতেও উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি পালন করেনি। এ নিয়ে শুভাকাঙ্খীদের কম সমালোচনার মুখে পড়তে হয়নি বিএনপিকে। আন্দোলনের ব্যাপারে সরকারি দলের তরফ থেকে প্রতিনিয়ত খোঁচা দেয়ার পরও সেগুলোকে আমলে নেয়নি দলটি। কিন্তু এ মুহূর্তে বিএনপিকে আন্দোলনের ব্যাপারে অত্যন্ত কনফিডেন্ট বলেই মনে করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে অবস্থা এমন ছিলো যে, জামায়াতকে ছাড়া বিএনপি কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে কিনা এ নিয়েও সন্দেহ ছিল। অবশ্য এর বাস্তবতাও ছিলো। বিএনপি কখনো সংগঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারেনি। শুধু জনসমর্থনের কারণে দফায় দফায় ক্ষমতায় এসেছে।

সাংগঠনিকভাবে বরাবর দুর্বলই রয়ে গিয়েছিল। ২০১৫ সাল পর্যন্ত আন্দোলনের প্রায় প্রত্যেকটি কর্মসূচিতেই প্রধান ভূমিকায় থাকতো জামায়াত। কিন্তু বিএনপি সাম্পতিক বছরগুলোতে যে অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে তার প্রমাণ ইতিমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় রেখেছে। কোনো রকমের পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে অনেক লোক জড়ো করতে এবং সরকারি বাহিনীগুলোকেও চ্যালেঞ্জ দিতে সক্ষম- এর প্রমাণ তারা সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট চন্দ্রিমা উদ্যানে দিয়েছে। কোনো উস্কানি ছাড়াই পুলিশ বিএনপির ওপর হামলা চালায়। বিএনপি নেতা-কর্মীরা পরবর্তীতে পাল্টা হামলা করে। এক পর্যায়ে রণক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। বিনা উস্কানিতে অর্থাৎ কোনো কারণ ছাড়াই কেন হামলা করা হলো, এ ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে বলা হয়, এক সঙ্গে অনেক লোক জড়ো হওয়ায় তাতে বাধা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ব নির্ধারিত কোনো কর্মসূচি ছাড়াই এক সঙ্গে এতো লোক জড়ো হওয়াতে পুলিশই ঘাবড়ে গিয়েছিলো। এর মাধ্যমে বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক শক্তিরই প্রমাণ পাওয়া গেলো।

সরকারের নানা ব্যর্থতা

বিগত সময় যা কিছু উন্নয়ন বা ইতিবাচক কাজকর্ম হয়েছে, বলতে গেলে সবই ঢেকে গেছে সাম্প্রতিক সময়ের বড় কিছু ব্যর্থতা আর নানা অনিয়মে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা করোনা টিকা ক্রয়ে। টিকা তো সময়মতো পাওয়া গেলোই না, বরং এই টিকা ক্রয়কে কেন্দ্র করে নানা কেলেংকারি ঘটে গেলো। সাধারণ মানুষের মধ্যে এটিকে কেন্দ্র করে অনেক অসন্তোষ রয়েছে। তাছাড়া করোনা নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য পদক্ষেপগুলোও গ্রহণযোগ্য হওয়ার পরিবর্তে একে পর এক সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এসবের জন্য দায়ী করা হচ্ছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে সরকারের যেসব বিভাগ বা মন্ত্রণালয় রয়েছে তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কিনা, এ প্রশ্ন মানুষের মুখে মুখে। এ মুহূর্তে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে হু হু করে। চাল, চিনি, তেল প্রভৃতি জীবন ধারণের প্রধান খাদ্যপণ্যের মূল্য গত কয়েকদিনে অস্বাভাবিক বেড়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে চরম অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে।

সরকারের বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতির এমন সব ঘটনা প্রকাশ হয়েছে যে, যেগুলো শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বিস্ময়করও বটে। এদিকে আর্থিক খাতের দুর্নীতি তো মহাআলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পি কে হালদারসহ বিভিন্ন ঘটনার শুনানিতে উচ্চ আদালতেও আর্থিক খাতের দুর্নীতি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। শুধু আর্থিক খাতই নয়, স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ প্রায় প্রত্যেকটি খাতেরই লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা একের পর এক বেরিয়ে আসছে। সরকারের তরফ থেকে দফায় দফায় অনিয়ম, দুর্নীতি, অপচয় রোধের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সরকারের প্রশাসন যন্ত্র একেবারেই অচল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করছেন সাধারণ সচেতন মানুষ। ব্যাপকহারে দলীয়করণ এবং অনিয়ম-দুর্নীতি গোটা প্রশাসনকে গ্রাস করে ফেলেছে। প্রশাসনের দায়িত্বরত ব্যক্তিদের মধ্যে দায়িত্ব পালনের চেয়ে অনৈতিকতাই বিরাজ করছে বেশি। পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের সাম্প্রাতিক বেশ কিছু ঘটনায় এর নজির ফুটে উঠেছে।
সরকার, সরকারি দল এবং প্রশাসনের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে পারষ্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ভয়াবহ রূপে দেখা দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি দলের মধ্যেই একের পর এক হানাহানি হচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসনেও দ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে। এমনকি প্রশাসন বনাম রাজনীতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বও প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে।

