মেয়েদের ছেঁড়া জিন্স পরা নিয়ে ভারতে কেন এত আলোচনা

মঙ্গলবার, মার্চ ২৩, ২০২১

নিউজ ডেস্ক : ডেনিমের পোশাক বা জিন্স ভারতে বরাবরই পুরুষতন্ত্রের ঝাল ঝাড়ার লক্ষ্যবস্তু। এটিকে ভারতের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অধিপতিরা প্রায় নিয়মিতই তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে দায়ী করেন।

জিন্স সেখানে আবারও সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। সর্বশেষ যিনি জিন্সের পোশাক নিয়ে ক্ষিপ্ত হয়েছেন তিনি ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের নব নিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী তীরাথ সিং রাওয়াত। এ সপ্তাহের শুরুতে তিনি ‘ছেঁড়া জিন্সের’ পোশাককে তরুণদের সব অবক্ষয়ের কারণ বলে দায়ী করেন।

মিস্টার রাওয়াত রাজ্যের শিশু অধিকার কমিশনের এক কর্মশালায় বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। সেখানে তিনি এক ফ্লাইটে দেখা হওয়া এক নারীর কথা উল্লেখ করে তার সমালোচনা করেন।

ঐ নারীর নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, দুই শিশুকে সাথে নিয়ে তিনি ভ্রমণ করছিলেন। তার পায়ে বুট, পরনের জিন্স হাঁটুর কাছে ছেঁড়া, এবং তার হাতে কয়েকটি ব্রেসলেট। “আপনি একটা এনজিও চালান, হাঁটুর কাছে ছেঁড়া জিন্স পরেন, সমাজে ঘুরে বেড়ান, আপনার সাথে থাকে বাচ্চারা- আপনি তাহলে কি মূল্যবোধ শেখাচ্ছেন”, প্রশ্ন করেন তিনি।

তীরাথ সিং রাওয়াত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির নেতা।

তার মতে, এরকম ‘ছেঁড়া জিন্সের’ পোশাক ভারতে একই সঙ্গে নৈতিক স্খলনের কারণ এবং লক্ষণ। ছেলে-মেয়েদের, বিশেষ করে মেয়েদের এরকম পোশাক পরতে দেয়ার জন্য তিনি বাবা-মা‌’দের সমালোচনা করেন।

ভারতীয়রা নগ্নতার দিকে ঝুঁকছে বলে ভৎসনা করে তিনি বলেন, ‘ভারতের লোকজন যখন ছেঁড়া জিন্স পরছে, তখন বিদেশের লোকজন তাদের দেহ ঢেকে রাখছে এবং যোগ ব্যায়াম করছে।’ কিন্তু মিস্টার রাওয়াতের এসব কথাবার্তা নিয়ে ভারতে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে।

ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছে, মিস্টার রাওয়াতের ‘সব ভারতীয় নারীর কাছে” ক্ষমা চাইতে হবে, নয়তো পদত্যাগ করতে হবে।

বৃহস্পতিবার দলের সিনিয়র নেতা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের একটি ছবি শেয়ার করেছেন যেখানে ‘সবার হাঁটু দেখা যাচ্ছে।’

দিল্লির মহিলা কমিশনের প্রধান স্বাতী মালিওয়াল টুইট করে মিস্টার রাওয়াতের বিরুদ্ধে ‘নারী বিদ্বেষী কথাবার্তা’ছড়ানোর অভিযোগ এনেছেন। হিন্দিতে করা এই টুইটে তিনি বলেন,মিস্টার রাওয়াত যা বলেছেন সেটাই যে কেবল আপত্তিকর তা নয়- যেভাবে তিনি এটি বলেছেন সেটাও আপত্তিকর।

মিস্টার রাওয়াত নিজেই নাকি স্বীকার করেছেন যে তিনি ‘মেয়েদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে’একথা বলেছেন। তীরাথ সিং রাওয়াতের এই মন্তব্যকে ঘিরে এখন টুইটারে ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

