৪৫০০০ প্রাইমারি স্কুলে শহীদ মিনার নেই

রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১

ঢাকা : প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছর পরও শহীদ মিনার নেই পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ভেচকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হয় কলাগাছ দিয়ে অস্থায়ী শহীদ মিনার বানিয়ে। একই চিত্র লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার শহীদ স্মৃতি আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও।
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পার হলেও বিদ্যালয়টিতে নেই শহীদ মিনার। ২১ ফেব্রুয়ারিতে জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। যদিও শিশুশিক্ষার আঁতুড়ঘর বলা হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়কে। শিশুমনে চিন্তা-চেতনা-দেশপ্রেম জাগ্রত করার অন্যতম মাধ্যম বা মূলভিত্তিও ধরা হয় প্রাথমিক শিক্ষাকে। পারিবারিক গণ্ডির বাইরে শিশুদের মনোজগতের বিকাশ ঘটে মূলত প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। অথচ এই প্রাথমিক বিদ্যালয়েই উপেক্ষিত শহীদ মিনার।

দেশের বেশিরভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আজও শহীদ মিনার নির্মাণ নিশ্চিত করা হয়নি। অনেক শিশুরই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগে চাক্ষুষভাবে জানার সুযোগই হয় না শহীদ মিনার কী? শিশুদের এই আঙিনায় ভাষার জন্য লড়াই-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের স্মৃতিচিহ্ন শহীদ মিনার না থাকাকে হতাশাজনক বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহীদ মিনার নির্মাণের সরকারি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কর্তৃপক্ষের ওপরে। তাই শহীদ মিনারের তাগিদ নেই স্কুল কর্তৃপক্ষেরও। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে স্কুল চত্বরে শহীদ মিনার নির্মাণের শুধু একটি মৌখিক নির্দেশই থাকে। যদিও তা বাধ্যতামূলক নয়। অবশ্য কয়েক বছর ধরে এই মৌখিক নির্দেশও অনেক বিদ্যালয়ে কার্যকর করা হচ্ছে।

শহীদ মিনার নির্মাণে সরকারি বাধ্যবাধকতা না থাকার ব্যাপারটিকে হতাশাজনক বলে অভিহিত করেছেন সাক্ষরতা অভিযানের পরিচালক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পক্ষের সরকারের কাছে জাতি এটি আশা করে না। শহীদ মিনার নির্মাণে প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে তেমনটাও নয়। শুধু উদ্যোগের অভাবেই শতভাগ স্কুলে শহীদ মিনার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।’

একই ধরনের মতপ্রকাশ করে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের নেতা হারুন হাবীব বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই। এটা আমি নিজেও দেখেছি। এটি দুঃখজনক। শিশুমনে কোনো কিছু গেঁথে দিতে হলে প্রাথমিক শিক্ষা অনেকাংশে গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষার জন্য লড়াই-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস এখান থেকেই শেখানো-জানানো উচিত। তবেই আমাদের নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেম-চেতনা জাগ্রত করা সম্ভব হবে।

হারুন হাবীব আরও বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের কাছে দাবি জানাই দেশের মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সারা দেশে পঁয়ষট্টি হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে হাজার বিশেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার রয়েছে বলে দাবি করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এ এম মনসুর আলম। তিনি বলেন, ‘স্কুল চত্বরে শহীদ মিনার নির্মাণের কোনো তহবিল নেই। তাই বাধ্যতামূলক বলতে পারি না। আমরা স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়ে থাকি স্কুল চত্বরে শহীদ মিনার নির্মাণ করার।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর ডিজির দাবি, অনেক স্কুলে ক্লাসরুমেরই জায়গা থাকে না। ফলে শহীদ মিনার করার মতো জায়গাও হয় না। বিশেষ করে শহর অঞ্চলে জায়গার সংকট বেশি। ডিজি বলেন, স্কুল কারিকুলামে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তো আছেই। স্কুলে তা পড়ানো হয়। কোনো কোনো স্কুলে শহীদ মিনার আছে, কোনো স্কুলে নির্মাণাধীন। সে হিসেবে ২০ হাজারের বেশি স্কুলে শহীদ মিনার আছে বলা যায়।

