দর্জির ছেলে লুটপাট করে হাজার কোটি টাকার মালিক

শুক্রবার, জানুয়ারি ২২, ২০২১

ঢাকা: কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ নিয়ে কানাডায় পলাতক পি কে (প্রশান্ত কুমার) হালদার অর্থ লোপাটের যে সিন্ডিকেটটি পরিচালনা করতেন, তার একটি অংশ তার মতোই সাধারণ পরিবার থেকে আসা। গতকাল বৃহস্পতিবার দুদক তার আরো দুই জন সহযোগী সুকুমার মৃধা ও তার মেয়ে অনিন্দিতাকে আটক করেছে। তাদের সবার বাড়ি পি কে হালদারের মতো পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। এর আগে আটক অবন্তিকা বড়ালও নাজিরপুরের অধিবাসী। পি কে হালদার, সুকুমার মৃধা ও অবন্তিকার পৈতৃক বাড়ি যথাক্রমে দীঘিরজান, বাকসি ও আমতলা গ্রামে।

জানা গেছে, পি কে হালদারের বাবা মৃত প্রণবেন্দু হালদার পেশায় ছিলেন গ্রাম্য বাজারের দর্জি। তার এই অর্থপাচারের কাণ্ড ফাঁস হওয়ার পর শিক্ষিকা মা আরেক ছেলে প্রাণেশ হালদারের বাড়ি ভারতের অশোকনগরে চলে গেছেন। ১৫-১৬ বছর আগে ভিন্ন ধর্মের এক নারীকে বিয়ে করার পর থেকে পি কে হালদার গ্রামছাড়া। এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, পি কে হালদার নাজিরপুর উপজেলার দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও বাগেরহাটের সরকারি পিসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর বুয়েটের মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নিয়ে বেক্সিমকো গ্রুপের জুট ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেন।

গ্রামে তার প্রতিবেশী কলেজ শিক্ষক অধ্যক্ষ দীপ্তেন মজুমদার জানান, পি কে হালদারকে একজন মেধাবী ছাত্র বলে এলাকাবাসী চিনত। এলাকার সঙ্গে তার তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না দীর্ঘদিন ধরে। মানুষ জানত প্রকৌশলী পেশায় তিনি বড় চাকরি করেন। ১৫-১৬ বছর আগে এক মুসলিম নারীকে বিয়ে করেছেন বলে গ্রামে প্রচার রয়েছে। তার জীবনযাপন রহস্যজনক বা ভিন্ন ধর্মের মেয়েকে বিয়ে করায় ধর্মত্যাগী হয়েছেন এরকম খবর ছিল। কুষ্টিয়ায় একটি জুট মিলসহ তার কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ছিল বলে মানুষ জানে। অঙ্গন হালদার নামে নিজ গ্রামে জনৈক ব্যক্তি ম্যানেজার হিসেবে পি কে হালদারের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করেন। বর্তমানে পি কে হালদারের গ্রামের বাড়িতে পুরোনো একটি কাঠের টিনশেড ঘর আছে, যেখানে অন্য লোকজন বসবাস করে।

এদিকে তার আয়কর উপদেষ্টা বলে এলাকায় পরিচিত ছিলেন একই উপজেলার বাকসি গ্রামের চৌকিদার রাজেন্দ্রনাথ মৃধার ছেলে সুকুমার মৃধা। ‘ওয়ান ইলেভেন’ থেকে নিজ গ্রাম নাজিরপুর, পিরোজপুর ও খুলনায় দানশীল, শিক্ষানুরাগী, সংবাদপত্রসেবীসহ নানা নামে তার খ্যাতি ছড়াতে থাকে। পেশাগত জীবনে তিনি পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি, খুলনার রূপসা কলেজের অধ্যক্ষসহ একাধিক চাকরি করেন এবং এসব প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারান বলে জানা যায়। নিজ গ্রাম বাকসিতে রাজলক্ষ্মী ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলে সরকারি খাস জমিতে মহাবিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পাঁচটি মন্দির, দুস্থ ছাত্রীনিবাস, বৃদ্ধাশ্রম ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া এলাকায় অনেক মসজিদ ও মাদ্রাসা তিনি তৈরি করেছেন বলে তার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার সুভাষ চন্দ্র মণ্ডল দাবি করেছেন।

খুলনায় ‘আলোকিত বাংলাদেশ’ নামে অধুনালুপ্ত একটি সংবাদপত্রও ছিল সুকুমারের। পার্শ্ববর্তী বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার আন্ধারমানিক গ্রামে ৫০ বিঘা জমিতে একটি হরিণের খামার গড়ে বন আইন লঙ্ঘন করে হরিণ বিক্রি ও মহলবিশেষকে ম্যানেজ করতে হরিণের মাংস ভেট দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সুকুমারের বিরুদ্ধে। তিনি পি কে হালদারের দেহরক্ষীর সঙ্গে মেয়ে অনিন্দিতার বিয়ে দিয়েছেন। তার বোন মঞ্জু রানীর দুই ছেলে স্বপন মিস্ত্রি ও উত্তম মিস্ত্রিও পি কে হালদারের অন্যতম সহযোগী। এই দুজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে দুদক তাদের দেশের বাইরে যেতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও স্বপন ভারতে ও উত্তম দেশে আত্মগোপন করে আছেন।

স্থানীয়ভাবে অভিযোগ পাওয়া যায়, পি কে হালদার মাঝে মাঝে সুকুমারের বাকসির রাজলক্ষ্মী ফাউন্ডেশনের গেস্টহাউজে মেয়ে বান্ধবীসহ রাত যাপন করতেন। দুই বোন, তাদের ছেলে ও স্বামীদের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় সুকুমার তাদের পরিচয় দেন না বলে আত্মীয়স্বজনের আক্ষেপ রয়েছে। সুকুমারের স্ত্রী ঢাকায় সোনালী ব্যাংকে চাকরি করেন।

এদিকে কয়েক দিন আগে আটক পি কে হালদারের সহযোগী অবন্তিকা বড়াল তার বিধবা মা ও অন্য দুই বোন নিয়ে ঢাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। তার বাবা সরকারি কলেজের শিক্ষক ছিলেন এবং পিরোজপুর কলেজ রোডে তাদের একটি ছোট বাড়িও রয়েছে।