খুনের হাতেখড়ি টিভি সিরিয়াল

সোমবার, মার্চ ৮, ২০২১

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম ইপিজেড এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমানের বাসায় একটি উড়ো চিঠি আসে। হাবিবুর রহমান খাম ছিঁড়ে চিঠি পড়েই হতবাক। চিঠি পাঠিয়েছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস। চিঠিতে সংগঠনের জন্য ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। এমন চিঠি পেয়ে আতঙ্কে হাবিবুর রহমান।

পুরো পরিবারের মধ্যে অজানা আশঙ্কা। হাবিবুর রহমানের নাওয়া খাওয়া বন্ধ। বাসা থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। তিনি বিষয়টি পুলিশকে জানান। পুলিশও বিষয়টি বেশ গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। হাবিবুর রহমানের নিরাপত্তায় বাসার সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বেশ কিছু দিন পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টিত থাকতে হয় হাবিবুর রহমানের পরিবারকে।

আর চিঠিও আসেনি। চাঁদাবাজদের কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি। পুলিশ হাবিবুর রহমানকে আশ্বস্ত করে বলে, এ নিয়ে টেনশন করার কিছু নেই। হয়তো কেউ ভয় দেখিয়েছে। হাবিবুর রহমানের ভয় কাটে না। ঘটনাটি ২০১৬ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহের।

হাবিবুরের বাসার কাছেই তার বোনের বাসা। ভগ্নিপতি জাহাঙ্গীর আলম গার্মেন্ট কর্মকর্তা। তাদের এক মেয়ে শামীমা আক্তার দশম শ্রেণির ছাত্রী। হাবিবুরের দুই শিশুসন্তান। বড়জনের বয়স ৫, আরেকজনের ৩। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বোনের মেয়ে শামীমা বেড়াতে আসে হাবিবুরের বাসায়।

বিকালে ফিরে যাওয়ার সময় হাবিবুরের দুই মেয়েকে নিজেদের বাসায় নিয়ে যায়। শামীমা ওদের খুব আদর করে। বাসায় নিয়ে খেলাধুলা করে। রাতেও রেখে দেয় তাদের। পরদিন সকালে শামীমার মা বাইরে কাজে চলে যান। বাসায় থাকে শামীমা আর হাবিবুরের দুই মেয়ে।

দুপুরে বাইরে থেকে বাসায় ফেরেন শামীমার মা। ঘরে ঢুকেই আতঙ্কে চিৎকার দেন তিনি। ঘরের ফ্লোরে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে তার মেয়ে শামীমা। তিনি তার মাথায় পানি ঢালেন। জ্ঞান ফিরে আসে শামীমার। ওই ঘরে পড়েছিল একটি চিঠি। আইএসের পতাকা আঁকানো। শামীমার মা চিঠি খুলেই ভয় পেয়ে যান।

চিঠিতে আইএসের জন্য ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। শামীমা তার মাকে বলে, বাসায় দুজন লোক এসে তিন বছরের মামাতো বোন রিয়া মণিকে নিয়ে গেছে। শামীমার মা তখন ভাইয়ের বড় মেয়েকে খোঁজ করতে থাকেন।

বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় তাকে। কিন্তু ছোটটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খবর পাঠানো হয় হাবিবুর রহমানকে। তিনি তার ছোট মেয়ে রিয়া মণির নিখোঁজের খবর শুনে ছুটে আসেন। তার মাথায় তখন আইএস। মনে মনে পুলিশের ওপর বিরক্ত হন। পুলিশ তৎপর হলে হয়তো এমন ঘটনা ঘটত না।

পুলিশ বাথরুমে আটকে থাকা হাবিবুরের বড় মেয়েকে প্রশ্ন করে। কেন বাথরুমে ছিলে তুমি? জবাবে সে বলে, ‘আমরা লুকোচুরি খেলছিলাম। শামীমা আপু আমাকে আটকে রেখে লুকোচুরি খেলছিল’। এমন জবাবে পুলিশের সন্দেহের তালিকায় যুক্ত হয়ে যায় শামীমা।

আপাতত পুলিশ তাকেই সন্দেহের প্রথম দিকে রাখে। পুলিশ তাকে জেরা করে। দীর্ঘ সাত ঘণ্টা জেরার পর শামীমা যা বলল পুলিশকে, সেটি শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ। শামীমা মাথা নিচু করে বলে, ‘হ্যাঁ আমি রিয়া মণিকে বালিশচাপা দিয়ে মেরে ফেলেছি।’ পুলিশি তদন্তে জানা যায়, প্রতিশোধের স্পৃহায় তিন বছরের শিশু মামাতো বোনকে খুন করে দশম শ্রেণির ছাত্রী শামীমা আক্তার।

নিজেকে আড়াল করতে জঙ্গি সংগঠন আইএসের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টাও করেছিল সে। শুধু তাই নয়, এ ঘটনায় জড়িয়ে দিয়েছিল তার দুই বন্ধুকেও। শেষ পর্যন্ত পুলিশি জেরার মুখে স্বীকার করে যে, টাকা চুরির দায়ে মামির ভর্ৎসনার জবাব দিতেই তিন বছরের মামাতো বোনকে হত্যা করেছে সে।

