রিজার্ভ লুটের পাঁচ বছরেও জড়িতরা অন্তরালে

মঙ্গলবার, মার্চ ২, ২০২১

ঢাকা: লুট হওয়া টাকা ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত হ পাঁচ বছরেও চার্জশিট মেলেনি হ ৬ দেশের ৫৬ জনের সম্পৃক্ততা দেখছে সিআইডি হ ফিলিপাইন্সের ব্যাংক কর্মকর্তার সাজা হলেও দেশি অপরাধীরা অধরা
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে থাকা অর্থ লুটের ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা। এতো বড় একটি ঘটনার পরও ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান ২৪ দিন এটি গোপন রেখেছিলেন। এ ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে ব্যাপকভাবে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা ছাড়াও দেশবাসী এ ঘটনায় হতবাক হয়। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার লুট হয়, যা বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে ৮শ’ কোটিরও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে থাকা টাকা লুট হওয়ার ঘটনার পাঁচ বছর পার হলেও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির পথ এখনো খোলেনি। ঘটনার নেপথ্যে থাকা খলনায়কদের চেহারা জাতির সামনে উন্মেচিত হয়নি। এ ঘটনায় দেশে দায়ের হওয়ার মামলার চার্জশিটও দেওয়া হয়নি। ফলে ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা শাস্তির আওতায় আসেনি। চুরি হওয়া টাকা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যে ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে তাতে এ টাকা ফেরত পাওয়া অনেকটা অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞরা। পাঁচ বছর আগে যখন টাকা চুরি হয়েছিল তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল চুরি হয়ে যাওয়া টাকা দেশের ফিরিয়ে আনতে দুই থেকে তিন বছর লাগতে পারে, কিন্তু পাঁচ বছর পার হলেও সেই টাকা কবে ফেরানো যাবে তার কোনো নিশ্চিয়তা দিতে পারছেন না কেউ। শুধু চুরি হওয়া টাকা ফেরানো নিয়ে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, শুধু তাই নয়, রিজার্ভে থাকা রাজকোষ লুটের সঙ্গে জড়িত এদেশীয়দের যথাযথভাবে শনাক্ত করা যাবে কিনা, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে কিনা তারও কোনো নিশ্চিয়তা নেই। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে থাকা টাকা লুটের ঘটনা নিছক কোনো চুরির ঘটনা বা টাকা খোয়া যাওয়া ভাবলে ভুল হবে, কারণ এ ঘটনার সঙ্গে আর্থিক কার্যক্রমের নিরাপত্তা যে ভয়াবহ ঝুঁকিতে ছিল তারও একটি প্রমাণ চিত্রায়িত হয়েছে। টাকা চুরি হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ঘটনা লুকিয়ে রেখেছিল ঠিক একইভাবে এ ঘটনা তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন তৈরি হয়েছিল তাও গোপন রাখা হয়েছে। মামলার চার্জশিট দাখিলও দফায় দফায় পেছানো হচ্ছে। এদিকে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো সুখবর দিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত
অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ লুট করে একটি শক্তিশালী সংঘবদ্ধ দুষ্টুচক্র। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর এ নিয়ে বিশ^জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। দেশ-বিদেশে তীব্র সমালোচনা হয়। ব্যাংকে রাখা আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ে আমানতকারীদের মধ্যে। ঘটনা চেপে রাখার দায় ও জনগণের টাকার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার কারণে এক পর্যায়ে পদ ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীণ গভর্নর ড. আতিয়ার রহমান। রিজার্ভ লুটের পর পরই দেশবাসীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্তরা আশ^স্ত করেছিলেন দ্রুতই এই অর্থ উদ্ধার করা হবে বলে। মোটামুটি ২ থেকে তিন বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ টাকা ফেরত আনা হবে বলেও জানানো হয়েছিল দেশবাসীকে। কিন্তু ঘটনার পাঁচ বছর পার হলেও এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তরা দেশবাসীকে কোনো সুখবর দিতে পারেননি। কবে এই টাকা ফিরিয়ে আনা যাবে তাও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। ফলে এই টাকা আদৌ ফেরত আসবে কিনা তা নিয়ে সব