সাভারে কে পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন?

বুধবার, অক্টোবর ১৭, ২০১৮

জাহিন সিংহ, সাভার থেকে : নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ক’দিন। শেষ সময়ে ঢাকা-১৯ আসনে বেশ প্রচার প্রচারণা ও কর্মী সমর্থকদের নিয়ে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য চেষ্টো চালিয়ে যাচ্ছেন সরকারী দলের একাধিক প্রার্থী।

তবে শেষ মূহুর্তে সাভারটা এখন যেন একটু বেশিই ‘এনামময়’। বর্তমান সাংসদ ডা. এনামুর রহমানের বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেষ্টুন আর পোষ্টারে সয়লাব গোটা এলাকা। শ্লোগান একটাই- শেখ হাসিনার সালাম নিন, নৌকা মার্কায় ভোট দিন।

ডা.এনাম যে একা শেখ হাসিনা সালাম দিচ্ছেন, তা কিন্তু নয়, এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী সবাই কমবেশী সালাম দিয়ে চলেছেন। তবে ভিন্ন ভিন্ন কায়দায়।

কেউ পোষ্টার, লিফলেট, কেউ জনসংযোগ, কেউ বা শো-ডাউনের নামে রাস্তায় রাস্তায় মহড়া দিয়ে জানান দিচ্ছেন নিজের শক্তি আর সামর্থের কথা।

তবে কোটি টাকা প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে কে পাচ্ছেন,ঢাকা-১৯ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন।

মহল্লার গলি থেকে পাড়ার চায়ের দোকান বা গ্রাম গঞ্জের আড্ডা কিংবা মজলিস- সর্বত্র সবার একটাই প্রশ্ন- সাভার আশুলিয়ায় কে পাচ্ছেন নৌকার মনোনয়ন।

উত্তরটা আবছা। স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বলা যায়,মনোনয়ন যার পাবার সে জেনে গেছে আর নেমেও গেছে।

মানে হলো,যে নমিনেশন পাবে সে আত্নবিশ্বাসী হয়েই নেমে পড়েছেন। আর যাদের আত্নবিশ্বাসের ঘাটতি তারা এখনো সরাসরি মাঠে নামেননি। নামি নামি করছেন। যে কারণে রাজনৈতিক মহলেও চলছে নানা সমীকরণ। কার পাল্লা কোন দিকে ভারী- তা নিয়েও চলছে চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ আর গবেষণা।

সম্প্রতি একটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকে শিরোনাম হলো,হটাৎ উদয় মুরাদ জংয়ের।দৈনিকটির ভাষ্য,বিগত ৫ বছর দলের কোন সভা সমাবেশে তাকে দেখা যায়নি মুরাদ জংকে। এমনকি, শোক দিবসেও মুরাদ ছিলেন অনুপস্থিত। কিন্তু হটাৎ করেই নিরবতা ভেঙ্গে কর্মি সমর্থকদের ঘাড়ে ভর করে উদয় হয়েছেন তিনি।

ঘনিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ।নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত নির্বাচন কমিশন। ৩০ অক্টোবরের পর যে কোন দিন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা-এমনটাই বলছে কমিশন।

সে হিসেবে হাতেও খুব বেশি সময় নেই।

সাভারের শিমুলতলায় মুরাদ জং এর কার্যালয় ঘষেমেজে পরিচ্ছন্ন করলেও গেটের সামনে এখনো আবর্জনার পাহাড়। বাইরে সাটানো ব্যানার আর পোষ্টার। দেয়ালে দেয়ালে মুরাদ জং। নেই কেবল শারিরীক উপস্থিতি। মুরাদ জংকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখন পর্যন্ত কোন জনসংযোগে নামতেও দেখেনি সাভারবাসী।

তবে তার কর্মি সমর্থকরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে মুরাদকে নিয়েই সরব।
প্রশ্ন হচ্ছে, সাভারের এত কাছে (মিরপুর) বসবাস করেও মুরাদ জং কেন এখনো নিজে মাঠে নামেন নি?

অনেকে বলছেন, হয়তো এখনো দলের গ্রীণ সিগন্যাল পাননি। কিংবা মাঠে নেমে যদি শেষতক নমিনেশন না পান, সেরকম লজ্জার আগাম ঝুঁকিটাও নিতে চাচ্ছেন না তিনি।

তার সমর্থকরা ফেসবুকে তুফান তুলছে,অনেকের ওয়ালে লেখা, মুরাদ জং আসছে,সাভার কাপঁছে।

প্রশ্ন উঠেছে সেই কাঁপুনি এখন না উঠলে আর কখন?

