সারাদেশে পাঁচদিন দেখা নেই সূর্যের

রবিবার, ডিসেম্বর ২২, ২০১৯

ঢাকা: হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশায় কাঁপছে কিশোরগঞ্জ জেলার মানুষ। পৌষের প্রথম সপ্তাহে হঠাৎ করেই এবার শীতের দাপট বেড়েছে কিশোরগঞ্জে। কাঁচের মতন স্বচ্ছ শিশিরবিন্দুগুলো ভর করেছে সবুজ প্রকৃতিতে। গত কয়েকদিনের শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। গত পাঁচদিন এই জেলায় সূর্যের দেখা মিলেনি। রবিবার (২২ ডিসেম্বর) দুপুর ১১ টা থেকে ঘন কুয়াশা কেটে গেলেও বাহিরে বইছে হিমেল হাওয়া। দিনের বেলায় যানবাহনগুলো হেড লাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে।তীব্র শৈত্য প্রবাহে জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে।

সর্বত্র হঠাৎ শীত জেঁকে বসায় খেটে খাওয়া মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। অফিসগামী মানুষ গায়ে গরম কাপড়, কান টুপি ও গলায় মাফলার পেঁচিয়ে অফিস করছেন। সকালে তারা ঘর থেকে বের হচ্ছেন একটু দেরি করে, তেমনি ঘরেও ফিরছেন খুব দ্রুত। সন্ধ্যার পর বা সারাদিন অন্যান্য দিনের তুলনায় শহরের বিভিন্ন স্থানে জনসমাগম দেখা যাচ্ছে খুব কমই। প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কেউ-ই ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েছে আরও বেশি। ভোরে তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে যেতে হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। শীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমে গেছে তুলনামূলক হারে। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে অনেক জায়গায় ভীড় করে গ্রামবাসীকে আগুন পোহাতেও দেখা গেছে। তীব্র শীতের কারনে শহরের বিভিন্ন মার্কেটের দোকানে ঘুরে দেখা গিয়েছে গরম কাপড় কিনতে সব শ্রেণি পেশার মানুষ ভীড় জমিয়েছেন। দোকানিরাও বেশ আনন্দে-উল্লাশে গরম কাপড় বিক্রি করছেন। তবে দামী দামী দোকানের থেকে ফুটপাতের দোকান গুলোতে সবছেয়ে বেশি ভীড় দেখা গিয়েছে।

এদিকে কিশোরগঞ্জে ঠান্ডার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শীতজনিত নানা রোগ। গত চারদিনে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াম, হাঁপানি, অ্যাজমা, হৃদরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে শিশুসহ বয়স্ক রোগী। কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. সুলতানা রাজীয়া জানান, শীতজনিত রোগে আক্রন্ত হয়ে শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শীতে কিশোরগঞ্জের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে হাওর অঞ্চলের মানুষসহ নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীরা। গোবাদিপশুও রেহাই পাচ্ছে না শীতের প্রকোপ থেকে।

এদিকে এমন ঘন কুয়াশা অব্যাহত থাকলে কৃষিতে ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করছেন হাওর অঞ্চলের কৃষকরা। এই সময়টায় এসে কুয়াশার কারণে বরাবরই বোরো বীজতলা ও রবি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে বোরোতে কোল্ড ইনজুরি ও আলুতে লেটব্লাইট (পচন) দেখা দেয়। তবে পরস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বলেন, এবছর শুরু থেকেই শীতের প্রকোপ কম। তবে মাঝ সময়ে এমন আবহাওয়া রবি শস্যের জন্য কাল হয়ে ওঠে। তাই কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা সতর্ক রয়েছেন। এখন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পরিদর্শন করছেন। ফসলকে নিরাপদ রাখতে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

এছাড়া কৃষকরাও আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠেছেন। মোবাইল অ্যাপস ও হট লাইনের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টাই কৃষি তথ্যসেবা নিচ্ছেন। সেই মতে ফসলের পরিচর্যাও করছেন বলে জানান কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। কিশোরগঞ্জের রেল স্টেশনসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অবস্থানকারী ছিন্নমূল মানুষগুলো শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্ট পোহাচ্ছে। শীতার্ত মানুষগুলো এক টুকরো গরম কাপড়ের জন্য তাকিয়ে আছেন সমাজের বিত্তবানদের দিকে।

কেটে খাওয়া আমিনুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত সরকারি একটা কম্বল পাইনি। দুইদিন থেকে কাজে বের হতে পারি নাই, তাই পরিবার নিয়ে কষ্টে আছি। কর্মজীবী সোহেল হোসেন বলেন, শীতের সময়টা পিঠাপুলি বা সবজির জন্য ভালো হলেও আবহাওয়ার দিক থেকে একটু ভিন্ন। অধিক কুয়াশার কারণে সকালে অফিস যেতে ঠিকমতো যানবাহন পাওয়া পায় না। অফিসে বেরোতেও একটু কষ্ট হয়ে যায়। দিনটাও চলে যায় খুব দ্রুততম সময়ে।

ইনসাব আলী নামে এক বৃদ্ধ বলেন, কয়েকদিন ধরে প্রচন্ড শীত পড়ছে। বয়স্ক শরীর নিয়ে এই শীতে কষ্টটা বেড়েছে। অনেকেরই গরম কাপড়ের অভাব থাকলেও সাহায্যের জন্য তেমন কেউ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না। অন্যান্যবারের মতো শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হলে এই সমস্যা একটু হলেও কমবে। কিশোরগঞ্জ শহরের তামান্না ইসলাম বলেন, গত কয়েকদিন ধরে কিশোরগঞ্জে শীতের মাত্রা বেড়েছে। কয়েকদিন আগেও ভালো ছিল। রোদে ঝলমল করতো আবহাওয়া। আর এখন ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের দেখা প্রায় মিলেই না। বরং মেঘের মতো কুয়াশার পানি পড়ছে।

সদর উপজেলার বাসিন্দা সজীব বলেন, পাঁচদিন ধরে কিশোরগঞ্জে যে হারে শীতের তীব্রতা বাড়ছে, এভাবে থাকলে আমাদের মোকাবিলা করা কঠিন। নিম্ন আয়ের মানুষ খুব কষ্টে পড়ে গেছে এখনই। অবশ্য আমরা চেষ্টা করছি তাদের সহযোগিতা করার। এদিকে, জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা শীতার্তদের পাশে এসে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিত্তশালীদের। তারা বলছেন, হাড়কাঁপানো শীতে কষ্ট পাচ্ছে অসহায় মানুষ। তাদের পাশে দাঁড়ান।