মহলেই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন- টাকা উদ্ধারের বিষয়ে যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে তা কবে শেষ হবে কেউ জানে না। জানা গেছে, রিজার্ভ লুটের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি এবং টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের আদালত ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ফর দ্য সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্কে মামলা দায়ের করেছিল। তবে তা গত বছরের মার্চে খারিজ হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রায় এক বছর আগেই এই সংক্রান্ত মামলাটি খারিজ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি), সোলায়ার রিসোর্ট ও ক্যাসিনো, মাইডাস রিসোর্ট ও ক্যাসিনো এবং অন্য জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল। পরে স্টেট কোর্টে মামলা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবশ্য সে মামলার শুনানি এখন পর্যন্ত শুরুই হয়নি। আর ফিলিপাইনের আদালতে ১২টি মামলা চলছে। সে দেশের আদালত চুরি হওয়া অর্থের বড় অংশ জব্দ রাখলেও মামলার অগ্রগতি নেই তেমন। কবে নাগাদ লুট হওয়া টাকা ফেরত পাওয়া যাবে? আদৌ ফেরত পাওয়া যাবে কিনা এমন প্রশ্ন যখন সর্বত্র তখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো আশার বাণী শোনাতে পারছেন না কেউ। ‘যেহেতু বিষয়টি ইন্টারন্যাশনাল আদালতে বিচারাধীন তাই আদালতের মাধ্যমেই এটা সমাধান করতে হবে’ সম্প্রতি গণমাধ্যমকে এমনটাই জানালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম। তবে কবে এর সমাধান আসবে এমন প্রশ্নের উত্তর নেই কারো কাছে।
৬ দেশের ৫৬ জনের সম্পৃক্ততা দেখছে সিআইডি
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুটের মামলা তদন্তে ৬ দেশের ৫৬ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে সিআইডি। এ ৫৬ জন ছাড়াও অভিযোগপত্রে আসামি হচ্ছে আরও ৮ প্রতিষ্ঠান। গোয়েন্দারা বলছেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে অভিযোগপত্র দিতে অপেক্ষা করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে থাকা অর্থ ফেরত মামলার নিষ্পত্তির জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে থাকা চুরির ঘটনায় মানি লন্ডারিং আইনে মতিঝিল থানায় মামলা হয় ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ। পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে এতে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করে তারা। বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, চীন, শ্রীলঙ্কা, জাপানের নানা সংস্থার কাছে চাওয়া হয় সন্দেহভাজনদের তথ্য। সহায়তা নেওয়া হয় ইন্টারপোলেরও। প্রায় ৫ বছরের তদন্তে রিজার্ভ চুরিতে ৫৬ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে সিআইডি। এর মধ্যে আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭, ফিলিপাইনের ৩০, শ্রীলঙ্কার ৭, চীনের ৩, ভারতের ৩, জাপানের এক ও সুইফট কর্মকর্তা ৫ জন। সম্পৃক্ততা মিলেছে ফিলিপাইনের ৭ ও শ্রীলঙ্কার একটি প্রতিষ্ঠানের। সিআইডি প্রধান বলছেন, মালি লন্ডারিং আইনের মামলা তদন্তে সময় বেশি লাগে। এ মামলায় দেশের পাশাপাশি ৬-৭টি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে নানা তথ্য-উপাত্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রিজার্ভ লুটে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলেই নেওয়া হবে ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবে সিআইডি যা বলছে সেটি সঠিক নয়। কারণ, বস্তুতপক্ষে এটি মানি লন্ডারিং নয়। রিজার্ভ লুট। এ লুটের সঙ্গে দেশে-বিদেশে কারা জড়িত- এ ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। কাজেই ‘ছাড় দেয়া হবে না’ বলে বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এটিও সঠিক নয়। ‘ছাড় দিয়েই দেয়া হয়েছে’ বলে মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।
ফিলিপাইন্সের ব্যাংক কর্মকর্তার সাজা হলেও দেশি অপরাধীরা অধরা