ননিনেশন পেলে তো অন্যকথা। শক্র- মিত্র সবাই তখন পক্ষে থাকবে। তাই এখন না কাঁপাতে পারলে আর কখন? কারণ গত ৫ বছরের শুণ্যতায় অনেকে প্রতিদ্বন্দ্বি গজিয়ে উঠেছে সাভারে।

তার এক সময়ে আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে থাকারাও যেমন নমিনেশন চায়। তেমনি ক্ষমতার জোরে যাদের দৌড়ের ওপর রেখেছিলেন, আর তাদের শক্তি সামর্থ-ও বেশ।

সে হিসেবে মাঠের রাজনৈতিক চিত্রটাও ভিন্ন। মুরাদ ঠেকাতে যে গনি, রাজীব, তুহিন সবাই একাট্রা এটা মুরাদের সমর্থকরাও জানে। সে হিসেবে গজিয়ে ওঠা প্রতিপক্ষের- সংখ্যাটাও নেহায়েত কম নয়।

এটা সত্যি, রানা প্লাজা ধস মুরাদ জংকে রাজনীতি থেকে ছিটকে দিয়েছে বহুদূরে। রানা প্লাজা তার জীবনে যেমন অভিশাপ তেমনি আশির্বাদ ডা.এনামুর রহমানের জন্যে।

অনেকের আলোচনায় একট বিষয় ঘুরে ফিরে আসে,আচ্ছা রানিং এমপিকে বাদ রেখে কেন অন্য কাউকে বেছে নেবে আওয়ামী লীগ?

সে ক্ষেত্রে বর্তমান সাংসদ ডা.এনামুর রহমানের কোন কোন দোষ ক্রুটি কে বিবেচনায় আনা হবে? যা তাকে মনোনয়ন লাভে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে?

যদিও এসব উত্তর খুঁজতে ভ্রু কুঁচকে যায় খোদ ডা.এনামের সমালোচকদের-ও।

এখন আসি সমীকরণে। অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চিকিৎসক থেকে হটাৎ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এক রকম জোর করে টেনে আনা এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা.এনামুর রহমান গত ৫ বছর ধরেই দলের গুডবুকে।বলা হয়, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার স্নেহ ও আস্থাভাজন আর পরম বিশ্বস্ত।

তার জমানাতেই সাভার পৌরসভায় মেয়র আর প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যানের পদে বসেছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।
এলাকার উন্নয়নে যেমন ছিলেন নি:স্বার্থ আর নিবেদিত প্রাণ। তেমনি প্রজ্ঞা, মেধা ও যোগ্যতার বিচারে তার সমকক্ষ কেউ নেই তার সারিতে।

সাভার আশুলিয়ার তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ পছন্দের প্রার্থী ডা.এনাম।অসন্তোষমুক্ত শিল্পাঞ্চলে উৎপাদনের পরিবেশ রেকর্ড রয়েছে কেবল এনাম জমানায়।

সাবেক বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে সামরিক-বেসমারিক প্রশাসনের পছন্দের মানুষ ডা.এনাম। কারণ তার বিনয়, সততা আর যোগ্যতা।

ডা.এনামের ঘোর সমালোচক-ও দিন শেষে বলেন, ডা.এনামের আমলে জমি দখল, ঝুট বানিজ্য, ব্যবসা দখল আর রাজনৈতিক গুন্ডাগিরির প্রচলন ছিলো না সাভার ও আশুলিয়ায়।

কখনো সখনো এনামকে দেখা গেছে ওয়ান ম্যান শো আর্মির মতো। পাশে কেউ না থাকলেও একাই ছুটে চলেছেন, আবার জয় করেছেন নিজের অবস্থান।হয়েছেন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।

”ডা.এনামে সুবিধা অনেক।ক্ষতি নেই। এনামের টাকা কামানোর ধান্ধা নেই। নেই ক্যাডার বাহিনী। সে জিম্মি করে না কাউকে। মিথ্যা মামলা দেয় না। নেতাকর্মিদের সমীহ ও সন্মান করেন। কাউকে ছোট করে কথা বলেন না। এমনকি বিগত দিনে একটি বার-ও নানা উষ্কানীতে পা দেননি। সাবেক এমপি তালুকাদার তৌহিদ জং মুরাদ কিংবা অন্য কোন নেতার সমালোচনা করে দলকে ছোট করেননি’- এমন মূল্যায়ণ প্রকৃত কর্মিদের।

অথচ আজ যারা মুরাদ জং বলে চিৎকার করছেন, তারাই মুরাদের বিরুদ্ধে এক সময়ে বিষাদগার করে হতে চেয়েছেন এনামের আপনজন।আবার হালুয়া রুটির কারবার করতে না পেয়ে আবার ধাবিত হয়েছেন নিজ কক্ষপথে। এটাই রাজনীতি।রাজনীতির হাল জমানার দর্শন।

