শরীরের বিশেষ প্রোটিনই এশিয়ায় রুখে দিচ্ছে করোনার ব্রিটেন স্ট্রেইনকে

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১

ঢাকা : মূলত ভৌগোলিক কারণেই করোনার নতুন ব্রিটেন স্ট্রেইন ভারতে সেভাবে থাবা বসাতে পারছে না। কল্যাণীর জিন গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা নানাভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তাদের গবেষণা লব্ধ তথ্য ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ইনফেকশন জেনেটিক্স অ্যান্ড ইভোলিউশন’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োমেডিক্যাল জেনোমিক্স বা এনআইবিএমজির ডিস্টিঙ্গুইশড প্রফেসর ড. পার্থপ্রতিম মজুমদার এবং ড. নিধনকুমার বিশ্বাসের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী গবেষণা চালিয়ে এ তথ্য আবিষ্কার করেন।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী, এখনো পর্যন্ত ভারতে প্রায় ১ কোটি ৯ লাখের মতো মানুষ করোনায় সংক্রামিত হয়েছেন। কোভিড ১৯-এর তুলনায় ব্রিটেনের নতুন স্ট্রেইন বা ভেরিয়েন্ট সার্স-কোভ টু অনেক বেশি শক্তিশালী এবং এর সংক্রমণ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে বেশি। তা সত্ত্বেও গোটা দেশে এখনো পর্যন্ত এই রোগে মাত্র ১৬৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

এনআইবিএমজির বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে, মূলত ভৌগোলিক কারণেই ভারত সহ এশিয়ার দেশগুলিতে মানবদেহে নতুন স্ট্রেইন ততটা প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। ভারতীয় উপমহাদেশের বাসিন্দাদের শরীরে আলফা-ওয়ান অ্যান্টি ট্রিপসিন নামে একটি প্রোটিন রয়েছে। যা এই ভাইরাসের ক্ষেত্রে গেট কিপারের কাজ করছে।

করোনার ধাক্কা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে ভারত। এখন টিকাকরণ কর্মসূচি চলছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এটি বিশ্বে বৃহত্তম টিকাকরণ কর্মসূচি। করোনার প্রভাব যখন দেশজুড়ে কমতে শুরু করেছে, তখন ব্রিটেনের স্ট্রেইন ভারতে ঢুকে পড়ায় বিজ্ঞানীদের কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করে। কিন্তু পরে দেখা যায়, এই মারাত্মক ভাইরাসটি এশিয়া মহাদেশের মানুষকে সেভাবে কাবু করতে পারছে না।

কল্যাণীর জিন গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা এনিয়ে গবেষণা শুরু করে দেন সেই সময়। গবেষণায় দেখা যায়, কোভিডের ব্রিটেনের ভ্যারাইটি সার্স কোভ-টু প্রথমে মানবদেহে স্পাইক প্রোটিনের সঙ্গে মিশে কোষের ভিতরে প্রবেশ করে। তারপর প্রভাব বিস্তার করে। পরবর্তীকালে এই ভাইরাসে সংক্রামিত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি, এমনকি কথাবার্তার সময় ‘ড্রপলেট’ বেরিয়ে অন্যকে সংক্রামিত করে।

ড. পার্থপ্রতিম মজুমদার বলেন, তাদের গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে, নতুন যে মিউট্যান্ট করোনা ভাইরাস এসেছে, সেটি প্রকাশ পেয়েছে ‘ডি ৬১৪ জি’ হিসেবে। এটি আবার অন্য একটি পথ দিয়ে মানুষের কোষে আঘাত হানছে। কিন্তু এই পথ খোলার জন্য মানবদেহে একটি প্রোটিন নিউট্রোফিল ইলাস্টেজ-এর প্রয়োজন হয়। এই প্রোটিন যাঁদের ফুসফুসে প্রচুর পরিমাণে থাকে, তাদের ক্ষেত্রে ওই পথটি সহজে খুলে যায়। ফলে ভাইরাস আক্রমণ করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভারত সহ এশিয়ার দেশগুলোর মানবদেহে আলফা-ওয়ান অ্যান্টি ট্রিপসিন প্রোটিন অধিক মাত্রায় থাকে। যার কাজ হচ্ছে নিউট্রোফিল ইলাস্টেজের উৎপাদনকে বাধা দেওয়া এবং নিয়ন্ত্রণ করা। অন্যদিকে, আলফা-ওয়ান অ্যান্টি ট্রিপসিন প্রোটিনের কাজই হল ফুসফুসকে সুরক্ষা দেওয়া। যেহেতু করোনা ভাইরাস সরাসরি ফুসফুসকেই আক্রমণ করে, তাই এই প্রোটিন তাকে প্রতিহত করে। বিশেষ করে সার্স কোভিড-টু ভাইরাসের ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য। কেননা, এর সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি।

কল্যাণীর এই জিন গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা এটা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, এই আলফা-ওয়ান অ্যান্টি ট্রিপসিনের কারণেই ‘ডি ৬১৪ জি’ প্রকৃতির মিউট্যান্ট করোনা ভাইরাস যা ব্রিটেন স্ট্রেইন বা সার্স-কোভ টু নামে পরিচিত, সেটা ভারত সহ এশিয়ার দেশগুলিকে কব্জা করতে পারছে না। (খবর ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম বর্তমান)