আফগানিস্তানে তালেবানের বিষ্ময়কর উত্থানের প্রভাব

ওবায়দুল কাদেরের এ দিনের কথায় এটা ফুটে উঠেছে যে, আফগানিস্তানের ঘটনায় সরকার চিন্তিত। তিনি বলেছেন,‘এখনও বাংলার আকাশে ষড়যন্ত্রের গন্ধ। সতর্ক থাকতে হবে। সামনের দিনে আরও চ্যালেঞ্জ আছে। দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর একটি গোষ্ঠী উচ্ছ্বসিত। এখানে তাদের মতলবটা কী? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতি চলছে। ফলে অনেক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। এবার মাঠে নামবে, বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরেই তারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে।’
শুধু কথার কথা নয়, ওবায়দুল কাদেরের এ বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার অনেক মিল রয়েছে বৈ-কি? আফগানিস্তানে তালেবানের বিষ্ময়কর উত্থান নিঃসন্দেহেই বাংলাদেশে সরকার বিরোধী শক্তিগুলোকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করেছে। সরকার বিরোধী কেউ কেউ একে আরব বসন্তের সঙ্গে তূলনা করছেন। আবার অন্যদিকে সরকারের ভেতরেও একে কেন্দ্র করে টেনশন-অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান ড. আসিফ নজরুল তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে একটি স্ট্যাটাস দেন যাতে বলা হয়, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কাবুল বিমানবন্দর ধরনের দৃশ্য বাংলাদেশেও হতে পারে।’ শুধু এই বাক্যটিকে কেন্দ্র করেই তূলকালাম কাণ্ড ঘটে যায়। যদিও এই বাক্যটিতে আপত্তিকর কোনো শব্দ নেই, এমনকি কাউকে নির্দিষ্ট করেও কিছু বলা হয়নি। আসিফ নজরুলের গ্রেফতার দাবি করে কর্মসূচি পালন করে ছাত্রলীগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. আসিফ নজরুলের কক্ষে তালা দেয়। এমনকি থানায় মামলাও করা হয় আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে। অবশ্য পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ছাত্রলীগ পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে এ ঘটনা থেকে সরকার তথা আওয়ামী লীগের মধ্যকার ভীতি-অস্থিরতা ফুটে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন।

২০১০ সালের শুরু থেকে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বয়ে যাওয়া গণবিপ্লবের ঝড়কে পশ্চিমা সাংবাদিকরা ‘আরব বসন্ত’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। গণবিক্ষোভের শুরু হয় তিউনিসিয়ায়। এরপর তা মিশরে, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন সহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যায়। প্রথমে মিশরে প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের পতন হয়। পরে লিবিয়ায় মুয়াম্মর আল-গাদ্দাফি জমানার অবসান হয়। আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানের পর বাংলাদেশে সরকার বিরোধীরা এ মুহূর্তে বেশ উজ্জীবিত।

অন্যদিকে সরকারিমহলে একে অনেকটাই আতংকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে, সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা এবং সরকার বিরোধী শক্তিগুলোর উস্কানিতে এখানে যে কোনো সময় বড় ধরনের কিছু ঘটে যেতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো, বাংলদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী বিদেশি শক্তিগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতি। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ইতিহাসের সবচেয়ে তলানিতে পৌঁছেছে এ মুহূর্তে। অন্যদিকে চীনও মোটেই সন্তুষ্ট নয়। বাংলাদেশে তাদের প্রকল্পগুলো একের পর এক বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। সরকারের কাছ থেকে তারা যেমনটি সহযোগিতা আশা করছিলো তা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিএনপির প্রস্তুতির তোড়জোড়

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি পুনর্গঠনের তোড়জোড় চলছে এ মুহূর্তে। নেতা-কর্মীদের আন্দোলনের জন্য জরুরিভিত্তিতে প্রস্তুত হতে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যেও বিএনপির এ তৎপরতার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
মেয়াদোত্তীর্ণ থানা-পৌর-ইউনিয়নসহ সব পর্যায়ের কমিটি গঠনের কাজ দ্রুত শেষ করতে চায় বিএনপি। এজন্য সাংগঠনিক জেলাগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে হাইকমান্ড। ১৭ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া জেলা কমিটির সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের দিয়ে এসব তৃণমূল কমিটি গঠনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