অনেকে বলেন, বিএনপি ভোটে এলে এনামকে নিয়ে অন্য হিসেব। মুরাদ জং এর বিকল্প নেই।

তারা এটা ভুলে যান যে, বিগত নির্বাচনে বিএনপি ভোটে আসবে এমনটা ধরে নিয়েই কিন্তু ডা.এনাম পেয়েছিলেন নৌকার টিকেট।

আর এটাও সত্য যে, বিএনপির প্রার্থী ডা.দেওয়ান সালাউদ্দিন বাবুর সাথে ডা.এনামের লড়াইয়ের আগাম বার্তাটাও কিন্তু গণভবনে শেখ হাসিনাই প্রথম রেখেছিলেন সাভারের মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাদের সামনে। সেদিন এনামের বিরুদ্ধে টুক টাক দু একটি শব্দ ব্যয় করেও বিফলে মুখ গোমড়া করে ফিরেছিলেন নেতারা।

শেষ পর্যন্ত এনাম ননিনেশন পেলেন আর বেলুনের মতোই চুপসে গেলেন অন্যরা। এনামকে মেনে নেয়া ছাড়াও উপায় ছিলো না কারো।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের অধিবেশন থেকে ফেরা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে গণভবনে সম্বর্ধনায় নেত্রীর খুব কাছে দেখা গিয়েছে ডা.এনামকে। আর তার সাথে সফরসঙ্গী হিসেবে দেখা গেছে ঢাকা-২০ এর সাবেক সাংসদ, জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) সভাপতি বেনজীর আহমেদকে।

এই দুটি বিষয়কে মনোনয়ন প্রাপ্তিকে আগাম বার্তা হিসেবেও কেউ কেউ সমীকরণ মেলাচ্ছেন দুই এলাকার দুই নেতাকে নিয়ে।

অন্যদিকে সব মিলিয়ে নিজের হারানো ইমেজ পুনুরুদ্ধারে তালুকদার মো:তৌহিদ জং মুরাদের এখনো অনেক পথ বাকী। কিন্তু হাতে সময় কম।

দলীয় সভানেত্রীর গুডবুক থেকে ছিটকে পড়া সাবেক সাংসদ তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদ কিভাবে দীর্ঘ এই ব্যবধানে তিলে তিলে দূরত্ব বাড়া নিজের অবস্থানকে সুসংহত করবেন সেটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

মনোনয়নের আকাঙ্খায় পোষ্টার নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা দৌলা। তিনিও পোষ্টার দিয়ে জানিয়েছেন একাদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন লাভে নিজের খায়েশের কথা। কিন্তু গলার কাঁটা ঢাকা জেলা পরিষদে তার মেয়াদে দুর্নীতি আর দলের ভাবমূর্ত্তি নিমজ্জিত করা নানা দুর্নীতি আর অনিয়ম।

আগে থেকেই মাঠে নেমেছেন, বরিশাল অঞ্চলের কেন্দ্রিয় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক হাসান তুহিন। সাভারে তৃণমূল পর্যায়ে জনসংযোগ করছেন।

এটা ঠিক এই নির্বাচন তার ‘ওয়ার্ম আপ’ ম্যাচ। নিজেকে গড়ে তুলছেন। তবে তারই সাক্ষাত প্রতিপক্ষ তার সম পর্যায়ের আরেক যুবলীগ নেতা আবু নাসিম পাভেল।

তিনিও হটাৎ উদয়ের মতো শো ডাউনে ব্যস্ত। আরো আছেন তেতুলঁঝোড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফকরুল আলম সমর। পোষ্টার ব্যানারে তিনিও সরব।

রাজনৈতিক হম্মিতম্বি আর বাক্য বাগাড়ম্বর যতই হোক না কেন, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে মনোনয়ন প্রত্যাশী আর ডামি প্রার্থীদের শোরগোল বাড়তে থাকে। এটা যেমন সত্য তেমনি প্রার্থীদের সবাই জানেন,মনোনয়ন লাভে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কৃপা দৃষ্টি লাভে লোক দেখানো এই শোডাউন কেবলই বৃথা অনুনয়।

কারণ হাতে সময় কম।যার ননিনেশন পাবার কথা, সে জানে। বসে থাকার সময় নেই। মাঠ যতই খরা আর কর্দমাক্ত হোক, খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। খেলাও শুরু হয়েছে। বাদ বাকী আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য কেবলই অপেক্ষা।