বাচিপ সম্পাদকের রামরাজত্ব, একার দখলে ২০টি করোনা শয্যা!

বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১

ঢাকা: গাজীপুরস্থ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন সহযোগী অধ্যাপক ওই হাসপাতালের ২০টি কনোরা শয্যাবিশিষ্ট ওয়ার্ড একাই দখল করে রেখেছেন। ‘শয্যা দখলকারী’ এই চিকিৎসকের নাম সুশান্ত কুমার সরকার। আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এর গাজীপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তিনি। রাজনৈতিক এই পরিচয় পুঁজি করে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটিতে চলছে এখন সুশান্ত-রাজত্ব।
কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক সুযোগ-সুবিধার এই ওয়ার্ডটিতে (এমনিতে সিসিইউ ওয়ার্ড, বর্তমানে করোনা ওয়ার্ড) শয্যা সংখ্যা ২০টি। কিন্তু একমাত্র রোগী ডা. সুশান্ত। তার বিধি-নিষেধ থাকায় অন্য কোনো করোনা রোগীর এই ওয়ার্ডে প্রবেশাধিকার নেই। ডা. সুশান্তের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে নিস্তার নেই সহকর্মীদেরও। এই হাসপাতলেরই একজন শিশুরোগ চিকিৎসক নিজের করোনা আক্তান্ত মা’কে এই ওয়ার্ডে ভর্তি করাতে পারেননি। একইভাবে ডা. সুশান্ত ফিরিয়ে দিয়েছেন গাজীপুরের একজন সংসদ সদস্যের আত্মীয় কাপাসিয়ার জনৈক কোভিড পজেটিভি রোগীকে। ওই সাংসদ এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। ডা. সুশান্তের ঔদ্ধত্যের কাছে হার মানতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও। ওই নারী ঢাকার একাধিক হাসপাতাল ঘুরেও শয্যা খালি পাননি। নিরুপায় হয়ে পুনরায় এই হাসপাতালে আসলে কর্তৃপক্ষ তাকে অন্য ওয়ার্ডে ভর্তি করে নেন।
তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. হাফিজ উদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথাই প্রকাশ করেন। ডা. সুশান্ত কুমার সরকার পুরো ওয়ার্ডটি দখলে রাখার কথা তিনি স্বীকার করেন। এমনকি পরিচালক এ বিষয়ে সুশান্ত কুমার সরকারকে অনুরোধ করলেও কোনো কাজ হয়নি বলে জানান।
কল্পকাহিনীর মতো শোনালেও বাস্তবে এমনটিই ঘটছে সেখানে। বরং বলা যায়, ডা. সুশান্তের রাজত্বে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল উভয়টিতেই চলছে সুশান্তের একক আধিপত্য- এককথায় বলা যায় সুশান্ত রামরাজত্ব।

অবশ্য এর আগেও এই হাসপাতলে তিনি অনেক অপকর্ম ও অঘটন ঘটিয়েছেন। মেডিকেল কলেজের প্রথম ভারপ্রাপ্ত পরিচালক প্রবীণ চিকিৎসক আলী হায়দার চরমভাবে লাঞ্চিত হন ডা. সুশান্তের হাতে। এ ব্যাপারে ডা. আলী হায়দার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। তারপরও যথাযথ প্রতিকার পাওয়া যায়নি। কমেনি ডা. সুশান্তের দাপট। সহকর্মী অনেকেই, এমনকি সিনিয়ররাও সুশান্তের হাতে নানাভাবে নাজেহাল হয়েছেন। এরমধ্যে মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষকও রয়েছেন, যিনি সুশান্তের হাতে চরমভাবে নাজেহাল হয়েছেন। কিন্তু গত এক বছর ধরে তার দাপট ও কর্তৃত্ব এতো বেড়েছে যে, মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল উভয় প্রতিষ্ঠানেই এখন ‘সুশান্ত রাজত্ব’ কায়েম হয়েছে। সুশান্তের ইচ্ছের বাইরে কারো কিছু করার ক্ষমতা নেই, যদিও পদের দিক থেকে তিনি একজন সহযোগী অধ্যাপক মাত্র। তাও তিনি শুধুমাত্র মেডিকেল কলেজের স্টাফ।

হাসপাতালের কেউ নন। তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল- দুটো আলাদা প্রতিষ্ঠান, আলাদা প্রশাসন। কিন্তু স্বাচিপের গাজীপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক এই পদটি ব্যবহার করে ডা. সুশান্ত তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ এবং এমনকি হাসপাতলেও একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখানে চলছে সুশান্তের রামরাজত্ব! কেউ তার দুর্নীতি, অপকর্ম-অসদাচরণের বিষয়ে ‘টু’ শব্দটিও করার সাহস পান না। এমনকি হাসপাতালের পরিচালক নিজেও সুশান্ত আতংকে ভূগছেন, যদিও ডা. সুশান্ত হাসপাতালের কোনো স্টাফ নন। সুশান্তের এতো অপকর্ম সত্ত্বেও কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না পরিচালক ডা. হাফিজ উদ্দিন। এদিকে মেডিকেল কলেজে তো তার ইচ্ছের বাইরে কারো কিছু বলার বা করার ক্ষমতাই নেই!
গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. খায়রুজ্জামানের কাছে মেডিকেল কলেজের একজন সহযোগী অধ্যাপক কর্তৃক হাসপাতালের কোভিড ওয়ার্ডের ২০ শয্যা দখল করে রাখার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে গণমাধ্যমের কাছে পুরো বিষয়টিই অস্বীকার করেন। পরে যখন তাকে বলা হলো, স্থানীয় একজন সংসদ সদস্যও এ বিষয়ে অবগত আছেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বীকার করলেন এমন পরিস্থিতির কথা। কিন্তু এ বিষয়ে নিজের দায় এড়ানোর জন্য বললেন, মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালের কর্মকা-ের বিষয়ে সিভিল সার্জনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। হাসপাতালের পরিচালক এবং মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষই সব। উল্লেখ্য, সিভিল সার্জন ডা. খায়রুজ্জামান পদাধিকারবলে জেলা কোভিড নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্যসচিব। কোভিড কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে তিনি এসবের দায় এড়াতে পারেন কিনা, এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি ডা. খায়রুজ্জামান।

সুশান্ত কুমার সরকার গাজীপুরস্থ শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজের রেডিওলোজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। এই বিভাগের অধীনে রোগ নির্ণয় পরীক্ষা এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এমআরআই প্রভৃতি রয়েছে। কিন্তু এসব বিষয়ে তিনি সরকার বা জনগণের স্বার্থের চেয়ে বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বার্থই বেশি দেখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিকেলে তিনি বসেন পপুলারে। ডা. সুশান্তের স্ত্রী স্বপ্না রাণী তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতলের গাইনি বিভাগের কনসালট্যান্ট। তবে এখানে তিনি সময় দেন খুবই কম। স্বামীর দাপটে তিনিও ক্ষমতাবান হিসেবে আবির্ভুত হয়ে উঠেছেন। নিজের খেয়াল-খুশিমতোই অফিস করেন। হাসাপাতালের পরিচালক বা অন্য কেউ তার অনিয়মের বিষয়ে কিছু বলারও সাহস পান না। গত করোনাকালে স্বপ্না রাণী সবচেয়ে কম দিন হাসপাতালে আসা চিকিৎসক, জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।