প্রেসিডেন্ট জিয়া: আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার : ড. মোর্শেদ হাসান খান

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০২১

ঢাকা : এমন একজন মানুষ সম্পর্কে কিছু লিখছি যিনি আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। তবে বেঁচে না থেকেও তিনি আমাদের মাঝে অমর হয়ে আছেন তাঁর কৃতিত্ব ও কর্মের মাধ্যমে। তিনি হলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান শুধু একটি নাম নয়, তিনি একটি ইতিহাস।

জীবিত অবস্থায়ও তিনি যেমন এ দেশের মানুষের ভালোবাসায় ধন্য ছিলেন, শত ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার সত্ত্বেও শাহাদাতবরণের চার দশক পরও তিনি এদেশের মানুষের মনিকোঠায় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে আসীন হয়ে আছেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের এক অবিসংবাদিত নেতা। জাতির চরম ক্রান্তিকালে যাঁর কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছিলো স্বাধীনতার ঘোষণা। অস্ত্র হাতে জীবনবাজি রেখে যিনি মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গণে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

যাঁর নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গড়ে ওঠেছিল প্রথম ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’। একজন সংগঠক ও রণাঙ্গণের অকুতোভয় যোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে যিনি অর্জন করেছেন জীবিত যোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ ‘বীর উত্তম’ খেতাব।

বাবা-মায়ের আদরের সন্তান বগুড়ার ‘কমল’ জাতির প্রিয় জিয়াউর রহমান একজন সফল সেনানায়ক ছিলেন। ইতিহাসে হাতেগোনা যে কয়জন সামরিক অফিসার দেশের জন্য দু-দুটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে লড়াই করার গৌরব অর্জন করেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁদের একজন। তিনি ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে এবং ১৯৭১ সালে মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং এর অন্যতম সংগঠক হিসেবে পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর দিশেহারা জাতিকে দিকনির্দেশনা দেন তখনকার সেনাবাহিনীর মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ‘I Revolt’ বলে বিদ্রোহ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

এরপর চট্টগ্রামে স্থাপিত অস্থায়ী বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেন। দেশকে স্বাধীন করতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। ২৭ ও ২৮ মার্চ তাঁর এ ঘোষণা বেতারকেন্দ্র থেকে বারবার প্রচারিত হয়। তাঁর উদাত্ত আহ্বানে মুক্তিপাগল দেশবাসী আশার আলো খুঁজে পেয়েছিল এবং অস্ত্র হাতে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো। তারপর দীর্ঘ ২৬৬ দিনের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ তাজা প্রাণের রক্ত ও ৩ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতে

র বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাঙালির গর্ব এ মহান মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক এবং পরে ‘জেড ফোর্স’- এর প্রধান হিসেবে দুঃসাহসী সেনানায়কের একটা আলাদা পরিচয় অর্জন করেন। যোদ্ধা ও একজন সংগঠক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি

হিসেবে জিয়াউর রহমান ‘বীর উত্তম’ খেতাব লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে জিয়ার অনন্য অবদান কেবল বংলাদেশের সরকার ও জনগণেরই স্বীকৃতি পায়নি এজন্য বহির্বিশ্বে ও তাঁর খ্যাতি বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভারত সফরে গেলে তাঁর সম্মানে আয়োজিত ভোজসভায় ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নীলম সঞ্জীব রেড্ডি বলেছিলেন:

Your position is already assured in the annals of the history of your country as a brave fighter who was the first to declare the independence of Bangladesh. Since you took over the reins of government in your country, you have earned wide respect both in Bangladesh and abroad as a leader dedicated to the progress of your country and the wellbeing of your people.১

শুধু সঞ্জীব রেড্ডি নয়, জিয়ার ঘোষণার গুরুত্বের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে ভারতীয় প্রখ্যাত কূটনীতিবিদ জে এন দীক্ষিত, ট্রেভর ফিসলক, ডেভিড লুডেন প্রমুখ বিশ^খ্যাত পণ্ডিতদের রচনাতেও।

একজন সেনানায়ক হিসেবে জিয়া যেমন সফল ছিলেন, তেমনি একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও। তিনি ছিলেন স্বনির্ভর ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। স্বাধীনতা বাঙালির জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে আমাদের এ স্বাধীনতা। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায় বিচার এই তিনটি মূল্যবোধকে সামনে রেখেই হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। যেখানে জনগণই হবে সকল ক্ষমতার মূল উৎস। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তদানিন্তন সরকার জাতির এ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি।

প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, কালোবাজারি ও মজুতদারি ইত্যাদির ফলে দেশে এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা ও খাদ্য সংকটের ফলে ১৯৭৪ সালে দেশ এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের করালগ্রাসে নিপতিত হয়। এ দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৮ থেকে ১০ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করেন।

অর্থনৈতিক দৈন্য-দশায় নিপতিত বাংলাদেশ আখ্যা লাভ করে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকদের উপর দমন-নিপীড়নের ফলে জননিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। জাতির এ চরম দুর্দিনে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তে দেশে ‘বাকশাল’ নামক একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়। জাতির বহুল প্রত্যাশিত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল চেতনা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমাধি রচনা করা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর নানা ঘটনার প্রবাহের মধ্য দিয়ে ৭ নভেম্বর সংঘটিত সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা ও রাজনীতির কেন্দ্রভূমিতে আসার সুযোগ লাভ করেন। তাঁর সময়োচিত দায়িত্বভার গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম পরিচালিত সরকারে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক,