সাভারে ইয়াবা ও মদসহ মাদক ব্যবসায়ী ডিব্বা বাবু ওরফে রোহান গ্রেফতার

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০

জাহিন সিংহ, সাভার থেকে : সাভারের শাহীবাগের বৃদ্ধ সরোয়ার যখন বলছিলেন, আমার সামনেই র‌্যাব ইয়াবা, বিদেশী মদ, বিয়ারসহ “ডিব্বা বাবুকে” ২ সহযোগীসহ আটক করেছে তখন বেশ খটকাই লাগছিলো।

কারণ ডিব্বা বাবু হিসেবে যাকে বলা হচ্ছিলো, আসল ব্যক্তির সাথে তাকে মেলানোটা বাস্তবিক অর্থেই ছিল খুব কঠিন।

চাপাইনবাসি তাকে “ডিব্বা বাবু” হিসেবে চিনলেও সাভারবাসী তাকে চেনেন রোহান ইসলাম। সাভার সিটি সেন্টারের কেতাদুরস্ত, ফ্যাশন সচেতন ওই যুবকের আসল নাম আনোয়ার হোসেন‌।

দোকানের কর্মচারী থেকে রাতারাতি মালিক বনে যাওয়া আনোয়ার বাপ-মার দেয়া নাম পরিত্যাগ করে সকলের কাছে পরিচিত হন “রোহান ইসলাম” নামে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, ছাত্র সংগঠনের নেতাসহ নানান ব্যক্তিদের সাথে ছবি তুলে নিজেকে সমাজের কাছে “কিছু একটা দেখিয়ে” জাহির করাই ছিলো ডিব্বা বাবু ওরফে রোহান ইসলাম ওরফে আনোয়ার হোসেনের নেশা।

কিন্তু তলে তলে তার ইয়াবা কারবারি চেহারাটা কেউ টের না পেলেও ঠিকই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলো এই ডিব্বা বাবু।

প্রথমে অন্ধ মার্কেট পরে চৌরঙ্গী মার্কেট হয়ে সিটি সেন্টারের সকাল-সন্ধ্যা বাজার নামে বিপদ বাবুর দোকানের সেলসম্যান হিসেবে কাজ করেন আজকের কথিত রোহান ইসলাম ওরফে ডিব্বা বাবু। গত কয়েক বছর আগে কোরাইশী মার্কেটে কসমেটিকস

ব্যবসায়ী মাকসুদুর রহমানের দোকানে মাসিক ২২’শ টাকা বেতনের কর্মচারী ছিলেন। তারপর ইয়াবা কারবারে যুক্ত হয়ে রাতারাতি অর্থবিত্ত বানিয়ে “স্মার্ট পয়েন্ট” নামে সিটি সেন্টারে নিজেই ব্যবসা ফেঁদে বসে এই রোহান।

সাভারের এক জনপ্রতিনিধির ঘনিষ্ঠজনকে “বন্ধু” বানিয়ে রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন ডিব্বা বাবু। তার সঙ্গে সেলফি, কখনো নিজেই নিজের দোকানের মডেল হওয়া, কখনো পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা ছাত্রলীগ নেতার জন্মদিনে “উইশ” করে অনেকের কাছেই নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন এই মাদক ব্যবসায়ী।

বাবার ছোট চাকরি। নিজের সেলসম্যানের জীবন থেকে রাতারাতি বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক বনে যাওয়া রোহানের অস্বাভাবিক “উন্নতিতে” পড়শী ব্যবসায়ীদের অনেকেই চোখ উঠেছিলো কপালে।

তবে কি কথিত রোহান আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছে? – এমন প্রশ্নও ছিল কারও কারও।

কিন্তু প্রভাবশালীদের সাথে উঠাবসা কারণে এমন প্রশ্ন করার সাহস হতো না কারো। উল্টো এই মাদক ব্যবসায়ীকেই সমীহ করে চলতেন অনেকে। এভাবেই দিনে দিনে সেলসম্যান থেকে ডিব্বা বাবু ওরফে আনোয়ার ওরফে রোহান ইসলাম প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় বনে যান ব্যবসায়ী নেতা।

সাভার সিটি সেন্টার দোকান মালিক ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পরিচয়ে এই ডিব্বা বাবুকে সাভারের রাজনীতির মাঠে অনেক নেতার জন্য ফেসবুকে প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা গেছে।

র‌্যাবের একটি সূত্র বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ ডিব্বা বাবু ওরফে আনোয়ার ও রোহান ইসলামকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এবিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। ডিব্বা বাবুর ভাই রাতুল হাসান তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন। একইভাবে তার বোন লাবনীও ফোনের লাইন কেটে দেন।

মনির হোসেন নামে সাভার সিটি সেন্টারের একজন মোবাইল ব্যবসায়ী জানান, ডিব্বা বাবু ওরফে আনোয়ারের চালচলন, তার বিলাসবহুল বিয়ের পার্টি, সবকিছুই ছিলো আয়ের সাথে সঙ্গতিবিহীন। এক কথায় অবাক করার মত।

যোগাযোগ করা হলে, সাভারের একজন নেতা জানান, ডিব্বা বাবু নামে আমি কাউকে চিনি না। আনোয়ার হোসেন পরিচয় বলার পরও তিনি চিনতে পারেননি।

সিটি সেন্টারের ব্যবসায়ী রোহান ইসলাম! চেনেন তাকে?

তখন চট করে বলেন “হ” চিনি তো! ফিটফাট পোলাডা।

এটাই সেই ডিব্বা বাবু। শনিবার বিকেলে সে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ ধরা পড়েছে র‌্যাবের হাতে।

“কন কি? এই পোলা ইয়াবা ব্যবসা করে!”

হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে ফেসবুকে তার অসংখ্য ছবি আছে।

একটু চিন্তিত ও বিষন্ন মনে ওই নেতা বলেন, যা দিনকাল পড়ছে! সবাইতো দেখি বাইরে ফিটফাট। ভিতরে সদরঘাট। নাহ! এখন কারো সাথে ছবি তোলাও দেখছি বিপদ!

যাউক গা। আমারে কোথাও কোড কইরেন না।

“ওই খবর পাইছোস! তোগো রোহান ইসলাম না’কি ডিব্বা বাবু ইয়াবাসহ র‌্যাবের হাতে ধরা খাইছে!”

ওই নেতার কন্ঠে এমন হাঁক ডাক শোনার পর পর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এব্যাপারে সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম জানান, মাদকসহ ডিব্বা বাবু ও তার সহযোগীদের আটকের পর রাতে মাদক মামলা দিয়ে সাভার মডেল থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব। আসামিদের আজ দুপুরে আদালতে প্রেরণ করা হবে।