বাংলাদেশ ব্যাংকে সাইবার চুরির অপরাধে ফিলিপাইন্সের সাবেক ব্যাংক ব্যবস্থাপক মাইয়া দেগুইতোকে ৩২ থেকে ৫৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে সেদেশের একটি আদালত। পাশাপাশি ১০ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়েছে। গত বছরের ১০ জানুয়ারি এপিবি, এসিবি, এপি, এএফি ও রয়টার্স এর বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে ডয়চে ভেলে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়- বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরির এই ঘটনায় এই প্রথম কাউকে সাজা দেওয়া হলো। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার লুটের সময় মাইয়া দেগুইতো ম্যানিলার রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন আরসিবিসি’র ব্যাংক ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং এতে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ৮টি অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং প্রত্যেকটি প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিটিতে তাকে ৪ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট পেমেন্ট সিস্টেমে ঢুকে সাইবার অপরাধীরা নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে। এরপর সেই অর্থ আরসিবিসি’র ম্যানিলা শাখায় ট্রান্সফার করা হয়। সেই সময় ওই শাখার ম্যানেজার অর্থাৎ প্রধান ছিলেন মাইয়া। এরপর সেখান থেকে ফিলিপাইন্সের বিভিন্ন ক্যাসিনোতে এই অর্থ লোপাট হয়। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে থাকা টাকা চুরির ঘটনায় ফিলিপাইন্সের ব্যাংক ব্যবস্থাপকের কারা ও অর্থদণ্ড ১০ মাস আগে হলেও বাংলাদেশের মানুষ এখনো জানতে পারেনি এদেশীয় জড়িতদের নাম। এ থেকে বিচার ও দণ্ড যে বহু দূর তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
পাঁচ বছরেও চার্জশিট মেলেনি
২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে (ফেড) রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে পাঁচটি সুইফট বার্তার মাধ্যমে চুরি হওয়া এই অর্থের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় যাওয়া দুই কোটি ডলার ফেরত আসে। তবে ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বেশ কয়েকটি জুয়ার টেবিল ঘুরে হাতবদল হয়। এর মধ্যে দেড় কোটি ডলার ফেরত এলেও বাকি অর্থের কোনো হদিস এখনো মেলেনি। ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের উপ-পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে মতিঝিল থানায় মানি-লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ (সংশোধনী ২০১৫) এর ৪ ধারা, তথ্য ও প্রযুক্তি আইন-২০০৬ এর ৫৪ ধারায় এবং ৩৭৯ ধারায় মামলা করেন। সেই থেকে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। কিন্তু মামলা দায়েরের প্রায় পাঁচ বছর পার হলেও এ বিষয়ে এখনো প্রতিবেদন দিতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। অবশ্য তদন্তে শ্রীলঙ্কা, জাপান, চীন, ফিলিপাইনসহ বেশ কিছু দেশের নাগরিক জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি। বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে চার্জশিটও প্রস্তুত করেছে সংস্থাটি। তবে এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতেও চলছে মামলা এবং সেই মামলার অবস্থা দেখেই জড়িতদের বিরুদ্ধে সিআইডি চার্জশিট দাখিল করবে বলে জানানো হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এখনই চার্জশিট দেওয়া হলে সেই টাকা ফেরত আনতে সমস্যা হতে পারে। চুরির সেই ঘটনার প্রায় তিন বছর পর ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে মামলা করে বাংলাদেশ। ওই মামলায় আরসিবিসি ও ফিলিপাইনের অভিযুক্ত ক্যাসিনোসহ মোট ১৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং তিন চীনা নাগরিককে আসামি করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করার পরই এর বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট কোর্টের এখতিয়ারবহির্ভূত উল্লেখ করে পাল্টা মামলা করে আরসিবিসিসহ অন্যরা। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মামলাটি খারিজের আবেদন জানায় তারা। গত বছরের ২০ মার্চ আরসিবিসির করা ওই আবেদন খারিজ করে বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালত। নিউইয়র্কের স্টেট আদালতে মামলাটির কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আসলেই কী হ্যাকিং হয়েছিল? নাকি পরিকল্পিত লুট?