পুলিশ জানায়, ইপিজেড থানার আলিশাহ কবরস্থান গলির ভাড়াটিয়া হাবিবুর রহমানের দুই মেয়ের মধ্যে ছোট রিয়া মণি। তাদের বাসায় এক দিন বেড়াতে গিয়েছিল হাবিবুর রহমানের ভাগ্নি গার্মেন্ট কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ে শামীমা আক্তার। সেই সময় কিছু টাকা চুরি গেলে তার মামি শামীমাকেই লাঞ্ছিত করেন। এরপর থেকে মামিকে জবাব দেওয়ার সুযোগ খুঁজছিল শামীমা।

শামীমা টিভিতে ভারতীয় সিরিয়ালগুলো দেখে নিয়মিত। কীভাবে খুন করতে হয়, তা দেখে রপ্ত করে নিজেকে। এসব দেখে নিজেই মামির ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিশোধ হিসেবে তার ছোট মামাতো বোন তিন বছর বয়সী রিয়া মণিকে খুন করবে সে। সে অনুযায়ী ঘটনার তিন দিন আগে একটি চিঠি লেখে মামার কাছে। চিঠিতে সে লিখে, ‘আমরা আইএসের সদস্য।

৫ লাখ টাকা জোগাড় করে রাখ। কখন কোথায় টাকা পৌঁছে দিতে হবে আমরা পরে জানাব। পুলিশ আর র‌্যাবকে জানালে পরিণাম হবে ভয়ংকর। জয় আইএসের জয়।’ চিঠিতে আইএসের পতাকাটিও এঁকে দেয় শামীমা।

পরদিন সকালে মামিকে অনুরোধ করে দুই মামাতো বোনকে নিজেদের বাসায় এনে রাখে শামীমা। সকালে তার মা তার ছোট বোনকে স্কুলে দিয়ে আসতে বের হয়ে গেলে সুযোগটা লুফে নেয়। শামীমা দুই মামাতো বোনকে নিয়ে লুকোচুরি খেলার অভিনয় করে। পাঁচ বছর বয়সী মামাতো বোনকে লুকিয়ে থাকার কথা বলে বাথরুমে আটকে রাখে।

এরপর রিয়া মণিকে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। রিয়া মণির লাশ একটি পলিথিন ব্যাগে ভরে ড্রামভর্তি পানিতে চুবিয়ে রাখে। ওপরে একটি বালতি বসিয়ে দেয়। এরপর আগে থেকে লেখা চিঠিটা তার মা এসেই যাতে দেখতে পান, সে জন্য টেবিলের ওপর রেখে দেয়।

নিজের হাত-পা মুখ ওড়না দিয়ে বেঁধে অচেতনের মতো পড়ে থাকে। তার মা এসে মেয়ের এ অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। তাকে মুক্ত করার পর শামীমা তার মাকে বলে, সে রান্নাঘরে ভাত রান্না করছিল। এ সময় দরজায় টোকা শুনে খুলে দিতেই একজন জোর করে ঘরে ঢুকে তার মাথায় আঘাত করে। এতে সে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। অচেতন হয়ে পড়ে থাকে।

এরপর আর কিছুই মনে নেই তার। এদিকে রিয়া নিখোঁজের খবর শুনে তার মা-বাবা বিষয়টি ইপিজেড থানাকে জানায়। ওসিসহ অন্য কর্মকর্তারা ছুটে আসেন। এরই মধ্যে বাথরুমে আটকে রাখা মামাতো বোনটিকে বের করা হয়। পুলিশ শামীমার সঙ্গে কথা বলেন। পরে মামাতো বোনের সঙ্গে কথা বললে সে জানায়, আপুই তাকে লুকোচুরি খেলার কথা বলে।

সে বাথরুমে লুকিয়ে থাকতে ঢুকলে বন্ধ করে দেয় দরজা। থানায় নিয়ে যাওয়া হয় শামীমাকে। টানা সাত ঘণ্টা জেরা করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করতে থাকে শামীমা। এ সময় সে বলে, আইএস জঙ্গিরা বাসায় এসে তাকে জিম্মি করে রিয়াকে নিয়ে গেছে।

আবার বলে, তার প্রেমিক এবং আরেক বন্ধু এসে মুক্তিপণের জন্য রিয়াকে নিয়ে গেছে। পরে রাত দেড়টার দিকে সে স্বীকার করে আইএস বা অন্য কিছু নয়, রিয়াকে সে-ই খুন করেছে মামির ওপর প্রতিশোধ নিতে। তার তথ্যানুযায়ী ড্রামের ভিতর থেকে রিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় রিয়ার বাবা বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় গ্রেফতার করা হয়। শামীমাকে পাঠানো হয় জেলহাজতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট সহকারী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, ভারতীয় টিভি সিরিয়াল আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে। এ থেকে বেরিয়ে না এলে ভবিষ্যতে আরও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে মানুষকে। আর এই কাজটি করতে হবে বাবা-মাকেই। বাংলাদেশ প্রতিদিন।