যেভাবে সাক্ষী থেকে ‘আসামি’ মিন্নি

বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

বরগুনা : বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের মধ্যে ৭ নম্বর আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। রিফাত হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি যে পরিকল্পনা তা প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান আদালত।

কলেজের ভেতরে রিফাতকে যেতে না দেয়া, সময়ক্ষেপণ করা, রিফাতের মোটরসাইকেলে না ওঠা, রিফাতকে যখন ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তখন মিন্নির ধীরগতি বা স্বাভাবিক গতিতে যাওয়াসহ নানা বিষয় বিবেচনায় মিন্নির পরিকল্পনা প্রমাণিত হয়েছে। এরপর মামলার তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে। স্যোস্যাল মিডিয়াসহ সারা দেশে বিতর্কের ঝড় বইতে শুরু করে।

মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসে রিফাত হত্যার প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের সাথে মিন্নির বিভিন্ন ছবি, ভিডিও ও ফেসবুক স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়। সন্ত্রাসী নয়নের মা’র দাবি- নয়নের সঙ্গে মিন্নি বিয়ে হয়েছিল, সংসারও হয়েছিল। রিফাতের সঙ্গে বিয়ের পরেও নয়নের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল মিন্নির। হত্যার একদিন আগেও নয়নের সঙ্গে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন মিন্নি। এছাড়াও নয়ন-মিন্নি বিয়ে রেজিস্ট্রি করা কাজীও কাবিলনামাসহ বিয়ের সতত্যা নিশ্চিত করেন। এছাড়াও রিফাত হত্যার সময় প্রথম দিকের একটি ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এতে প্রথম দিকে রিফাতকে যখন সন্ত্রাসীরা ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন মিন্নিকে নিরব দেখা যায়। অনেক পেছন পেছন নিরব ও স্বাভাবিকভাবে হাঁটছিলেন মিন্নি।

বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ৬ আসামির ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে খালাস পেয়েছেন বাকি ৪ জন।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বরগুনা জেলা দায়রা ও জেলা জজ আদালতের বিচারক মো. আসাদুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন।

মেয়ের মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মিন্নির বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, ‘আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে আমাদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। সঠিক বিচার পাইনি। আমরা উচ্চ আদালতে যাবো।’

অন্যদিকে মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ দ্রুত এ মামলার রায় ঘোষণা করায় আদালতকে ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, ‘ গত এক বছর ধরে আমাদের পরিবারের সদস্যরা কাঁদছে। নির্ঘুম রাত কাটছে। তবে ওই কান্না আর আজকের কান্নার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই কয়টা মাস এ দিনটার জন্যই অপেক্ষা করেছিলাম। এবার আমার ছেলের আত্মা শান্তি পাবে। আমরা সুবিচার পেয়েছি। দণ্ড কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছি না।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে রাম দা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে। একাধারে রিফাতকে কুপিয়ে বীরদর্পে অস্ত্র উঁচিয়ে এলাকা ত্যাগ করে হামলাকারীরা। গুরুতর আহত রিফাতকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এ ঘটনায় গত বছরের ২৭ জুন সকালে নিহতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে প্রথমে ১২ জনের নাম ও আরও ৫-৬ জনকে অজ্ঞাত উল্লেখ করে বরগুনা সদর থানায় মামলা দায়ের করেন।

পরে ১৬ জুলাই সকালে মিন্নিকে তার বাবার বাড়ি বরগুনা পৌর শহরের নয়াকাটা-মাইঠা এলাকা থেকে পুলিশ লাইনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয়। এরপর দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওইদিনই রাত ৯টায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে তাকে রিমান্ড নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তখন স্বামী রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন মিন্নি।

গত ১ জানুয়ারি আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ মামলার ১০ প্রাপ্তবয়স্ক আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত। এরপর ৮ জানুয়ারি অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন বরগুনার শিশু আদালত।

এরইমধ্যে গেল ১৯ জুলাই মিন্নি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। মিন্নিকে বরগুনা জেলা জজ ৩০ জুলাই জামিন নামঞ্জুর করলে সেই আদেশের বিরুদ্ধে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক কিশোর হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন।

গত ২৯ আগস্ট দুই শর্তে হাইকোর্ট থেকে জামিন পান মিন্নি। রাষ্ট্রপক্ষ মিন্নির জামিন বাতিল চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করেন। গত ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন চেম্বার বিচারপতি।