চাকুরী হতে অপসারন হলেও জালিয়াতি করে বহাল দুদক, প্রধানমন্ত্রী, গণপূর্ত মন্ত্রী ও সচিব বরাবর অভিযোগ

গণপূর্তের প্রকৌশলী মইনুলের সীমাহীন দুর্নীতি

রবিবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯

স্টাফ রিপোর্টার : দুর্নীতির অভিযোগে গণপূর্ত অধিদফতরের দুইজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন এবং ডঃ মইনুল ইসলাম এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকে পুনরায় অভিযোগ করেছে গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির পক্ষে সোহেল রানা। গত বৃহস্পতিবার (১২ই ডিসেম্বর) দুদক অফিসে এ অভিযোগ করা হয়। একই দিনে একই অভিযোগ করা হয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সচিব বরাবর। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার (১২ই ডিসেম্বর) প্রধানমন্ত্রী ও গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছেও একই বিষয়ে অভিযোগ করেছেন সোহেল রানা।

অভিযোগপত্রে সোহেল রানা বলেন, গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলাম বিনা অনুমতিতে বিদেশ গমনের জন্য অনুপস্থিত অর্থাৎ উবংবৎঃরড়হ এর দায়ে অভিযুক্ত হন, যা ২০ জুন ২০১০ইং তারিখে এএসএম মামুনুর রহমান খলিলী, উপসচিব ও তদন্ত কর্মকর্তা কর্তৃক মতামত প্রদান করা হয়। তদন্তের মতামতের ভিত্তিতে তৎকালীন সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন কর্তৃক স্বাক্ষরিত পত্রে (শৃংখলা ও আপীল) বিধিমালা ১৯৮৫ এবর ৪(৩) (সি) উপ-বিধি অনুযায়ী ড. মঈনুল ইসলামকে চাকুরী হতে অপসারনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উক্ত সিদ্ধান্তের আলোকে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের মতামত গ্রহনের জন্য উপ সচিব মো: হেমায়েত হোসেন কর্তৃক স্বাক্ষরিত পত্র ২০ ডিসেম্বর ২০১২ইং তারিখে প্রেরণ করা হয়।

বাংলাদেশ সরকার কর্ম কমিশনের সচিব চৌধুরী মোঃ বাবুল হাসান কর্তৃক স্বাক্ষরিত পত্রে ২২ জানুয়ারী ২০১৩ইং তারিখে কর্তৃপক্ষের চাকুরী হতে অপসারনের সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষন করে পত্র প্রেরন করা হয়। পরবর্তীতে বিভাগীয় মামলার মতামত পুন: বিবেচনার জন্য বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পত্র প্রেরণ করা হলে কর্ম কমিশনের সচিব জনাব এ.কে.এম আমির হোসেন কর্তৃক স্বাক্ষরিত পত্রে বিধিগতভাবে প্রেরিত মতামত পুন: বিবেচনার সুযোগ নেই মর্মে কমিশন অভিমত ব্যক্ত করেছে বলা হয়। তা সত্ত্বেও তিনি কিভাবে চাকুরীতে পুন: বহাল হলেন এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তিনি জানান, গণপূর্ত অধিদফতরের দুইজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন এবং ডঃ মইনুল ইসলাম এর সীমাহীন দুর্নীতির ফলে প্রতিষ্ঠানটি নিমজ্জিত হতে বসেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ও গণপূর্ত মন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতির কোন তোয়াক্কাই করেননি গণপূর্ত অধিদফতরের দুই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন এবং ডঃ মইনুল ইসলাম। এ দুই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (মোসলেহ উদ্দিন এবং ডঃ মইনুল ইসলাম) বিভিন্ন ঠিকাদার থেকে পার্সেন্টেজ নিয়ে কাজ পাইয়ে দিতেন।

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলাম অতীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য ৩ বছরের ছুটি নিয়ে বিদেশ গমন করেন। পরবর্তীতে তিনি বিনা ছুটিতে আরো ৬ (ছয়) বছর বিদেশে ছিলেন। এসময় চাকুরী শৃংখলা ভঙ্গ করায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয় তার বিরুদ্ধে। দীর্ঘ প্রায় ০৯ বছর পর দেশে ফিরে তিনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিশেষ উপঢৌকনের মাধ্যমে ম্যানেজ করে আদালতে জাল কাগজপত্র জমা দিয়ে চাকুরীতে স্ব-পদে ফিরে আসেন।

গত ২০১৮ সালের ৫ জুন র‌্যাব সদর দপ্তরের কাজের জন্য টেন্ডার আহবান করা হয়। এই সময়ের টেন্ডার নিষ্পতির চেয়ারম্যান ছিলেন গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রকল্প ও বিশেষ প্রকল্পের (পিএনএসপি) বর্তমান কর্মকর্তা ড. মঈনুল ইসলাম। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রকল্পের দরপত্র গণপূর্ত’র ঢাকা সার্কেল-৩ থেকে আহবান ও তৎকালীন ঢাকা গণপূর্ত জোন থেকে মূল্যায়ন দেওয়ার কথা। র‌্যাব সদর দফতরের কাজের টেন্ডার গণপূর্ত’র ঢাকা সার্কেল-৩ এর অধীনে কিন্তু কোন নিয়মনীতি না মেনে বর্তমান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলাম ও তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগসাজশে অতিরিক্ত কমিশন আদায়ের জন্য গণপূর্ত’র সদর দফতর থেকে টেন্ডার আহবান করা হয়।