এবার বিএনপির সামনে আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং না নেওয়ার প্রশ্ন নেই। সরাসরি নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করার এক দফা গণআন্দোলন গড়ার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এক দফা দাবি আদায় করতে হলে বিশ্বস্ত, ত্যাগী ও সাহসী নেতাকর্মী প্রয়োজন। যারা দেশ, গণতন্ত্র ও দলের জন্য জীবনবাজি রেখে আন্দোলনে মাঠে নামবে- সে ধরনের নেতৃত্ব খুঁজে বের করে বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে আনার চেষ্টা শুরু করেছে হাইকমান্ড। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, থানা, জেলা ও মহানগর কমিটিতে দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া নেতাকর্মীদের দিয়ে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে পদহীন সাবেক ছাত্রদল ও যুবদল নেতাদের খুঁজে পদায়ন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যারা দলের দুর্দিনে বেইমানি করেননি এবং ভবিষ্যতে করবেন না, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হচ্ছে। সরকার তথা প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করবেন না, লোভে পড়ে নৈতিকতা বিসর্জন দেবেন না- এমন আস্থাবান ও বিশ্বস্ত নেতাদের খুঁজে বের করা হচ্ছে।

আবার ২০ দল চাঙ্গা করতে চাচ্ছে বিএনপি

শুধু দলের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধিই নয়, ২০ দলকে চাঙ্গা করা এমনকি রাজপথে আরো বৃহত্তর ঐক্যের জন্যও কাজ শুরু করছে বিএনপি। গত ২৩ আগস্ট বিএনপি-জামায়াতের বৈঠক হয়েছে। এই বৈঠকের মাধ্যমে বিএনপি মনে করছে যে, এখন একটি আন্দোলন করার সময়। কিছুদিন আগে থেকেই নতুন করে একটি জোট গঠনের জন্য মিত্র খুঁজেছে বিএনপি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নতুন করে জোট গঠনের জন্য বৈঠক করেছে বিএনপি। নাগরিক ঐক্য, জেএসডি, গণফোরাম সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও বৈঠক করেছে বিএনপি।

তবে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ব্যাপারে এই দলগুলোর আড়ষ্টতা রয়েছে। এরপর বিএনপি ২০ দলীয় জোটে থাকা দলগুলো যেমন- এলডিপি, কল্যাণ পার্টি সহ বিভিন্ন দলের সাথে বৈঠক করেছিল জামায়াতকে বাদ দিয়েই। কিন্তু দেখা যায় যে, এই রাজনৈতিক দলগুলো শুধুমাত্র নামেই রয়েছে, মাঠ পর্যায়ে তাদের তেমন কোন অবস্থান নেই। বিএনপি এদেরকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করতে পারবে না এবং আন্দোলনে সহযোগী সংগঠন হিসেবেও কাজ করতে পারবে না। এদিকে, বিএনপির মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে আন্দোলনের ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যা রয়েছে। বিএনপির নেতারা মনে করেন যে, বিএনপির যে আদর্শ সেই আদর্শ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে আন্দোলনে গেলে ক্ষুণœ হবে। এরকম একটি দোদুল্যমান পরিস্থিতিতেই ছিলো দলটি।

বিএনপি জামায়াতের সাথে প্রকাশ্যে আন্দোলনে যেতে পারছিলো না দুটো কারণে। প্রথমত, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির আঁতাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির জন্য একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দ্বিতীয়ত, দেশের মধ্যেও সুশীল সমাজের মধ্যে জামায়াত বিরোধী একটি মনোভাব রয়েছে। যার ফলে বিএনপি সবসময় চেষ্টা করেছে যে জামায়াতকে আড়ালে রেখেই আন্দোলন করার জন্য। আর মূলত জামায়াতকে আড়াল করতেই ২০ দলীয় জোটকে এতদিন মৃয়মাণ রেখেছিল বিএনপি। কিন্তু এখন আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থানের পর বিএনপি তার হিসেব-নিকেশ পাল্টে ফেলেছে এবং নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বার্তা এসেছে যে, জামায়াতের সাথে এখন আর রাখ-ঢাকের সম্পর্কের দরকার নেই।

এরপরই বিএনপি তিনটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। প্রথমত, তারা খুব শীঘ্রই সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাবে এবং ধাপে ধাপে এই আন্দোলন করবে। দ্বিতীয়ত, তারা খুব শীঘ্রই ২০ দলীয় জোটকে চাঙ্গা করবে এবং আড়াল থেকে আবারও প্রকাশ্যের জামায়াতের সাথে কার্যক্রম করবে। এই ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত পাওয়া গেছে। তৃতীয়ত, বিএনপি এখন আবারও ভারতবিরোধী অবস্থানে চলে যাবে।

কারণ, এখন বিশ্ব রাজনৈতিক মেরুকরণে এবং এই অঞ্চলে চীনের প্রভাবে অনেক বেড়েছে। সেজন্য বাংলাদেশে যদি বিএনপি-জামায়াত ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা হয় এবং সেটি ভারতবিরোধী হয় তাহলে তারা সহজেই চীনকে সন্তুষ্ট করে চীনের সান্নিধ্য লাভ করতে পারবে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এবং ক্ষমতার পালাবদলে চীনের ভূমিকা অনেক বেশি। তাই চীনকে সন্তুষ্ট করার জন্য ২০ দলীয় জোটকে চাঙ্গা করা এবং ভারতবিরোধীতাকে উস্কে দেওয়ার কৌশল নিয়েই বিএনপি এখন এগুচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই তারা নতুন কর্মসূচী নিয়ে মাঠে নামতে যাচ্ছে।