তিনি আরও বলেন, কোনো কোনো স্কুলে ভাবগাম্ভীর্য ঠিক না রেখেই শহীদ মিনার করা হয়। তাই আমরা একটি নির্দিষ্ট ডিজাইন তৈরি করেছি। আগামী সপ্তাহে ডিজাইন চূড়ান্ত করে সব স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তারপর শহীদ মিনার নির্মাণে মৌখিক নির্দেশনা আরও জোরালো করা হবে।

তবে ডিজির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। রংপুর জেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১ হাজার ৪৫৮টি। শহীদ মিনার রয়েছে মাত্র ৩০০ স্কুলে। যার মধ্যে বেশিরভাগ স্কুল রয়েছে মাধ্যমিক স্কুলের সঙ্গে। ওই জেলায় প্রায় ৪০০ স্কুলে শহীদ মিনার নির্মাণাধীন। ফেনী জেলায় মোট স্কুল রয়েছে ৫৫৯টি। ফেনী জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই জেলায় মাত্র এক শোর মতো স্কুলে শহীদ মিনার রয়েছে। এখানেও মাধ্যমিক স্কুলের বাউন্ডারিতে যেসব প্রাথমিক স্কুল রয়েছে, সেগুলোতেই কেবল আছে শহীদ মিনার। মূলত সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনারের চিত্র একই।

ফেনী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলে মূলত শতভাগ স্কুলে শহীদ মিনার করা সম্ভব হয় না।’

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, গত দুই বছরে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করার একধরনের তাগিদ দেখা যাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে নিজ খরচায় শহীদ মিনার করে নেওয়ার মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়। যেহেতু বাধ্যবাধকতা নেই, তাই শতভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের ব্যাপারটি উপেক্ষিতই থাকে। এ প্রসঙ্গে অন্তত ২০টি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা জানান, নিজ খরচায় শহীদ মিনার করা তাদের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য। তাই ইচ্ছে থাকলেও শহীদ মিনার নির্মাণ করা সম্ভব হয় না। তারা বলেন, দেশের সব কটি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করার জন্য সরকারি একটি তহবিল রাখা উচিত। তাহলেই শতভাগ স্কুলে নিশ্চিত হবে শহীদ মিনার।

রাশেদা কে চৌধূরীও শতভাগ বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নিশ্চিতের তাগাদা দিয়ে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বলা যায় শহীদ মিনার উপেক্ষিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অনতিবিলম্বে শতভাগ শহীদ মিনার স্থাপন করা উচিত। স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী শহীদ মিনার চায় না। এখন তো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল ক্ষমতায়। এই সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার থাকবে না এটা কি মানা যায়? ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়েই আজকে স্বাধীনতা। ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও নিজেদের সক্রিয়তা বিকাশের অংশ ২১ ফেব্রুয়ারি, শহীদ মিনার।

স্কুলের আঙিনায় শহীদ মিনারের মতো একটি স্মৃতিফলক থাকলে শিশুমনে চেতনার ভিত্তি শক্তিশালী হবে উল্লেখ করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, প্রাথমিক স্কুলে শহীদ মিনার থাকলে শহীদ দিবস কী, ভাষার জন্য আমাদের যে লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে, এই দিবসের তাৎপর্য কী, বিদ্যালয় চত্বরে শহীদ মিনার থাকলে শিশুদের এসব জানার আগ্রহ বাড়বে। একটা বিষয় সামনে থেকে দেখা অন্য রকম ব্যাপার।

শতভাগ বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার না থাকার কারণ জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, ‘কে বলেছে নাই। সব স্কুলেই শহীদ মিনার আছে।’

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণে সরকারিভাবে কোনো তহবিল বরাদ্দ থাকে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যবস্থা আমরা অন্যভাবে করে দিই।’ অন্যভাবে কী তা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী আবারও বলেন, ‘অন্যভাবে।’ এখন সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন জাকির হোসেন।