কারাগারে থাকলেও বন্ধ হয়নি জি কে শামীম এর সহযোগিদের দৌরাত্ব

রবিবার, নভেম্বর ২৪, ২০১৯

ঢাকা : রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্র বালিশ কান্ডের কথা নিশ্চিই মনে আছে সবার। যেখানে একটি বালিশের দাম দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা, আর আর সেই বালিশ ফ্ল্যাটে ওঠানোর খরচ ৭৬০ টাকা দেখানো হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন আসবাবপত্রেও অস্বাভাবিক ব্যয় দেখানো হয়েছিলো।

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় ভবনের আসবাবপত্র ও বালিশ কেনাসহ অন্যান্য কাজের অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ উঠার পর, সেই প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমকে প্রত্যাহার করেছে সরকার।

প্রশ্নবিদ্ধ বালিশকান্ডের বিতির্কিত ঠিকাদার হাসান এন্ড সন্স। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক পন্থায় টেন্ডার হাতিয়ে নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে কাজ নিজেদের পক্ষ নিতে অতিরিক্ত মূল্যে টেন্ডার জমা দিয়েছে। এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকা। বালিস কান্ডের অন্যতম হোতা হাসান এন্ড সন্স। তার প্রলোভনে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিতে গিয়ে ফেসে যায় প্রকৌশলী মাসুদুল আলম।

আর এসব অপকর্ম হতো র্যাসবের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেলে থাকা জি কে শামীমের ছত্রছায়ায়। জিকে শামীম গ্রেফতারের পর কিছুদিন তৎপরতা বন্ধ থাকলেও আবার সরব তার সহযোগি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো।

হাসান এন্ড সন্স এর প্রকল্প চলছে হাড়রের জেলা সুনামগঞ্জে। জাতির পিতার নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল নির্মানের নামে হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অংকের টাকা। অতিরিক্ত মূল্যে টেন্ডার ড্রপ করায় ৩শ কোটি টাকার এই প্রকল্পে রাষ্ট্রের ব্যায় বেড়েছে অতিরিক্ত ৩০ কোটি টাকা।

মাফিয়া গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের ১০ সহযোগীকে খুঁজছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। র্যামব-পুলিশের কাছে দুই দফায় ১৯ দিনের রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তার কাছ থেকে এবং বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া নানা তথ্যের ভিত্তিতে এই ১০ জনের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। ওই ১০ জন যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারে সেদিকেও নজর রাখছে র্যানব-পুলিশ। সবকটি স্থল, সমুদ্র ও বিমানবন্দরে থাকছে বিশেষ নজরদারি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জি কে শামীম নিজের জিকে বি অ্যান্ড কোম্পানির নামে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার কাজ নিলেও আরও ৫টি কোম্পানির নামে অন্তত আরও ২০ হাজার কোটি টাকার টেন্ডার বাগিয়ে নিয়েছেন। ওই কোম্পানিগুলোতেও তার রয়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শেয়ার। কোম্পানিগুলোর মধ্যে হলো, জামাল কনস্ট্রাকটিং লি., পদ্মা কনস্ট্রাকশন, মজিদ অ্যান্ড সন্স, হাসান অ্যান্ড সন্স, পায়েল কনস্ট্রাকশন।

গণপূর্তসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দরপত্র আহ্বান করার পরপরই জি কে শামীমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সজল এসবের মনিটরিং শুরু করতেন। কোন কোম্পানি টেন্ডারে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিত সেগুলোর মালিককে হুমকি দিত সজল। পরে জি কের আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী রণক ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাদের নীরব হুমকি সমেত বিভিন্ন কৌশলে ম্যানেজ করত। সঙ্গে থাকত রানা মোল্লা, জন, মিলন, সজল, দিদার, রনি, বাবু, মিল্টন। ত

বে জি কে শামীমের অনুপস্থিতিতে সবকিছুর সমন্বয় করতেন তার বড় ভাই নাসিম। এ ছাড়া, নিকেতনে থাকা জি কে শামীমের ৭/৮টি ফ্ল্যাটে মাঝেমধ্যে আসর বসত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বড় বড় প্রকৌশলীর। ওইসব ফ্ল্যাটে থাকত সব ধরনের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা।

গোপন ক্যামেরায় আপত্তিকর দৃশ্য ধারণ করে পরবর্তীতে জি কের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা হতো তাদের। এক সময় যুবদলের নেতা কীভাবে যুবলীগে পুনর্বাসিত হয়েছেন, কীভাবে টেন্ডার বাগিয়ে নিতেন এর সবকিছুই কবুল করেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে। র্যা ব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেখুন জি কে শামীম আমাদের কাছে ৯ দিনের রিমান্ডে ছিলেন। ওই সময় আমরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। এখন সেগুলোর যাচাই-বাছাই চলছে। তবে যাদেরই সম্পৃক্তরা পাওয়া যাবে তাদেরই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। জানা গেছে, বাসাবো এলাকায় আত্মীয়-স্বজনসহ বিভিন্ন জনের নামে জি কে শামীম অন্তত ২০টি বাড়ি কিনেছেন। এর মধ্যে অন্তত ৪টি

তার নিজের নামে রেজিস্ট্রি করা। এ ব্যাপারে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এস এস) মোস্তফা কামাল বলেন, আমরা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছি। ওই চিঠিগুলোর উত্তর আসলে পরবর্তীতে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে আবারও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে ক্যাসিনো-জুয়াবিরোধী অভিযানের মধ্যে গত ২০ সেপ্টেম্বর গুলশানের নিকেতনে শামীমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে নগদ প্রায় দুই কোটি টাকা, পৌনে দুইশ কোটি টাকার এফডিআর, আগ্নেয়াস্ত্র ও মদ পাওয়ার কথা জানায় র্যা ব। তখন শামীম ও তার সাত দেহরক্ষীকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে দুই দফায় অস্ত্র, মাদক ও মানিলন্ডারিং মামলায় ১৯ দিনের রিমান্ড শেষে গত রবিবার আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়।