উত্তরাতে র‌্যাব এর এ হেডকোয়ার্টার নির্মানে ৫৫০ কোটি টাকার কাজে সমান সমান অথবা কিছু লেসে নেওয়ার কথা, সেখানে ১০% বেশিতে কাজ দিয়েছেন জিকে শামিমের প্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্সকে। এমনিভাবে সরকারের বড় অংশের লস দিয়ে নিজের পকেট ভারী করেছেন ডঃ মঈনুলসহ তার দোসররা। এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ ভবন নির্মাণে ১৫০ কোটি টাকার প্রকল্প ৫% বেশিতে ১ জন ঠিকাদারকে দিয়ে তার থেকে ১৩.৫% হারে ঘুষ নিয়েছে ডঃ মঈনুল ও তার সহযোগীরা। তিনি জানান, মোসলেহ উদ্দিন গণপূর্ত ঢাকা জোনে আসার জন্য দুই কোটি টাকা বাজেট নিয়ে তদবির করেন এবং গণপূর্ত মন্ত্রীর কানে আসলে তার পোস্টিং প্রস্তাব মন্ত্রণালয় থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেন। এর পর মন্ত্রীকে তার বিরুদ্ধে উঠা দুর্নীতির অভিযোগকে বানোয়াট বলে ভুল বুঝিয়ে ঢাকা জোনে পোস্টিং করানো হয়।

তিনি আরো জানান, ড. মঈনুল ইসলামের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দরখাস্ত করায় ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি বলেছেন, আমার বিরুদ্ধে যারা দরখাস্ত করেছেন আমি তাদের দেখে নেব। আমি অতিশীঘ্রই প্রধান প্রকৌশলী হব। এছাড়া গণপূর্ত মন্ত্রী মইনুলকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তোমার বাড়ি আর আমার বাড়ী একই জায়গায় তাই তুমি আমার বেন্ডেল লোক। তোমার কোনো চিন্তা নেই। এমতাবস্থায় আমি দরখাস্তকারী হয়ে অনেক ভয় ও ভীতির মধ্য দিয়ে সময় পার করছি। এছঅড়া আমরা সাধারণ ঠিকাদারগণ তার ভয়ে মানবেতর জীবন-যাপন অতিবাহিত করছি।

সোহেল রানা বলেন, সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বালিশ কেলেঙ্কারির ঘটনা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ানোর কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত হলেও গণপূর্ত অধিদফতরের বেশ কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি জাতীয় সংসদের তদন্ত কমিটি সংসদ ভবন এলাকার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করলেও তা মানেনি গণপূর্ত অধিদফতর।

বরং তাদের কয়েক দফা পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বিগত অষ্টম জাতীয় সংসদের অনিয়ম দুর্নীতি তদন্তে অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়াকে (বর্তমানে ডেপুটি স্পিকার) প্রধান করে গঠিত সংসদীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সংসদের গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় তখনকার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত কমিটির সুপারিশের আলোকে সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার ও ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট আখতার হামিদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে মামলা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন গণপূর্তের অভিযুক্ত প্রকৌশলীরা।

অভিযোগে বলা হয়, অষ্টম সংসদ আমলে গণপূর্ত শেরেবাংলা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মহসিন মিয়া এবং দুজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জিল্লুর রহমান ও মোসলেহ উদ্দিন দায়িত্বে ছিলেন। তদন্ত কমিটি কেনাকাটা ও সংস্কার কাজে অনিয়মের পাশাপাশি সংসদ লেকের সঙ্গে হাঁসের শেড নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগের প্রমাণ পায়। কিন্তু তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মহসিন মিয়াকে দুই দফা পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী করা হয়।

যিনি অবসরে চলে গেছেন। এ ছাড়া উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিনকে তিন দফা পদোন্নতি দিয়ে বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও জিল্লুর রহমানকে দুই দফা পদোন্নতি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করা হয়েছে। এর মধ্যে জিল্লুর রহমান আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের অভিযুক্ত কর্মকর্তা। তদন্ত কমিটির সুপারিশে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পালন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করা মোসলেহ উদ্দিন তিন দফায় পদোন্নতি পেয়ে এখন চট্টগ্রাম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। সম্প্রতি তাকে ঢাকা জোনে পদায়ন করতে সরকারের উ”চ মহলে ব্যাপক তদবির করা হয়েছে। সাধারণত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন সংসদে উত্থাপিত হলে ওই প্রতিবেদনের সবগুলো সুপারিশ বাস্তবায়ন করা বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে।

বিষয়টি উপেক্ষা করে গণপূর্ত অধিদফতর। এ সকল দুর্নীতির জন্য একমাত্র বলির পাঁঠা হয়েছেন উৎপল কুমার দে, অথচ অন্যান্য রাঘব বোয়ালেরা রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগপত্রে গণপূর্ত অধিদফতরের দুইজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন এবং ড. মঈনুল ইসলাম এর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিষয়গুলি অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জানানো হয়। এবিষয়ে ড. মঈনুল ইসলামের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো কথা বলেননি।