হাজার হাজার ভারতীয় নারী এবং সেই সঙ্গে কিছু পুরুষ এখন তাদের ছেঁড়া জিন্স পরা পোশাকের ছবি শেয়ার করছেন। টুইটারে কয়েক ঘণ্টা ধরে ট্রেন্ড করেছে #RippedJeans হ্যাশট্যাগ।

অনেকে তাদের টুইটে মিস্টার রাওয়াতে ট্যাগ করেছেন এবং অনেকে তাকে পরামর্শ দিয়েছেন ছেঁড়া জিন্সের পরিবর্তে ভারতের ‘ছেঁড়া অর্থনীতি’ এবং নারীর নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দিতে।

গত শুক্রবার শেষ পর্যন্ত মিস্টার রাওয়াত অবশ্য ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, কেউ তার কথায় দুঃখ পেয়ে থাকলে তিনি দুঃখিত। কাউকে অশ্রদ্ধা দেখানো তার উদ্দেশ্য ছিল না, সবার অধিকার আছে যার যার পছন্দমত পোশাক পরার।

তবে মেয়েদের কি পোশাক পরতে হবে সেরকম পরামর্শ উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীই প্রথম দিয়েছেন তা নয়। এর আগেও অনেক রাজনীতিক একই ধরণের মন্তব্য করেছেন। ভারতের সংস্কৃতিমন্ত্রী মহেশ শর্মা ৫ বছর আগে একই ধরণের এক মন্তব্য করে সমালোচনার ঝড় তুলেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, বিমানবন্দরে পর্যটকদের হাতে একটি তালিকা দিয়ে তাদের পরামর্শ দেয়া হয় স্কার্ট বা এরকম পোশাকে বাইরে না যেতে বা ছোট শহরগুলোতে রাতে ঘুরে না বেড়াতে।

তখন আমি আরও কিছু উদাহরণ দিয়েছিলাম, যাতে দেখা যায় কয়েকজন নামকরা ভারতীয় রাজনীতিক মেয়েদের ধর্ষণ বা তাদের ওপর যৌন-হামলার জন্য মেয়েদের পরা পোশাককে দায়ী করেছেন।

২০১৪ সালে কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী কে জে যেসুদাস জিন্স নিয়ে মন্তব্য করে একই রকম সমালোচনার মুখে পড়েন। তিনি বলেছিলেন ভারতীয় নারীদের জিন্স পরা উচিত নয় কারণ এটি ভারতীয় সংস্কৃতির বিপরীত।

ভারতের গ্রামে-গঞ্জে পোশাক পরা নিয়ে, বিশেষ করে মেয়েদের বেলায় নানা বিধিনিষেধের কথা প্রায়শই শোনা যায়। ভারতীয় সমাজে এখনো পুরুষশাসিত। মাত্র গত সপ্তাহেই উত্তর প্রদেশ রাজ্যের একটি গ্রামের পরিষদ বলেছে, মেয়েরা জিন্স বা স্কার্ট এবং ছেলেরা শর্টস পরলে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হবে।

প্রায় এক দশক আগে উত্তর প্রদেশের বাটিসা গ্রামের পরিষদ মেয়েদের জিন্স পরা বা মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ২০১৪ সালে ৪৬টি গ্রামের প্রবীণদের একটি কাউন্সিল একই ধরণের নিষেধাজ্ঞার কথা ঘোষণা করেছিল।

তিন বছর পর হরিয়ানা এবং রাজস্থানের কিছু গ্রামও মেয়েদের জিন্স পরা এবং মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।

জিন্স পরা নিয়ে কিছু ভারতীয় নেতা কেন এত ক্ষিপ্ত?

