মোদি হাঁটছেন স্বৈরশাসনের পথে

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১, ২০২০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নভেম্বরের শুরুর দিকে ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামীকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। গোস্বামীর গ্রেফতারকে মুক্ত বক্তৃতার ওপর আক্রমণ হিসাবে অভিহিত করে জামিন মঞ্জুর করার দাবি তোলেন মোদি সরকারের মন্ত্রীরা।

আদালত তাকে মুক্ত করে দেয়। আদালতের রায়টি অবাক করার মতো ছিল না। তবে, হতাশাব্যাঞ্জক ছিল আদালতের হস্তক্ষেপের গতি। গোস্বামী আটকের এক সপ্তাহ অতিবাহিত করেছিলেন। তবুও এমন একটি দেশের শীর্ষস্থানীয় বিচারকরা তার আপিলের মাত্র এক দিনের মধ্যে জামিনের শুনানির সময় নির্ধারণ করতে প্রায় ৬০ হাজার মামলার জামিন শুনানি ডিঙিয়েছেন, যে দেশের কারাগারে বিচারের অপেক্ষায় প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার লোক ইতিমধ্যেই বন্দি রয়েছেন।

অথচ একই সপ্তাহে উপজাতীয়দের অধিকার আদায়ে কাজ করা ৮৩ বছর বয়সী জেসুইট পুরোহিত ফাদার স্টান স্বামীকে মাওবাদী সন্ত্রাসী হিসাবে আটক করা হলে তিনি পারকিনসন্স রোগে ভুগছেন এবং হাতে কাপ স্থির রাখতে পারেন না বলে নিম্ন আদালতে একটি স্ট্র সরবরাহের আবেদন করেছিলেন। আদালত সেই শুনানিটি ২০ দিনের জন্য স্থগিত করে। পাশাপাশি, গত বছরের আগস্টে জম্মু ও কাশ্মীরের বিদ্রোহ দমনে হাজার হাজার বাসিন্দাকে আটক করা হলেও হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি জামিন মঞ্জুর করে আদালত।

আরও সাংঘাতিক বিষয় হ’ল সাংবিধানিক প্রশ্নগুলোতে আদালতের উদাসীনতা। ২০১৭ সালে মোদি বিতর্কিত আইন ‘নির্বাচনী বন্ধন’ তৈরি করে সংসদে গিয়েছিলেন এবং জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, বাজেটের বিষয় হিসাবে এটি উচ্চকক্ষের তদন্তের দরকার নেই, যা তখন বিজেপির নিয়ন্ত্রণে ছিল না। সুপ্রিম কোর্ট এ পর্যন্ত বিজেপির এ নয়া উদ্ভাবনের সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা করে দেখেনি, যা রাজনৈতিক দলগুলোতে সীমাহীন, বেনামে টাকা ঢালার অনুমতি দিয়েছে। এখনও বিচারপতিদের সামনে কাশ্মীর পরিস্থিতি এবং ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে প্রায় ১শ’ ৪০টি আইনী আবেদন অবহেলায় পড়ে রয়েছে, যা ধর্মকে নাগরিকত্বের মানদন্ড হিসাবে সন্নিবেশিত করে ভারতীয় রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ প্রকৃতিকে ক্ষুণ্ন করে।

কেবল আদালতই যে মোদি সরকারের সাথে তাল মেলাচ্ছে, তা নয়। ভারতের অন্যান্য প্রাতিষ্ঠনগুলোও এমন একটি যজ্ঞে শামিল হয়ে পড়েছে, যা দেশটিকে একদলীয় হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার হুমকিতে ফেলেছে। নতুন নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেই আন্দোলনে পুলিশের পাথর ছোঁড়া এবং বন্দি মুসলিম যুবকদের ওপর নির্যাতন হলেও দিল্লির হর্তাকর্তারা বিজেপি সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নথিভুক্ত করতে অস্বীকার করে।

গত বছর ১৯৬৭ সালের অবৈধ কর্মকান্ড প্রতিরোধ আইনে একটি সংশোধন করা হয়, যা রাষ্ট্রকে যেকোনো রাজ্য, ব্যক্তি বা দলকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে চিহ্নিত করার এবং নিষিদ্ধ করার অনুমতি দেয় এবং এটি মোদি সরকারকে কোনও ব্যক্তিকে সন্ত্রাসী হিসাবে মনোনীত করার ক্ষমতা দিয়েছে। এখন তারা সন্দেহভাজনদের জামিনের অধিকার না দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধরে রাখতে পারে, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে এবং যে কোনও সহযোগীকে সন্ত্রাসবাদের অনুচর হিসাবে জড়িত করতে পারে।