রিজার্ভে থাকা টাকা লুট হওয়ার পর প্রথমে এটি ধামাচাপা দেওয়া চেষ্টা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা। পরে বিদেশি পত্রিকার মাধ্যমে এ ঘটনা প্রথমে প্রকাশ হওয়ার পর রিজার্ভ লুট নিয়ে হইচই পড়ে যায়। গুরুত্বসহকারে সংবাদ প্রকাশ করে দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো। দেশি-বিদেশি পত্রিকার নানা বিশ্লেষণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হলো আন্তর্জাতিক হ্যাকাররা হ্যাকিং এর মাধ্যমে এই টাকা সরিয়েছে। সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট) এর সার্ভার হ্যাকিং করে হ্যাকাররা এই টাকা নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে দাবি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই দাবির পরপরই সুইফট এর পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তাদের সার্ভার খুই সুরক্ষিত। এই সার্ভার হ্যাকিং হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, সুইফট এর দুইজন কর্মকর্তা এসে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে নিশ্চিত করেছে যে কোনো ধরণের হ্যাকিং হয়নি। সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন(সুইফট) হচ্ছে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে অর্থ লেনদেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সংস্থা। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সঙ্গে পৃথিবীর সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুইফটের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে থাকে। সুইফটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক উন্নত। ইলেকট্রনিক মেসেজ পদ্ধতিতে এ লেনদেন হওয়ায় এখন পর্যন্ত এ ব্যবস্থা হ্যাকড হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা সুইফটের নেটওয়ার্ক হ্যাকড হয়নি বলে তাৎক্ষণিকভাবে জানান প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গটফ্রাইড লেইব্র্যান্ড। তিনি এক চিঠিতে বাংলাদেশে সুইফটের সদস্য ব্যাংকগুলোকে বলেছেন, তাদের সিস্টেমে হ্যাকিংয়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে তাদের সিস্টেমের কোনো দুর্বলতা ছিল না। সুইফটের সিইও আরো জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ঘটনা সুইফটের কোর মেসেজিং সার্ভিস-এর ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। সুইফট তার নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। আমরা গ্রাহকদের ঝুঁকি সক্রিয়ভাবে পর্যালোচনা করি। অর্থ স্থানান্তর করতে সুইফট প্রত্যেকটি সদস্যকে একটি নির্দিষ্ট কোড ও সিস্টেম ব্যবহারের জন্য গোপন নম্বর (পিন) দিয়ে থাকে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকও তাদের সিস্টেম হ্যাক হয়নি বলেও তখনই জানিয়েছিল। অর্থ স্থানান্তর হয়েছে বিধি সম্মতভাবে। যার অর্থ দাঁড়িয়েছে অর্থ লুটের এই ঘটনার পুরো দায় বাংলাদেশ ব্যাংককেই নিতে হবে। ইতোপূর্বে সুইফট তার সদস্য ব্যাংকগুলোকে একটি মেসেজে জানিয়েছে, সুইফট সিস্টেমের নিরাপত্তা আরো উন্নত করা হচ্ছে। গ্রাহকের নিজস্ব নেটওয়ার্ক সিস্টেমের সেট আপ, মেইনটেন্যান্স ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে সুইফট। বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা লুট হওয়ার কিছু দিন পর সুইফটের দুজন প্রতিনিধি বাংলাদেশ ব্যাংক ঘুরে গেছেন। ওই প্রতিনিধি দুজন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, তদন্তকারী সংস্থাগুলো ও বাংলাদেশের সুইফট ইউজার গ্রুপের সঙ্গেও বৈঠক করেন। সার্ভার হ্যাকিং যে হয়নি তা সুইফট এর পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে ঘটনার পর পরই। বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা যে পরিকল্পিত ডাকাতি তা নিশ্চিতও করেছে সুইফট। জানা গেছে, সুইফটের দুই কর্মকর্তা যখন ঢাকায় আসেন তখন তারা সঙ্গে করে সুইফটের একটি ডামি সার্ভার নিয়ে আসেন। সেটি তদন্ত দলকে দিয়ে বলেন হ্যাক করার জন্য। হ্যাক করতে ব্যর্থ হলে দেওয়া হয় কিছু গোপনীয় তথ্য। তারপরেই দেশে থাকা এক্সপার্ট হ্যাকাররা তা হ্যাক করতে পারেনি। এসময় সুইফটের এ প্রতিনিধিরা বাংলাদেশকে জানায়, আন্তর্জাতিক হ্যাকারদের দিয়ে সুইফট সিস্টেম হ্যাক করার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা তা হ্যাক করতে পারেনি। এখনও নিয়মিত সুইফট সিস্টেম পরীক্ষা করে দেখা হয়। যদি হ্যাক হয় তাহলে পুরো পৃথিবীর আর্থিক খাতে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে বলে সুইফটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। হ্যাকিং যে হয়নি তা সুইফটের পক্ষ থেকে নানাভাবে নিশ্চিত করার পরও সরকারের তরফ থেকে এখনো বলার চেষ্টা করা হয় যে ঘটনাটি হ্যাকিং এর মাধ্যমে ঘটেছে। অবশ্য সরকারি এই বক্তব্য দেশবাসী বিশ^াস করেনি, করছেও না।
