রক্তাক্ত মিয়ানমারে একদিনে ৩৮ জনের প্রাণহানি

বৃহস্পতিবার, মার্চ ৪, ২০২১

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সেনা অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া বিক্ষোভে সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন দেখলো মিয়ানমার। বুধবার দেশটির বিভিন্ন শহর-নগরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশ ও সেনাসদস্যদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে ছোড়া গুলিতে ৩৮ জনের প্রাণহানির খবর জানিয়েছে জাতিসংঘ। আহত হয়েছে বহু মানুষ।

সঙ্কটের সমাধানে প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তার প্রস্তাব ও সংযত হওয়ার আহ্বান উপেক্ষা করে নিরাপত্তাবা‌হিনী শা‌ন্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহা‌র করায় এই প্রাণহা‌নি ঘটেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বিক্ষোভকারীদের হালকা সতর্ক করে দেওয়ার পর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে গুলি, টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে নিরাপত্তাবাহিনী।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী মিয়ানমারে জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টিন শরনার বার্গেনার, মিয়ানমারে গত ১ ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থানের পর বুধবারকে সবচেয়ে ‌‘রক্তক্ষয়ী দিন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক লোক মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভকারীদের হালকা সতর্ক করে দেওয়ার পর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে গুলি, টিয়ারগ্যাস, রাবার বুলেট ছুড়েছে নিরাপত্তাবাহিনী। নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলকারী সেনাবাহিনী শুরুতে নীরব থাকলেও এখন বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক বলপ্রয়োগের নীতি নিয়েছে।

তরুণ আন্দোলনকর্মী ইয়াঙ্গুনের বাসিন্দা থিনজার শুনলেই ই বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‌‘এটি অত্যন্ত ভয়ানক। এটি গণহত্যা। আমাদের অনুভূতি এবং পরিস্থিতি বর্ণনা করার মতো কোনও ভাষা নেই।’ বুধবারের সহিংসতার বিষয়ে জানতে সামরিক বাহিনীর মুখপাত্রকে টেলিফোন করলেও কোনও সাড়া পায়নি রয়টার্স।

রাজনৈতিক বন্দীদের সহায়তাকারী মানবাধিকার সংস্থা অ্যাসিসটেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনারসের যুগ্ম-সম্পাদক কো বো কী এর আগে জানান যে, বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের তথাকথিত সামরিক বাহিনী ১৮ জনকে হত্যা করেছে বলে জানতে পেরেছেন তারা।

দেশটির প্রধান শহর ইয়াঙ্গুনের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, দিনের শুরুতেই এই শহরে ৮ জনকে হত্যা করেছে সেনাবাহিনী। সন্ধ্যার দিকে ইয়াঙ্গুনের উত্তরে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে গুলি ছুড়ে আরও সাতজনকে হত্যা করা হয়েছে। স্থানীয় বিক্ষোভকারী কং পায়ে সোন তুন (২৩) বলেছেন, আমি অনবরত গুলির শব্দ শুনেছি। আমি মাটিতে শুয়ে ছিলাম। তারা প্রচুর গুলিবর্ষণ করেছে।

অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভের নেতা টুট পাইং বলেন, সেখানকার একটি হাসপাতাল থেকে তাকে সাতজনের প্রাণহানির তথ্য জানানো হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মন্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

এদিকে, স্থানীয় গণমাধ্যম মনিওয়া গ্যাজেট বলছে, বুধবার পুলিশের গুলিতে মনিওয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে আরও ছয়জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া অন্যরা দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়, উত্তরাঞ্চলীয় পাকান্ত ও মিংগিয়ানে প্রাণ হারিয়েছেন।

দেশটিতে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশি দেশগুলোর জোট আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক বৈঠকে মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে সংযত আহ্বান জানানোর পরদিন বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয়েছে আইন-শৃঙ্খলবাহিনী।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর পরামর্শ দিলেও দেশটির গৃহবন্দী নেত্রী অং সান সু চির মুক্তি এবং গণতন্ত্র ফেরানোর আহ্বান জানাতে ব্যর্থ হয়েছে আসিয়ান। টুইটারে ১৯৮৯ সালে বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারের ছাত্র-বিক্ষোভ চীনের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সহিংস দমনের কথা উল্লেখ করে ইয়াঙ্গুনের আর্চবিশপ কার্ডিনাল চার্লস মং বো বলেছেন, দেশের প্রধান শহরগুলো বর্তমানে তিয়ানআনমেন স্কয়ারে পরিণত হয়েছে।

আমরা জয়ী হবো

স্থানীয় সংবাদসংস্থা মিয়ানমার নাউ বলছে, বুধবার ইয়াঙ্গুনের বিক্ষোভ সহিংস উপায়ে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে নিরাপত্তাবাহিনী। এই শহর থেকে তিন শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।

সামাজিক যোগােযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, অনেক তরুণ দুই হাত উপরে তুলে সেনাবাহিনীর গাড়িতে উঠছে। এ সময় পুলিশ এবং সেনাসদস্যরা চারদিক থেকে গাড়ি ঘিরে রাখেন। তবে এই ভিডিও ফুটেজের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

মান্দালয়ে গুলিতে নিহত ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীর ছবি সম্বলিত টি-শার্ট বিক্ষোভকারীদের পরনে দেখা যায়। এতে লেখা রয়েছে, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। মার্কিন অর্থায়নে পরিচালিত সংবাদমাধ্যম রেডিও ফ্রি এশিয়ার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি অ্যাম্বুলেন্সের তিন কর্মীকে গাড়ি থেকে নেমে আসার নির্দেশ দেয় পুলিশের সদস্যরা। পরে তাদের উরুতে গুলি ছোড়া হয়। এর পাশাপাশি বন্দুকের বাট ও লাঠি দিয়ে বেদম মারপিট করে পুলিশ।

গণতন্ত্রকামী আন্দোলনকর্মী এস্থার জি নাও বলেন, যারা মারা গেছেন তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। আমরা এটি পরাজিত করবো এবং জয়ী হবো।

গণতন্ত্রকামী আন্দোলনকর্মী এস্থার জি নাও বলেন, যারা মারা গেছেন তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। আমরা এটি পরাজিত করবো এবং জয়ী হবো।

গত ১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে মিয়ানমার। অভ্যুত্থানের পর দেশটির নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চি ও তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) নেতাকর্মীদের আটক করে জান্তা সরকার। আন্দোলত দমাতে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী গত রোববারও গুলি চালিয়ে ১৮ জনকে হত্যা করে।