মোদির অর্থনৈতিক নীতিমালার প্রশংসা না করায় তিনি ইতোমধ্যে দু’বার ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রধানকে প্রতিস্থাপন করেছেন। মোদি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কমান্ডার-ইন-চিফের ভ‚মিকাকে চমকপ্রদ করে তুলেছেন। তাই যখন চীনা বাহিনী ভারতের সীমান্ত অঞ্চলিকে কৌশলগতভাবে দখল করে ছিল, তখন ভারত সরকার খবরটি অস্বীকার করলে দেশটির সেনাবাহিনীও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছিল।

২০১৯ সালে সরকার আরটিআই আইন সংশোধন করে। এটি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মেয়াদ ও মর্যাদা হ্রাস করে। আশ্চর্যের বিষয়, কমিশন জনগণের কাছে ‘অপর্যাপ্ত তথ্য’ উল্লেখ করে জনগণের তথ্য সরবারাহের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। এমনকি ভারতীয় ভোটের বিশাল লজিস্টিক্স পরিচালনার সাত দশকের একটি দুর্দান্ত রেকর্ডসহ ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতাও মোদি সরকারের যাচাইয়ের আওতায় এসেছে। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়, মোদি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিলেন। মোদি এবং অন্যান্য শীর্ষ বিজেপি নেতারা বারবার যখন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উস্কে দিচ্ছিলেন, তখন তার বিরোধীরা তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। অন্যদিকে ইসি তৎক্ষণাত বিরোধীদের ওপর নির্বচনী বিধি লঙ্ঘনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তিনজন শীর্ষ কমিশনারের মধ্যে একজন আপত্তি করেছিলেন, কিন্তু তা বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে তার পরিবার শুল্ক ফাঁকি দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। কর্মকর্তাটি তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ইসি ছেড়ে দেন।

বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিজেপি তার প্রতিদ্ব›দ্বীদের শক্তি, সাংগঠনিক শক্তি এবং আর্থিক সহায়তার তুলনায় বহুগুণ। সে তুলনায় গান্ধী বংশের নেতৃত্বটি ধীরে ধীরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ২৩ জন কংগ্রেস নেতার অন্যতম গোলাম নবী আজাদ সম্প্রতি দলীয় সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর কাছে পরিবর্তন আনার জন্য আবেদন করেছিলেন। তিনি বলেছেন, নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে তৃণমূল মানুষের সাথে যোগাযোগ ছিন্ন হয়েছে। এর সাংগঠনিক কাঠামো ধসে গেছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশে মোদির দল কৌশলে কংগ্রেসের একদল কর্মীকে দলে টেনে নেয়।

বিজেপি সমালোচনাকারী সংবাদমাধ্যমগুলোর কণ্ঠও রোধ করে দিয়েছে। গত দু’মাসে, নতুন নিয়ম অনলাইন মিডিয়ায় বিদেশি বিনিয়োগের স্তর হ্রাস করেছে এবং পুরো খাতটিকে সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেখেছে। এর মধ্যে গেল ২৪ নভেম্বর কঠোর তদন্তকারী সংবাদমাধ্যম হাফপোস্ট ইন্ডিয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মোদি সরকারের বিদেশী অনুদান সংক্রান্ত সম্মতি বিধিমালা ইতোমধ্যে কয়েক হাজার এনজিও বন্ধ করার জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে। সাম্প্রতিক উদাহরণ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারত শাখাটি।

মোদি এখন তার সাম্রাজ্যবাদী রীতিতে ভারতের রাজধানী দিল্লি পুনর্র্নির্মাণের জন্য গভীর আগ্রহী। একটি অস্বচ্ছ এবং তাড়াহুড়ো প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মোদির নিজের পছন্দসই স্থপতি ও গুজরাটি সহযোদ্ধাকে প্রধান ডিজাইনার হিসাবে বেছে নিয়েছেন। শহরটির তিন কিলোমিটার লনের জায়গায় নিম্নকক্ষের ৫শ’ ৪৫ এমপির দ্বিগুণ আসনের কার্যালয় তৈরি হবে। পুরানো ভবনটিকে গণতন্ত্রের যাদুঘর বানানো হবে এবং স্বাভাবিকভাবেই, প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি বড়, বিলাসবহুল আবাস এবং অফিস থাকবে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত জো বাইডেনের অভিনন্দনমূলক ফোনকলে তাদের মধ্যে যে দু’টি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে ‘দেশে এবং বিদেশে গণতন্ত্রকে জোরদার করতে’ একটি যৌথ প্রতিশ্রুতি ছিল, যা মোদির অফিস পরে উহ্য রাখে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক তরুনাভ খাইতান তার একটি গবেষণায় লিখেছেন, ‘একটি সংবিধানকে হত্যা করছে সহস্র কাটাছেঁড়া। আমাদের এখন ভেড়ার মুখোশের আড়ালে একটি নেকড়ে রয়েছে। আমরা স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছি।’ তার এ মন্তব্য ভারতের গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয় এবং মোদির স্বৈরাচারী নীতিকে বিশদে বিবৃত করে। সূত্র : দ্য ইকোনোমিস্ট।