হঠাৎ ব্যাপক ধরপাকড়, ‘গ্রেফতার আতঙ্কে’ বিএনপি নেতাকর্মীরা

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৯

ঢাকা : একের পর এক দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে রীতিমতো ‘গ্রেফতার আতঙ্ক’ সৃষ্টি হয়েছে। খোদ রাজধানীতেই রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমসহ ছয় নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত গ্রেফতারকৃতরা হলেন- বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংসদের (ডাকসু) সাবেক জিএস খায়রুল কবির খোকন, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভিপি পদে ছাত্রদলের মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মোস্তাফিজুর রহমান, কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পিয়নের দায়িত্ব পালনকারী ফারুক হোসেন ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের কার্যালয়ের পিয়নের দায়িত্ব পালনকারী মঞ্জু।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সরকারি কাজে বাধা দেয়া, অগ্নিসংযোগ ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে শাহবাগ থানার মামলায় আসামিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। কে দলের সিনিয়র আর কে জুনিয়র সেটা দেখা হচ্ছে না। যার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে তাদেরকেই গ্রেফতার করা হচ্ছে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির সমর্থক রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম গত মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) হাইকোর্টের সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। পুলিশ তাদের সরাতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়লে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল ছোড়ার ঘটনা ঘটে। বিএনপির সমর্থকেরা বেশ কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুর করেন। এ ঘটনায় সরকারি কাজে বাধা দেয়া, অগ্নিসংযোগ ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে পুলিশ শাহবাগ থানায় মামলা করে। এতে ১৫ থেকে ২০ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৫০০ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, শওকত মাহমুদ, হাবিব উন নবী খান সোহেল, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, শফিউল বারী বাবু, সাইফুল আলম নীরব, সরফত আলী সপু, হাবিবুর রশীদ হাবিব, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, শাহ মো: আবু জাফর, ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাদেক খান, সৈয়দ এহসানুল হুদা, ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল, মোস্তাফিজুর রহমান, মেহেদী হাসান তালুকদার, কে এম রকিবুল ইসলাম রিপন, শাহ নেওয়াজ, সাঈদ মাহমুদ জুয়েল, রওনুকুল ইসলাম শ্রাবণ, আশরাফুল ইসলাম রবিন, মো: আল আমিন, মো. রফিক।

এদিকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী দুপুরে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ক্ষমতার মোহে অন্ধ, উন্মত্তের মতো সরকার ও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বারবার বাধা দিচ্ছে। আওয়ামী সরকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকে উপেক্ষা করে চক্রান্তের বদ্ধ চোরাগলিতে হাঁটছে। সরকার ও সরকারপ্রধানের কারণেই বিএনপি চেয়ারপারসন মুক্তি পাচ্ছেন না। তারা বারবার বেগম জিয়ার মুক্তিতে বাধা প্রদান করছে।

তিনি বলেন, জুলুমবাজ সরকার হিংস্র আঁচড়ে এদেশের বিরোধী শক্তিকে জর্জরিত করার জন্য সকল শক্তি নিয়োগ করেছে। সরকারের দুর্বিনীত হিংস্রতা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। তারই বহিঃপ্রকাশ গত পরশু মঙ্গলবার (২৪ নভেম্বর) রাতে বিএনপি ৫ শতাধিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশের মিথ্যা মামলা দায়ের। আমরা এই বানোয়াট মামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। একইসঙ্গে গ্রেফতারকৃতদের অবিলম্বে তাদের মুক্তি দাবি করছি।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান বলেন, গত মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) হাইকোর্টের সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। তাদের বিক্ষোভে পুলিশ অনেক ধৈর্য্যের পরিচয় দিলেও তারা উল্টো পুলিশ ও সাধারণ মানুষের জানমালের ওপর হামলা চালায়। এ অভিযোগে বিএনপির ৫০০ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় যাদের নাম রয়েছে আমরা তাদেরকে গ্রেফতার করছি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এর রমনা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শেখ মো. শামীম বলেন, সরকারি কাজে বাধা, গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার মামলায় এখন পর্যন্ত কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নাশকতার ওই মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে এক এক করে সবাইকে গ্রেফতার করা হবে।

এর আগে মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) বেলা আড়াইটার দিকে রাজধানীর হাইকোর্টের সামনে কদম ফোয়ারা এলাকায় পুলিশের রমনা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার আজিমুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ১২টার পর বিএনপির একটি বিক্ষোভ মিছিল হাইকোর্টের প্রধান ফটকের সামনে এসে সড়কে বসে পড়ে। পুলিশের পক্ষ থেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, শওকত মাহমুদসহ বেশ কয়েকজনকে বোঝালেও তারা সড়ক ছেড়ে দিতে রাজি হননি। এরপর আরও এক ঘণ্টা অপেক্ষা করা হয়। আড়াই ঘণ্টা সড়ক ছেড়ে না দেয়ায় পুলিশ তাদের বোঝাতে যান। একপর্যায়ে নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়লে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। যাওয়ার সময় তারা গাড়ি ভাঙচুর করেন।

সেদিন অ্যাকশনের সিদ্ধান্তের সময় পুলিশের রমনা জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আজিমুল হক পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা কেউ নেতাকর্মীদের গায়ে হাত দেবেন না। শুধু একযোগে এগিয়ে যাবেন। নেতাকর্মীরা ইট-পাটকেল ছুড়তে পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। বেশি সমস্যা হলে গ্যাস মারবেন। ওনারা আগে থেকেই লাঠিসোটা এনে রেখেছেন সেগুলোর দিকে খেয়াল রাখবেন। গাড়ি ভাঙচুর চালাতে পারে, এ জন্য তাদের নিবৃত্ত করবেন। এরপরই পুলিশ হাইকোর্টের বাইরের গেটের সামনে থেকে অ্যাকশন নিতে নিতে প্রবেশমুখের দিকে এগিয়ে যায়।

পুলিশ অ্যাকশন নেয়ার জন্য এগিয়ে গেলে নেতাকর্মীরা প্রথমে পিছু হটে। এরপর স্লোগান দিয়ে থেমে যায় এবং পুলিশের ওপর চড়াও হয়। এরপরও পুলিশ তাদের ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলে নেতাকর্মীদের একটি অংশ আগে থেকে নিয়ে আসা লাঠিসোটা হাতে নেয় এবং বাম পাশের সড়কে গিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করে। নেতাকর্মীদের আরেকটি অংশ পুলিশকে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় পুলিশ কয়েকটি টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ও লাঠিচার্জ করে।