ভারতে ডেনিমের পোশাক জনপ্রিয় হতে থাকে ১৯৮০-এর দশকে এবং তারপর থেকে একটি হয়ে উঠে একটি পছন্দের পোশাক, বিশেষ করে তরুণদের কাছে। ভারতের ডেনিমের বাজার এখন প্রায় চারশো কোটি ডলার। ২০২৮ সাল নাগাদ এটি বেড়ে বারোশো কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

গত কয়েক বছরে ‘ছেঁড়া জিন্সের’ জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে গেছে। বলিউডের তারকা থেকে সেলিব্রেটি এমনকি সাধারণ মানুষও এই ফ্যাশনের জিন্স পরছেন। কিন্তু ফ্যাশন ডিজাইনার আনন্দ ভুষন বলেন, এই ছেঁড়া জিন্সের নিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে একেবারে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

তরুণদের কাছে ছেঁড়া জিন্স মানে হচ্ছে আধুনিকতা, হালফ্যাশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। কিন্তু তাদের বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদীর প্রজন্ম এটা বুঝতেই পারেন না কেন ছেলে-মেয়েরা ছেঁড়া কাপড় পরবে।

তবে ছেলে-মেয়েরা কি পোশাক পরলো সেটা নিয়ে বাবা-মার গজগজানি এক ব্যাপার, আর সমাজের নানা সমস্যার জন্য রাজনীতিক বা সরকারী কর্মকর্তারা যখন পোশাকের দোষ দেন, সেটা একেবারেই ভিন্ন এক বিষয়।

মিস্টার ভুষন বলেন, এটা আসলে নারীকে নিয়ন্ত্রণের একটি চেষ্টা। এই পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার পুরুষরা যখন ঐতিহ্যে রক্ষার অজুহাতে মেয়েরা কি পরবে-না পরবে সেটা দিয়ে মেয়েদের দমিয়ে রাখতে চায়, সেটা আসলে খুবই হতাশাজনক।

এদের আসলে নতুন কোন পাল্টা-যুক্তি নেই। কাজেই তারা সেই পুরোনো যুক্তিই দিয়ে যেতে থাকে যে জিন্স আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়, এটি পশ্চিমা দেশ থেকে এসেছে।
মিস্টার রাওয়াত ছেঁড়া জিন্স নিয়ে যে সমালোচনা করেছেন, তাতে একটা বিপরীত ফল হয়েছে। আগে যারা কখনো ছেঁড়া জিন্স পরেননি, তাদের অনেকে এই পোশাক পরতে শুরু করেছেন।

অন্য অনেকের মতো মুম্বাইর এক ক্যান্সার বিষয়ক কাউন্সেলর ভিজি ভেংকটেশ তার ছেঁড়া জিন্স পরা ছবি টুইটারে পোস্ট করেছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, মিস্টার রাওয়াতের মন্তব্য শুনে তিনি এতটাই ক্ষেপে গেছেন যে নিজের একজোড়া ভালো জিন্সের ট্রাউজার কেটে ছেঁড়া জিন্সে রূপান্তরিত করেছেন।

আমার বয়স ৬৯ বছর এবং আমি সাধারণত শাড়ি পরি। আমিও আগে ভাবতাম, ছেলে-মেয়েরা কেন ছেঁড়া জিন্স পরে। কিন্তু মিস্টার রাওয়াতের নারী-বিরোধী কথা শুনে আমি রাগের মাথায় জিন্সের কাপড়টা কেটে তারপর সেটি পরে ছবি তুলে টুইটারে দিয়েছি।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই কাজ করার পর এ নিয়ে পরে তার অন্য কিছু মনে হয়েছে কিনা। “না, আমার তো মনে হয় আমার হাঁটুর জন্য পোশাকটা বেশ আরামদায়ক, আর দেখতেও তো ভালো লাগছে”, হেসে বললেন তিনি।

তবে এরপর সিরিয়াস ভঙ্গীতে তিনি বললেন, “মেয়েরা কি পরবে না পরবে সেটা তাদের ব্যাপার, এটা নিয়ে আর কারও মাথা না ঘামালেও চলবে।”

এটা মিস্টার রাওয়াতের ব্যাপার নয়। তার উচিৎ উত্তরাখণ্ড রাজ্য যেসব পরিবেশগত সমস্যার মুখোমুখি, সেগুলোর দিকে মনোযোগ দেয়া, গলে যেতে থাকা হিমবাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া। মেয়েরা কি পরলো সেটা নিয়ে নয়।