কে হবেন দালাই লামার উত্তরসূরি?

শনিবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২১

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ১৯৫৯ সালের ৯ মার্চ। এক থিয়েটার পারফরম্যান্স দেখার নিমন্ত্রণ এসেছে তিব্বতের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু দালাই লামার কাছে। নিমন্ত্রণদাতা লাসায় চীনা সেনাবাহিনীর কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার ফু।

আমন্ত্রণ এসেছে দালাই লামার ভগ্নিপতি ও প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ফুনসুক তাশি তাকলার মাধ্যমে। তবে এ আমন্ত্রণের সঙ্গে শর্তও জুড়ে দিয়েছে ব্রিগেডিয়ার ফু। শর্ত হলো দালাই লামাকে আসতে হবে একা, গোপনে এবং কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই।

অস্বাভাবিক এ আমন্ত্রণের কথা জানাজানি হলে তিব্বতিদের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ১০ মার্চ সকাল থেকেই নোরবুলিংকা প্রাসাদের বাইরে এসে জড়ো হতে থাকে দালাই লামার ভক্তরা। কোনোভাবেই ধর্মগুরুকে চীনা সৈন্যদের মধ্যে একা ছাড়তে রাজি নন তারা। তাদের আশঙ্কা ছিল চীনা সৈন্যরা তাকে জিম্মি বা মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। দুপুরের মধ্যেই প্রাসাদের বাইরে পাহারারত তিব্বতির সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে জ্যোতিষচর্চার দ্বারস্থ হলেন দালাই লামা। প্রাসাদের জ্যোতিষীর পরামর্শ ছিল, দালাই লামার লাসায় থেকে চীনাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়াটাই মঙ্গলজনক। কয়েকদিন পরে আবারো জ্যোতিষীর সঙ্গে দেখা করলেন তিনি। এবারো সে একই পরামর্শ জ্যোতিষীর। ১৬ মার্চ ব্রিগেডিয়ার ফু জানালেন, চীনারা এবার নোরবুলিংকায় আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরদিন ১৭ মার্চ আবার জ্যোতিষীর কাছে গেলেন দালাই লামা।

এবার জ্যোতিষী দীর্ঘক্ষণ গণনা করে জানালেন, সেদিন রাতেই দালাই লামাকে চলে যেতে হবে। জ্যোতিষী তার পরামর্শ দিতে দিতেই প্রাসাদ ভবনের বাইরে দুটি কামানের গোলা বিস্ফোরিত হলো। ২৩ বছর বয়সী দালাই লামা সেদিনই সৈনিকের ছদ্মবেশে প্রাসাদ ত্যাগ করলেন। বিপজ্জনক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিলেন ভারতে। নিজ দেশ বা জনগণের কাছে আর কখনই ফেরা হয়নি তার।

দালাই লামার বয়স এখন ৮৫। এরই মধ্যে বিশ্বের নানা প্রান্তে নানাভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন তিনি। পশ্চিমাদের কাছে তিনি একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজেতা। তিব্বতিদের কাছে আধ্যাত্মিক নেতা। অন্যদিকে চীনাদের কাছে তিনি শুধুই ‘সন্ন্যাসীর চাদরে মোড়া এক নেকড়ে’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’।

বয়সে বৃদ্ধ হলেও এখনো অশীতিপর হয়ে পড়েননি দালাই লামা। চতুর্দশ দালাই লামা তেনজিন গিয়ােসা এখনো যথেষ্ট ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী। কিন্তু এরই মধ্যে তার উত্তরাধিকার নিয়ে জল ঘোলা হতে শুরু করেছে। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে এক ধরনের বিবাদমুখর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে।

এ পরিস্থিতির সূচনা গত ডিসেম্বরে, যুক্তরাষ্ট্রে অনেকটা অপ্রচলিত ধরনের আইন পাস হওয়ার পর থেকে। তিবেতান পলিসি অ্যান্ড সাপোর্ট অ্যাক্ট ২০২০ (টিপিসিএ) নামের ওই আইন পাস হয়েছে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের যৌথ উদ্যোগে। তিব্বতি মালভূমি অঞ্চলের প্রতিবেশগত সুরক্ষা থেকে শুরু করে সেখানকার মানবাধিকার এমনকি দালাই লামার উত্তরাধিকার নির্বাচন পর্যন্ত অনেক কিছুই আইনের বিষয়বস্তুতে উঠে এসেছে।

দালাই লামার উত্তরাধিকার নির্বাচন নিয়ে এতে বলা রয়েছে, বিষয়টি পুরোপুরি তিব্বতের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু ও সেখানকার বাসিন্দাদের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত। যদি চীনা কর্মকর্তারা এতে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ-নিষেধাজ্ঞা গোছের পদক্ষেপ নিতে পারবে ওয়াশিংটন।

বিষয়টি ক্ষিপ্ত করে তুলেছে বেইজিংকে। জাতীয়তাবাদী চীন কখনই সাবেক কিং সাম্রাজ্যের অধীন অঞ্চলটির ওপর থেকে দাবি ছাড়েনি। একই সঙ্গে সেখানকার ধর্মগুরু নির্বাচনের অধিকারও

শুধু বেইজিংয়ের বলে দাবি চীন সরকারের। এ বিষয়ে চীনের ভাষ্য হলো, কিং সম্রাটদের স্বীকৃতির ভিত্তিতেই তিব্বতের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু নির্বাচিত হয়েছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ডিসেম্বরে বিলটিতে সই করার পর থেকেই এ নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই ঘোলা হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প এতে সই করার পর পরই চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। তাতে অভিযোগ তোলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র চীনের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাচ্ছে’।

এদিকে ট্রাম্পের ওই আইনের পর ভারতীয় গণমাধ্যম এ নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। বিষয়টিতে আরো বেশি করে অনিরাপত্তা অনুভব করতে থাকে চীন। এ নিয়েও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় বেইজিং।

যদিও চতুর্দশ দালাই লামা বলছেন, বয়স ৯০ হওয়ার পরেই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন, তার উত্তরসূরি হিসেবে কাউকে নির্বাচিত করা হবে কিনা। এক্ষেত্রে তিনি উত্তরসূরি নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিলে তিব্বতে ৬০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা দালাই লামা ব্যবস্থার অবসান ঘটবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।