ফেলেই দিতে হলো ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত তিন শিশুর চোখ

বৃহস্পতিবার, জুন ১৭, ২০২১

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত তিন শিশুর প্রত্যেকের একটি করে চোখ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

দেশটির চিকিৎসকরা বলেছেন, শিশুদের মধ্যে মিউকরমাইসিস বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণের ঘটনা একটি উদ্বেগজনক লক্ষণ। কোভিড-১৯ রোগী যাদের ডায়াবেটিস, এইডস কিংবা ক্যান্সার রয়েছে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মক দুর্বল। যে কারণে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস তাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এমনকি যারা করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন তাদের জন্যও এটি বিপজ্জনক হতে পারে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্তদের মৃত্যুর হারও ৫০ শতাংশের বেশি।

মুম্বাইয়ের দুটি হাসপাতালে ৪, ৬ এবং ১৪ বছর বয়সী তিন শিশুর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। প্রথম দুই শিশুর ডায়াবেটিস ছিল না। তবে ১৪ বছর বয়সী শিশুটি ডায়াবেটিসে ভুগছিল। এছাড়া করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পর চতুর্থ আরেক শিশুর ডায়াবেটিস দেখা দেয় এবং তার পাকস্থলিতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়, বলছেন চিকিৎসকরা।

মুম্বাইয়ের ফোর্টিস হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ শিশুবিষয়ক পরামর্শক ডা. জিসাল শেঠ বলেন, কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে আমরা দুটি মেয়ে শিশুকে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হতে দেখেছি। তাদের দু’জনেরই ডায়াবেটিস ছিল। ১৪ বছর বয়সী শিশুটি আমাদের কাছে আসার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার একটি চোখ কালো হয়ে যায়। ফাঙ্গাস তার নাকেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে সৌভাগ্যবশত তা মস্তিষ্কে পৌঁছায়নি। আমরা ছয় সপ্তাহ ধরে তার চিকিৎসা করেছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে তার চোখটি হারিয়েছে।

তিনি বলেন, এক মাস আগেও ১৬ বছর বয়সী আরেক শিশু সুস্থ ছিল। সে করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছিল। তার ডায়াবেটিস ছিল না। কিন্তু সে হঠাৎ করেই একদিন আমাদের কাছে আসে এবং তার ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়। আমরা অ্যানজিওগ্রাফি করে তার পাকস্থলির কাছে রক্তনালীতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ শনাক্ত করেছি। সবচেয়ে ছোট যে শিশুটির ডায়াবেটিস ছিল না, তাকে মুম্বাইয়ের কেবিএইচ বাচুলি অফথালমিক অ্যান্ড ইএনটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এই দুই শিশু করোনা সংক্রমিত হয়েছিল।

ডা. প্রীথেশ শেঠী বলেছেন, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস তাদের চোখে ছড়িয়ে যায়। আমরা যদি চোখ অপসারণ না করতাম তাহলে তাদের জীবন হুমকিতে পড়তো। কারণ ইতোমধ্যে তারা এক চোখে অন্ধ ছিল। যা তাদেরকে প্রচণ্ডভাবে কষ্ট দেয়। গত বছরের ডিসেম্বরে এক শিশু আমাদের কাছে এসেছিল। দ্বিতীয় শিশুটি এসেছিল করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়।

অত্যন্ত আগ্রাসী হওয়ায় একেবারে প্রাথমিক স্তরেই ব্ল্যাক ফাঙ্গাসকে শনাক্ত এবং মৃত টিস্যু অপসারণ করতে হয়। এই ফাঙ্গাসের সংক্রমণ মস্তিষ্কে পৌঁছানো ঠেকাতে চিকিৎসকরা রোগীর নাক, চোখ এমনকি চোঁয়ালও কেটে ফেলেন।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস কী?

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় করোনা রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠার পর সংক্রমণজনিত এই রোগকে বলা হয় মিউকরমাইকোসিস। মাইকরমাইসিটিস গোত্রের কয়েকটি ছত্রাক প্রজাতি থেকে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। শরীর দুর্বল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে এই ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে। এর পাশাপাশি আরও বিভিন্ন কারণে এই ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটতে পারে।

কিন্তু নতুন করে যে চিন্তা দেখা দিয়েছে, সেটি হলো— করোনা রোগীদের শরীরে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ প্রবল হয়ে উঠছে। বিশেষত যে রোগীদের স্টেরয়েড দিতে হচ্ছে বা যারা আগে থেকেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তারা দ্রুত সংক্রমিত হচ্ছেন। এছাড়া যে রোগীদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি ও স্টেরয়েড থেরাপি নিয়েছেন তাদেরও মিউকরমাইকোসিসের সংক্রমণ ঘটছে।

দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের (এইমস) পরিচালক ড. রণদীপ গুলেরিয়া বলেন, ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ ঠেকাতে হলে প্রাথমিকভাবে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে— ১. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ২. রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা ৩. স্টেরয়েড বা কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের সঠিক ব্যবহার।

ভারতের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের পর দ্বিতীয় সংক্রমণ হিসেবে মিউকরমাইকোসিস বা কালো ছত্রাকে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশের মৃ্ত্যু হয়েছে। এছাড়া, করোনা রোগীদের চিকিৎসার সময়ে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার রোগীদের শরীরে ‘ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স’ বা ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু তৈরি করছে। যা পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয়বার ইনফেকশনের জন্য দায়ী।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, আরও স্পষ্ট করে বললে হাসপাতালে যাদের অক্সিজেনের প্রয়োজন হচ্ছে, কিংবা স্টেরয়েডের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হচ্ছে, তারা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকজনিত সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন। আবার ছত্রাকে সংক্রমণের পর ঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু না হলে সংক্রমিতদের বড় অংশের মৃত্যু হচ্ছে।

ফাঙ্গাস সংক্রমণের উপসর্গ

কিছু কিছু ফাঙ্গাস থেকে সংক্রমণের উপসর্গগুলোর সঙ্গে কোভিড-১৯ রোগীর লক্ষণগুলোর মিল রয়েছে। যেমন জ্বর, কাশি এবং নিঃশ্বাস নিতে না পারা।

ক্যানডিডা ফাঙ্গাসের বাড়তি উপসর্গের মধ্যে রয়েছে সাদা রঙের র‍্যাশ বা ক্ষত- যে কারণে একে অনেক সময় বলা হয় ‘সাদা ফাঙ্গাস’। নাক, মুখ, ফুসফুস, পাকস্থলি বা নখের গোড়ায় এই ছত্রাকের সংক্রমণ দেখা যেতে পারে, যে র‍্যাশ অনেক সময় সাদা ছানার মতো দেখায়।

এই ফাঙ্গাসের সংক্রমণ শরীরে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে অর্থাৎ তা রক্তে চলে গেলে প্রায়ই রক্ত চাপ কমে যাওয়া, জ্বর, পেটে ব্যথা এবং মূত্রনালীর প্রদাহের মত উপসর্গ দেখা যায়।