দেলুর খপ্পরে পড়ে শত কোটি টাকা নেই ৯১১ ব্যবসায়ীর

শুক্রবার, জানুয়ারি ৮, ২০২১

ঢাকা : রাজধানীর ফুলবাড়িয়া এলাকার নগর প্লাজা ও জাকের মার্কেটের ৯১১ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অবৈধ দোকান বৈধ করার নামে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে মার্কেটের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলুর বিরুদ্ধে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সব দায় চাপিয়ে দিচ্ছেন ডিএসসিসির সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের ওপর।

অথচ ফুলবাড়িয়া এলাকার ডিএসসিসির মালিকানাধীন নগর প্লাজা, সিটি প্লাজা ও জাকের প্লাজায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিলো দেলুর। রাজনৈতিক দলের কোনো পদ পদবি নেই, নেই কোনো দলের সংশ্লিষ্টতা। তবে যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া পান তিনি। এমন সুযোগে গড়ে তোলেন অপরাধ সিন্ডিকেট।

জানা গেছে, ৯১১ অবৈধ দোকানকে বৈধতা দেয়ার কথা বলে বছরের পর বছর লাখ লাখ টাকা তোলা হয়। দেলুর এ কাজে সহায়তা করেছেন ডিএসসিসির একশ্রেণির কর্মকর্তারা। এসব দোকানের বৈধতা না মেলায় ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ এই তিন মার্কেটের ৯১১টি দোকান উচ্ছেদ করেছে। এর ফলে এসব ব্যবসায়ীরা এখন পথে বসেছেন।

মার্কেট কমিটির এক সদস্য বলেন, এসব দোকান ছিলো সিটি কর্পোরেশনের মার্কেটের নকশার বহির্ভূত। তারপরেও অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয় ৯০০ দোকান। বাথরুম, বাথরুমের সামনের খোলা জায়গা, লিফটের জায়গা, ফ্লোর স্পেস, বারান্দা, বেজমেন্ট ও ক্রেতাদের হাঁটাচলার জন্য খোলা জায়গা দখল করে এসব দোকান বানানো হয়। পরবর্তীতে ডিএসসিসির কিছু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দেলোয়ার হোসেন দেলু প্রতিটি দোকান ২০-২৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেন।

জানা গেছে, দেশে অনলাইন ক্যাসিনোর সূত্রপাতও দেলুর হাত ধরেই। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে দেলোয়ার হোসেন দেলুর আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতারা গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান। পরে গোপনে দেশে ফেরেন। রাজধানীর পল্টনে একটি আবাসিক হোটেলে অবৈধভাবে মদের বার চালান তিনি। তার নামে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, এক শাটার দোকানের বৈধতার জন্য দেলোয়ার হোসেন দেলুর মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনকে দিতে হয়েছে ১০ লাখ টাকা। আর দুই শাটার দোকানের জন্য ১৫-২০ লাখ টাকা। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ বিল থেকে শুর করে সবকিছুতেই বাড়তি টাকা নেয়া হতো। সরকারিভাবে ব্যবসায়িক বিদ্যুৎ বিলের ইউনিট ১৫ টাকার মতো কিন্তু মার্কেট কমিটির লোকজন নিতো ২৫ টাকা। তারা নিজেরা বিদ্যুৎ বিলের টাকা ওঠাতো এবং জমা দিতো। প্রতি মাসে শুধু অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ২০ লাখ তুলতেন মার্কেট কমিটির লোকজন।

নগর প্লাজা, সিটি প্লাজা ও জাকের প্লাজার সভাপতি দেলোয়র হোসেন দেলু বলেন, আমি মার্কেটের সভাপতি হতে চাইনি আমাকে জোর করে বানানো হয়েছে। আমি মার্কেটের ব্যবসায়ীদের টাকা দিতে না করেছি। কিন্তু সাবেক মেয়র আর সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তারা মিলে অবৈধ দোকান বৈধ করার কথা বলে এই মাকের্টগুলো থেকে টাকা নিয়েছে। শুধু তাই নয়, আমি টাকা দিতে না করেছি বলে আমাকে নগর ভবনে নিয়ে ভয়ভীতিও দেখিয়েছেন কর্পোরেশন কর্মকর্তারা।

তিনি আরো বলেন, আমি ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে টাকা নেয়ার সঙ্গে জড়িত নই। টাকা নিয়েছেন সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন। সব প্রমাণ রেখে দিয়েছি আমি, কত প্রমাণ চান; সব প্রমাণ আমি দিতে পারবো।

তি‌নি আরও ব‌লেন, যারা আমার না‌মে অ‌ভি‌যোগ ক‌রে‌ছে তা‌দের না‌মে মামলা ক‌রে‌ছি । আপ‌নি কো‌র্টে গি‌য়ে খোজ নি‌তে পা‌রেন। ত‌বে নিউজ য‌দি ক‌রেন ভা‌লো ক‌রে জে‌নে শু‌নে কর‌বেন ।

সিটি প্লাজার সাধারণ সম্পাদক সুমন বলেন, ২০১৮ সাল থেকে অবৈধ দোকান বৈধ করার কথা বলে টাকা ওঠানো হয়েছে। এই টাকা গুলো আমরা মার্কেটের কমিটির লোকজন উঠিয়ে ব্যাংকে জমা দিয়েছি। এখন ব্যবসায়ীরা বলছে ১০ বা ২০ লাখ করে ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে টাকা নেয়া হয়েছে, কিন্তু এতো টাকা নেয়া হয়নি। এক একজন ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে ৫ লাখ করে টাকা নেয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিল বেশি নেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমরা নিজেরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে জমা দিতাম, কিন্তু এতো টাকা নেয়া হতো না। তবে এই বিষয়ে নিয়ে মোবাইলে কথা বলবো না।

জাকের মার্কেটের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আলমগীর হোসেন বলেন, জাকের মার্কেটে ২১৯ নম্বর দোকান ছিলো আমার। ১৫ লাখ অ্যাডভানস দিয়েছি। এখন দোকান নেই, ব্যবসাও নেই, সংসার চালাতে পথে নেমে গেছি। আমাদের কাছে থেকে দোকান বৈধতার নাম করে দফায় দফায় লাখ লাখ টাকা নিয়েছে। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ বিল থেকে শুর করে সবকিছু বাড়তি দিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল যদি হতো ১০০ ইউনিট, বিল দিতে হতো ২০০ ইউনিটের। এসব কিছুই মার্কেটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কমিটির লোকজন নিয়ন্ত্রণ করতো।

মোর্শেদ আলম নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ৪৭ নম্বর ছিলো আমার। মাকের্ট কমিটি নেতারা দফায় দফায় টাকা নিয়ে সিটি কর্পোরেশনকে দিয়েছে দোকান দেয়ার কথা বলে। এখন দোকান ভেঙে দিয়েছে। দোকান থাকতে সবকিছুই করতো মার্কেট কমিটির লোকজন। তবে এখন কাউকে দেখি না।

নগর প্লাজার ৩৯ নম্বর দোকানের ব্যবসায়ী গোলাম মাওলা বলেন, মেয়রের নাম দিয়ে দোকান বৈধতার কথা বলে মার্কেট কমিটির লোকজন টাকা নিয়েছে। এখন তো দোকান ভেঙে দিয়েছে, সব হারিয়ে পথে বসেছি।

এদিকে ফুলবাড়িয়া-২ মার্কেট থেকেই ২০১৮ সালে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ২১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে দাবি করছেন দোকান মালিক সমিতির সভাপতি। এই বিষয়ে কথা বলার জন্য সাঈদ খোকনের সঙ্গে অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।