সুইফট সার্ভার কম্পিউটারে দেখা হতো মুভি, খেলা হতো গেইম
সুইফটের সঙ্গে করা চুক্তি ভেঙে অদ্ভুদ কা- ঘটিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। চুক্তির শর্ত মোতাবেক সুইফটের কম্পিউটারে অন্য কোনো কাজ করা যাবে না। কিন্তু এ শর্ত মানেননি কর্মকর্তারা। সেই কম্পিউটার দিয়ে ইন্টারনেট চালিয়ে ইউটিউবে মুভি দেখা, গান শুনা ও নিয়মিত গেইম খেলতেন কর্মকর্তারা। সুুইফটের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্পাদিত চুক্তির শর্ত মোতাবেক, সুইফট নেটওয়ার্ক টার্মিনাল যে রুমে থাকবে সেখানে কোনো আইটি বিষয়ে পারদর্শী বা কোন প্রযুক্তি কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে পারবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু শর্ত ভঙ্গ করে বাংলাদেশ ব্যাংক আইটি বিভাগের দুই জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে সুইফট রুমে। সুইফট সার্ভার যে কম্পিউটারে থাকবে সেই কম্পিউটারে অন্য কোন সিস্টেম বা লোকাল নেটওয়ার্ক সংযোগ দেওয়া যাবে না। কিন্তু সুইফটকে না জানিয়ে সেই কম্পিউটারে আরটিজিএস(রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) নামের আন্তঃব্যাংক লেনদেনের আরেকটি সিস্টেম সংযোগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক কম্পিউটার দিয়েই সুইফট ও আরটিজিএসের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে অর্থ লেনদেন করত বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়াও সুইফট নেটওয়ার্কের কম্পিউটারের সঙ্গে লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক স্থাপন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কম্পিউটারের সঙ্গে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের সকল কম্পিউটারের কার্যক্রম মনিটর করত। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন কাণ্ডে বিস্ময় প্রকাশ করেছে সুইফট কর্তৃপক্ষ। সুইফটের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বেলজিয়াম থেকে আসা দুই বিশেষজ্ঞ এ বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছেন। সুইফটের শর্ত ভঙ্গ করে একাউন্টস এন্ড বাজেটিং বিভাগের ডিলিং রুমের কক্ষে আইটি বিভাগের দুই কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ দেওয়া দুই কর্মকর্তাকে নিয়ে সুইফট পদ্ধতি পরিচালনাও করা হয়েছে। শর্ত মোতাবেক সুইফটের কম্পিউটারে অন্য কোনো কাজ করা যাবে না। কিন্তু এ শর্ত মানেননি কর্মকর্তারা। মুভি দেখা, গান শুনা ও গেইম খেলাসহ যা খুশি করেছেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক-এ রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার লুট হয়। লুটের ঘটনাটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানার পরও এটি চেপে রাখা হয়। অবশেষে প্রকাশ পায় মার্চ মাসে। ইতিমধ্যে চুরি হওয়া অর্থের ২ কোটি ডলার চলে যায় শ্রীলঙ্কা ও ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চলে যায় ফিলিপাইনে। শ্রীলঙ্কায় যাওয়া অর্থ উত্তোলন করতে পারেনি সাইবার ক্রাইম চক্র। আর ফিলিপাইনে যাওয়া অর্থের মধ্যে ১৪ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার ফেরত পেয়েছে বাংলাদেশ। ঘটনার পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও বাকি টাকা এখনো উদ্ধার হয়নি। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। দুজন ডেপুটি গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনা তদন্তে সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে কমিটি করে সরকার। ওই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, রিজার্ভ চুরির ক্ষেত্র প্রস্তুত রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই। যেখানে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্বহীন ছিলেন। আর আন্তর্জাতিক লেনদেন নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্থানীয় নেটওয়ার্ক যুক্ত করায়ই মূল অঘটনাটি ঘটেছিল। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের মামলার অভিযোগে বলা হয়, রিজাল ব্যাংকের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা এই অর্থ চুরির জন্য কয়েক বছর ধরে ‘বড় ধরনের’ ‘জটিল ষড়যন্ত্র’ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করেছিল, অজ্ঞাতনামা উত্তর কোরীয় হ্যাকাররা এই চুরিতে সহায়তা করেছেন। অর্থ চুরির পর তা নিউ ইয়র্ক সিটি ও ফিলিপাইনে আরসিবিসির অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। পরে এই অর্থের বেশির ভাগ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোর মাধ্যমে পাচার হয়ে যায়।