স্মৃতিসৌধের শহীদ সমাধীতে পা তুলে বসে অবমাননার প্রতিবাদে সাভারে নিন্দার ঝড়

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯

জাহিন সিংহ, সাভার থেকে : বাবা কুখ্যাত রাজাকার। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত পলাতক আসামী। ছেলে অস্ত্রসহ নাশকতা মামলার আসামী। সেই রাজাকার পুত্রের হাতেই এবার ভুলুণ্ঠিত হলো জাতীয় স্মৃতিসৌধের মর্যাদা।

এ এইচ এম শামসুদ্দিন পলাশ নামের কুখ্যাত রাজাকার পুত্র ও তার সতীর্থরা বিজয়ের ৪৮ তম বার্ষিকীতে এবার জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে অমর্যাদা করেছেন লাখো শহীদের স্মারক শহীদদের সমাধী।

গণকবরে বসে পা দুলিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মশকরা করে তুলেছেন ছবি। সেই ছবি আবার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে নিজের দেওয়ালে তুলে নিজেই প্রকাশ করেছেন শহীদেদের প্রতি ব্যাঙ্গ আর তামাশার চিত্র।

সাভারের বাসিন্দা এই রাজাকার পুত্র এ এইচ এম শামসুদ্দিন পলাশ বাজার বাসষ্ট্যান্ডের মনসুর মার্কেটের স্বত্বাধিকারী মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত পলাতক আসামী আবুল কালাম ওরফে একেএম মনসুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র।

রাজাকার পুত্রের এই আচরণে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম ও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে।

সাভার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মজিবুর রহমান এ্ই আচরণের জন্যে রাজাকারপুত্র এ এইচ এম শামসুদ্দিন পলাশের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধে একজন দু’জন নয়। ১১১ জনকে সরাসরি হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হন আবুল কালাম ওরফে এ কে এম মনসুর রাজাকার। নোয়াখালী জেলার সুধারাম এলাকার কুখ্যাত এই রাজাকার আবুল মনুসর দীর্ঘদিন ধরেই সাভারে ঘাপটি মেরে ছিলেন এ কে এম মনসুর পরিচয়ে। পালিয়ে যাবার আগে এই রাজাকার জড়িত ছিলেন (জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা) জাসাসের সঙ্গে। হয়ে উঠেছিলেন বিএনপির নীতি নির্ধারণীদের একজন।

রাজাকার পরিচয় আড়াল করে সাভারে গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। হয়ে ওঠেন বিএনপি’র শীর্ষ নীতি নির্ধাকরদের একজন।

সূত্রমতে, বিএনপির আমলে তৎকালীন বিরোধী দলের ছাত্রনেতা,সাভার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ও উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম রাজীব ও তার সহোদর,তেতুলঝোঁড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফকরুল আলম সমরের নেতৃত্বে এই যুদ্ধপরাধীদের বিচার দাবী করে মনুসুর মার্কেট অভিমুখী বিশাল মিছিল-ও হয়।

১০১৮ সালের ১৪ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নোয়াখালী জেলার সুধারাম এলাকার এই রাজাকারসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অবশ্য তার আগেই গা ঢাকা দেন রাজাকার আবুল কালাম ওরফে একেএম মনসুর।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেত্বত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চের রায়ে আদালত বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের আনা তিন অভিযোগের সবই প্রমাণিত হয়েছে। রাজাকার মনসুরসহ মৃত্যুদণ্ডের তিন আসামির সাজা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করতে হবে। সেই সঙ্গে পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করে সাজা কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের মামলায় রায়ের এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করা যায়। তবে পলাতক আসামিকে সে সুযোগ নিতে হলে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

মনসুর রাজাকার সেই সুযোগ-ও হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন একজন প্রসিকিউটর।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ১১১ জনকে সরাসরি হত্যার অভিযোগ থাকলেও আসামিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নোয়াখালীর সুধারামে ১১ জনকে হত্যার তিনটি অভিযোগ প্রমানিত হয়। ২০১৬ সালের ২০ জুন অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এ চার রাজাকারের বিচার শুরু হয়। ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এ মামলায় প্রাথমিকভাবে পাঁচজনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেও অভিযোগ গঠনের আগে মো. ইউসুফ আলী নামে এক আসামি গ্রেফতারের পর অসুস্থ হয়ে মারা যান।

ধসে পড়া রানা প্লাজার ঠিক উল্টো দিকে থাকা মনসুর মার্কেটটির মালিক এই রাজাকার মনসুর।

