জিয়াউর রহমানের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী আজ

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৯, ২০২১

ঢাকা : বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক জিয়াউর রহমানের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী আজ। জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের বগুড়া জেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। জন্ম ও শৈশবে তার ডাক নাম ছিলো কমল। তার পিতার নাম ছিল মনসুর রহমান এবং মাতার নাম ছিল জাহানারা খাতুন ওরফে রানী। পাঁচ ভাইদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয়। তার পিতা কলকাতা শহরে এক সরকারি দপ্তরে রসায়নবিদ রূপে কর্মরত ছিলেন। তার শৈশবের কিছুকাল বগুড়ার গ্রামে ও কিছুকাল কলকাতা নগরীতে অতিবাহিত হয়। ভারতবর্ষ বিভাগের পর তার পিতা পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি নগরীতে চলে যান। তখন জিয়া কলকাতার হেয়ার স্কুল ত্যাগ করেন এবং করাচি একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন। ওই বিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং তারপর ১৯৫৩ সালে করাচিতে ডি.জে. কলেজে ভর্তি হন। একই বছর তিনি কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট রূপে যোগদান করেন।

একজন সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও তাঁর জীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দেশের সকল সঙ্কটে তিনি ত্রাণকর্তা হিসেবে বার বার অবতীর্ণ হয়েছেন। দেশকে সংকট থেকে মুক্ত করেছেন। অস্ত্র হাতে নিয়ে নিজ দেশের জন্য তিনি বার বার যুদ্ধ করেছেন। জিয়াউর রহমান সময়ের প্রয়োজনে আর গণতন্ত্র রক্ষায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তাঁর গড়া সে রাজনৈতিক দল তার সহধর্মিণী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আজ দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃত। আর বেগম খালেদা জিয়া দেশের সবচেয়ে আপোষহীন জনপ্রিয় নেতৃত্বে পরিণত হয়েছেন। জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা আর গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপোষহীনতার জন্য খালেদা জিয়াকে এই দেশের জনগণ তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন।

১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে অসীম সাহসিকতার সাথে তিনি যুদ্ধ করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের একটি সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। বিশ্ব-মানচিত্রে তিনি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশীদের ব্যাপকভাবে পরিচিত করিয়েছেন তাঁর স্বাতন্ত্র আর দেশপ্রেমীকতার পরিচয়ে। জাতির মর্যাদাকেও বিশ্বব্যাপী সমুন্নত হয়েছে তাঁর সেই গণতান্ত্রীক শাসনামলে।

মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার জিয়াউর রহমানকে বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত করে। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের গণমানুষের কাছে মহান স্বাধীনতার ঘোষক। ১৯৭১ সালে ২৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন মেজর জিয়াউর রহমান। অসাধারণ দেশপ্রেমিক, অসম সাহসিকতা, সততা-নিষ্ঠার প্রতীক জিয়াউর রহমানেরদ এই দেশ আর গণতন্ত্রের জন্য অবদান অসামান্য।আর সেই থেকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর তারই সহকর্মী খন্দকার মোশতাক আহমদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ অভ্যুত্থান ঘটে। দেশের সেই চরম ক্রান্তিকালে সিপাহি-জনতার মিলিত প্রয়াসে জিয়াউর রহমান নেতৃত্বের হাল ধরেন।রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র, বাক-ব্যক্তিস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন। জাতির মধ্যে একটি নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করে তাদেরকে জাগিয়ে তুলতে তিনি সফল হয়েছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ কারণেই দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান পাওয়া একজন নেতা। বাংলাদেশের বইগুলো থেকে কেউ চাইলে হয়তো কালো কলমে লেখা ইতিহাস বিকৃত করার মত হীনতা দেখাতে পারে তবে, যে ভালোবাসার বীজ বপন করে দিয়ে গেছেন তিনি তাঁর শাসনামলে সেই ভালোবাসার বীজ বেঁচে থাকবে অনাদি অনন্তকাল ধরে।

১৯৮১ সালের ২৯শে মে বিপদের সমূহ সম্ভাবনা জেনেও জিয়া চট্টগ্রামের স্থানীয় সেনাকর্মকর্তাদের মধ্যে ঘটিত কলহ থামানোর জন্য চট্টগ্রামে আসেন এবং সেখানে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে থাকেন। তারপর ৩০শে মে গভীর রাতে সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়া নিহত হন। জিয়াউর রহমানকে ঢাকার শেরে বাংলা নগরে দাফন করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার জানাজায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম ঘটে যেখানে প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ সমবেত হয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানান।

জিয়াউর রহমানের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বাণীতে বলেন, মিথ্যা প্রতিশ্রুতির অপরাজনীতি দ্বারা জনগণকে প্রতারিত করে স্বাধীনতাত্তোর ক্ষমতাসীন মহল যখন মানুষের বাক-ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে হরণ করে গণতন্ত্রকে মাটিচাপা দিয়েছিল, দেশকে ঠেলে দিয়েছিলো দূর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে, বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির আন্তর্জাতিক খেতাবপ্রাপ্ত হতে হয়, জাতির এরকম এক চরম দু:সময়ে ৭ই নভেম্বর সৈনিক জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে শহীদ জিয়া ক্ষমতার হাল ধরেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেই তিনি বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পূনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। উৎপাদনমূখী রাজনীতি প্রবর্তন করে তিনি দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প বিপ্লব, সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পূণর্খনন করেন। গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অতি অল্প সময়ে ৪০ লক্ষ মানুষকে অক্ষর জ্ঞান দান করেন।‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখারও অবিণাশী দর্শন। শহীদ জিয়ার জন্মদিনে তাঁর প্রদর্শিত পথেই আমরা আধিপত্যবাদের থাবা থেকে মুক্ত হবো ও গণতন্ত্র ফিরে পাবো। আর এর জন্য সর্বশক্তি দিয়ে ‘গণতন্ত্রের মা’ গৃহবন্দী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।

বিএনপির কর্মসূচি
মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯ জানুয়ারী সকাল ৬টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ১১টায় বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ শেরেবাংলা নগরস্থ শহীদ জিয়ার মাজারে ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পার্ঘ অর্পণ করবেন। বেলা ১২টায় দলের বিভিন্ন ইউনিট এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন শেরেবাংলা নগরস্থ শহীদ জিয়ার মাজারে ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পার্ঘ অর্পণ করবেন।

দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র উদ্যোগে কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় বেলা ৩টায় ভার্চুয়াল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত আলোচনা সভায় দেশব্যাপী জেলা ও মহানগর বিএনপি’র নেতৃবৃন্দও সংযুক্ত থাকবেন। শহীদ জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসহ পেশাজীবী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহ শহীদ জিয়ার জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে চিত্রাঙ্কন, রচনা প্রতিযোগিতা, আলোকচিত্র প্রদর্শণ এবং বিএনপি ও ড্যাবসহ চিকিৎসকদের সংগঠন ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের
আয়োজন করবে।

নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নীচতলায় সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বিএনপি’র উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হবে। অনুরুপভাবে পরের দিন বুধবার নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সকাল ১০টা থেকে ড্যাব-ঢাকা মহানগর উত্তর এর উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করা হবে। অনুরূপভাবে আগামীকাল সারাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ের ইউনিটসমূহ নিজেদের সুবিধানুযায়ী সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করবে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে সুপ্রীম কোর্ট বার অডিটোরিয়ামে আগামী ২০ জানুয়ারী বুধবার বেলা ২টায় শহীদ জিয়ার কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।