অর্থ আত্মসাৎ: সমঝোতা চায় বানকো সিকিউরিটিজ

বৃহস্পতিবার, জুন ১৭, ২০২১

ঢাকা : গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সদস্য ব্রোকারেজ হাউজ বানকো সিকিউরিটিজের লেনদেন। কিন্তু সমঝোতার মাধ্যমে বানকো সিকিউরিটিজ কার্যক্রম পরিচালনা করতে চায়। এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (১৭জুন) ডিএসইর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করেছে। বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, বিনিয়োগকারীদের ‘সম্মিলিত গ্রাহক অ্যাকাউন্ট’ থেকে ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ ১৯ হাজার ১৩৩ টাকার অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের ঘটনায় বানকো সিকিউরিটিজের কার্যক্রম বন্ধ করেছে দিয়েছে ডিএসই। তাতে যেসব গ্রাহক শেয়ার বিক্রি করে নগদ অর্থ উঠাতে পারেনি তারা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। তবে যাদের বিও হিসাবে শেয়ার আছে তারা লিঙ্ক একাউন্টে তাদের বিনিয়োগ সরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় এগুচ্ছে। আর এরমধ্যে ডিএসইর সঙ্গে যোগাযোগ করছে বানকো সিকিউরিটিজ। প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা ডিএসইর সঙ্গে সমঝোতার লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার বৈঠক করেছেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বানকো সিকিউরিটিজের পক্ষে শফিউল আজম এবং মুনিম চৌধুরী বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তারা ডিএসইর কাছে দাবী করেছেন তাদের গ্রাহক হিসাবে ১৮ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি আছে। এ টাকা তারা পরিশোধ করে দেবেন বলে জানিয়েছেন ডিএসইকে। কিন্তু ডিএসই থেকে জানানো হয় কোনো মৌখিক ভাবে নয়, গ্রাহক হিসাব থেকে কি পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে সেই বিষয়ে লিখিত প্রতিবেদন দিতে হবে। এছাড়া ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটি কিভাবে গ্রাহকদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে ব্যবসা পরিচালনা করতে চায় তার একটি প্রস্তাবও বানকোর কাছে চেয়েছে ডিএসই। এই প্রতিবেদন ও প্রস্তাবনা ডিএসই পর্ষদের উপস্থাপন করা হবে। ডিএসইর পর্ষদ বানকো সিকিউরিটিজের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে অর্থ আত্মসাতের যে মামলা হয়েছে সেটিও চলমান থাকবে।

ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান এই প্রসঙ্গে বলেন, বানকোর সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে ডিএসই। বিষয়টি অনুসন্ধানের পর জানা যাবে প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত পক্ষে গ্রাহকদের হিসাব থেকে কি পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এরপর তাদের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি যদি স্বেচ্ছায় আত্মসাৎ করা হিসাব প্রতিবেদন আকারে ডিএসইতে দাখিল করে তাহলে বিষয়টি যাচাই বাছাইয়ের পর পর্ষদে আলোচনা হবে।

বানকো সিকিউরিটিজের পরিচালক মো. শফিউল আজম এর মোবাইলে একাধিকবার ফোন করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

এদিকে, অন্যান্য দিনের মতো বৃহস্পতিবারও বানকো সিকিউরিটিজে বিনিয়োগকারীরা ভিড় করেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর মতিঝিল ইস্পাহানি ভবনে বানকো সিকিউরিটিজের অবস্থান করে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে গ্রাহকরা তাদের অর্থ ফেরত পাবে কিনা সে বিষয়ে খোঁজ নিতে আসছে। এসময় প্রতিষ্ঠানটিতে দুয়েকজন কর্মী উপস্থিত থাকলেও তারা গ্রাহকদের অর্থের বিষয়ে কোনো কিছুই জানাতে পারেনি। কিছু গ্রাহক তাদের স্বার্থে হলেও প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন খুলে দেওয়ার দাবী করেন। বানকোতে এসে কোনো কিছুর হদিস করতে না পেরে অনেক গ্রাহককে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন। এদিন প্রতিষ্ঠানটিতে নিজের বিনিয়োগ করা অর্থের খোজ করতে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, বানকো সিকিউরিটিজের কনসোলিডেটেড কাস্টমার অ্যাকাউন্টে যে ৬৬ কোটি টাকা ঘাটতি পাওয়া গেছে, তা অনেক আগেই ডিএসইকে বলা হয়েছে। তারা বিনিয়োগকারীদেরে যে চেক দিত, তার অধিকাংশই ডিজঅনার হতো। টাকার জন্য বিনিয়োগকারীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতো ওই প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু বানকো কর্তৃপক্ষ যথা সময়ে বিনিয়োগকারীদের টাকা দিতো না। এছাড়া প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) জন্য বিনিয়োগকারীরা টাকা দিলেও, তা সঠিকভাবে কোম্পানিতে জমা দিত না বানকো সিকিউরিটিজ। অনেক সময় বিনিয়োগকারীদের না জানিয়ে তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিতো প্রতিষ্ঠানটি। আর ব্রোকারেজ হাউজটির যে অর্থ সংকটে রয়েছে, সে বিষয়টি ডিএসই আগে থেকেই জানতো। কিন্তু যথা সময়ে পদক্ষেপ না নেওয়ায় এ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। বিষয়টি দ্রুত সুরাহা না হলে পুরো পুঁজিবাজারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে বলে মনে করছেন তারা।

বিনিয়োগকারীদের দাবী, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু করা হোক। যাতে তাদের অর্থ ফেরত পাওয়া যায়। নয়তো বা ডিএসই থেকেই গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।

এ বিষয়ে বানকো সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বানকো সিকিউরিটিজের কনসোলিডেটেড কাস্টমার অ্যাকাউন্টে যে ৬৬ কোটি টাকা ঘাটতি পাওয়া গেছে, তা একদিনের নয়। এসব হাউজ ডিএসই নিয়মিত মনিটরিং করে। কিন্তু এতো টাকা ঘাটতি হলো তা কি ডিএসই ধরতে পারলো না। আমি এ ব্রোকারেজ হাউজ থেকে যতবার টাকা উত্তোলন করেছি, তার জন্য বিএসইসি বা ডিএসইর সুপারিশ লেগেছে। ব্রোকারেজ হাউজটির অর্থ সংকটে রয়েছে এ বিষয়টি ডিএসই আগে থেকেই তো জানতো। কিন্তু এর পরেও কেন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমি মনে করি, প্রাইমারী রেগুলেটর হিসেবে ডিএসই এ দায় এড়াতে পারে না। ডিএসইর উচিত হবে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি চালু করে তাদের অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া।

প্রসঙ্গত, বানকো সিকিউরিটিজ থেকে বিনিয়োগকারীদের ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ ১৯ হাজার ১৩৩ টাকা অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের ঘটনায় ডিএসই কর্তৃপক্ষ সোমবার (১৪ জুন) মতিঝিল থানায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযুক্তরা হলেন, বানকো সিকিউরিটিজের পরিচালক মো. শফিউল আজম, ওয়ালিউল হাসান চৌধুরী, নুরুল ঈশান সাদাত, এ. মুনিম চৌধুরী, জামিল আহমেদ চৌধুরী ও বাশার আহমেদ।

মঙ্গলবার (১৫ জুন) সকালে মতিঝিল থানা অভিযোগটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠায়। ডিএসই প্রতারণামূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইনের ৪০৬ ও ৪০৯ ধারায় অভিযোগ এনেছে। অভিযোগটি থানায় দায়ের করা হলেও এর সব কার্যক্রম খতিয়ে দেখবে দুদক।