জনশ্রুতি আছে, বর্তমানে বিদেশে তার কাছে হুন্ডির মাধ্যমে দেশের সম্পদ পাচার করা হচ্ছে আর রাজাকারের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হতে পারে এমন আশংকায় আগে থেকেই সম্পত্তি সন্তানদের নামে অবৈধ পন্থার হস্তান্তর করেছেন এই রাজাকার।

নাম প্রকাশ না শর্তে মনসুর মার্কেটের এক মিষ্টি বিক্রেতা জানান, এখন রাজাকারপুত্ররা চলেন আওয়ামী লীগের নেতাদের পাওয়ারে। মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতা এই রাজাকার পুত্রকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের সে সময়ের সভাপতি মঞ্জুরুল আলম রাজীব গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, আমরা এই রাজাকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছিলাম। আন্দোলন করেছিলাম। পদযাত্রা, পথসভা, ঝাড়ু মিছিল করেছিলাম। এর জেরে বিএনপি জোট সরকারের সময় আমাদের মিথ্যে মামলা দিয়ে এলাকা ছাড়া করা হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে আঁতাতের রাজনীতির বিনিময়ে পার পেয়ে যায় এই রাজাকার।

রায় প্রকাশিত হবার পর এই রাজাকারের পরিবারকে নজরদারিতে রাখার কথা জানিয়ে সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক মোফাজ্জল হোসেন বলেছিলেন, আমরা তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় নিশ্চিত হয়েছি কুখ্যাত এই রাজাকার তখন থাইল্যান্ডে পালিয়ে ছিলেন। বর্তমানে ভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন।

তিনি বলেছিলেন, আমরা জানতে পেরেছি, দেশ থেকে প্রতিদিন ১০ হাজার করে টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করা হয় বিদেশে। আর এই কাজটিই করে আসছিলেন রাজাকার পুত্র একেএম শামসুদ্দিন পলাশ ও জামাতা যুবদল নেতা আব্দুল রহমান।

এর আগে অবশ্য নাশকতার অভিযোগে একটি শ্যুটার গান ও ৫ রাউন্ড গুলিসহ রাজাকার পুত্র একেএম শামসুদ্দিন পলাশকে (৩৮) গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

২০১৭ সালের ১৭ জুন ৫ দিনের রিম্যান্ড প্রার্থনা করে এই রাজাকার পুত্রকে পাঠানো হয় আদালতে।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের পবিত্র স্থান জাতীয় স্মৃতিসৌধের গণকবরে বসে পা দুলিয়ে রাজাকার পুত্রের এই ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ায় তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে গোটা সাভারে।

রাজাকার পুত্রের সঙ্গে থাকা একজন জানান,সে মনসুর রাজাকারের ছেলে,এটা জানতাম। তবে আমাদের ব্যবহার করে জাতীয় স্মৃতিসৌধে এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পিতভাবে অবমাননা করবে তা ভাবনাতেও আসেনি।

এ ঘটনায় তিনি দু:খ প্রকাশ করে বলেন,ব্যক্তিভাবে আমি রাজাকারপুত্রের সাথে শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পনের জন্যে ক্ষমা প্রার্থী। কারণ এটা এক অর্থে মুক্তিযুদ্ধের শহীদের প্রতি পরিহাস।

সাভার কলেজের ৯৯ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিজেকে পূর্ণবাসনের জন্যে মশকরা করতে এই রাজাকার পুত্র গত ১৬ ডিসেম্বর যান জাতীয় স্মৃতিসৌধে। সেখানে তিনি নানান কায়দায় ফটোসেশন করে এক পর্যায়ে গণ কবরে বসেন বন্ধুদের নিয়ে। কবরের দেয়ালে পা দুলিয়ে দুলিয়ে পা দিয়ে অবমাননা করেন বীর শহীদদের।

যোগাযোগ করা হলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজুর রহমান শহীদদের প্রতি অবমাননার চিত্র দেখে ক্ষোভ করে বলেন, রাজাকারের ছেলের এত সাহস! বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আনা হয়েছে। এই রাজাকার পুত্র শহীদদের প্রতি যেভাবে অবমাননা করে যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন তার বিচার না হলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্না কষ্ট পাবে।

সামাজিকভাবে এই রাজাকারদের বয়কটের ডাক দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম সাভার শাখার নেতারা-ও।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে কুখ্যাত রাজাকার পুত্রের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।