‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঠিকভাবেই চলছে, কাঁটাও আছে অনেক’

মঙ্গলবার, আগস্ট ১১, ২০২০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতের সাবেক বিদেশ সচিব শ্যাম সারন মনে করেন বাংলাদেশ এবং ভারতের সম্পর্ক ঠিকভাবেই চলছে। তবে কাঁটাও অনেক রয়েছে। এই কাঁটার বেশ কিছু তৈরি হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোন আলাপের বিষয়ে সারন মনে করে বাংলাদেশের তরফে পাকিস্তান কোন ইতিবাচক সাড়া পায় কিনা এটা দেখার বিষয়। তার আগে অন্য কোন অর্থ খোঁজার পক্ষপাতি নন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

আনন্দবাজারের সাংবাদিক অগ্নি রায় তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, অনেকের মত, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের লেখচিত্র ক্রমশ নিম্নগামী, কিছু রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক কারণে। চীন সেই ফাঁকা জায়গাটি দখল করতে সক্রিয়। এ ব্যাপারে আপনার কী মত?

উত্তরে সারন বলেন, ভারতের সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রেই চীন তার প্রভাব ক্রমশ বাড়াচ্ছে, বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। এটা ঘটনা, চীন যে পরিমাণ টাকা ঢালতে সক্ষম, তার সঙ্গে পাল্লা দেয়া ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আমার মনে হয়, চীনের কাছ থেকে আর্থিক আনুকূল্য নেয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশ অনেকের থেকেই (যেমন, শ্রীলঙ্কা) বেশি সতর্ক। দক্ষিণ এশিয়ার সমস্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার ক্ষমতা রয়েছে ভারতের। কিন্তু তার জন্য দেশগুলির কাছে নিজের বাজার খুলতে হবে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। নিজেদের এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে অন্যান্য রাষ্ট্র টাকা ঢালতে উৎসুক হয়।

আমার মতে, মোটের উপর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঠিক পথেই চলছে। তবে কাঁটাও অনেক রয়েছে। সে সব কাঁটার কিছু তৈরি হয়েছে আমাদের ঘরোয়া রাজনীতির কারণে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অনুপ্রবেশের বিষয়টা। বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষদের কথা বলতে গিয়ে ‘উইপোকা’র মতো শব্দ ব্যবহার করা হলে অথবা তাতে সাম্প্রদায়িক রং দেয়া হলে যদি বাংলাদেশের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়, তা হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সিএএ-তে বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের বিষয়টি
রয়েছে, যা ঢাকাকে আহত করেছে।

অগ্নি রায় প্রশ্ন করেন, পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে ফোনে কথা হল হাসিনার। পাকিস্তানের দাবি, তাঁদের আলোচনায় নাকি উঠে এসেছে কাশ্মীর প্রসঙ্গও…

উত্তরে সারন বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অন্য যে দেশের নেতার সঙ্গে কথা বলবেন, সেখানেই কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলবেন, এটা ধরে নেয়াই যায়। এখন দেখার যে, অন্য পক্ষের কাছ থেকেও এ ব্যাপারে কোনও ইতিবাচক সাড়া তিনি পাচ্ছেন কি না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করেছেন, এমন কোনও প্রমাণ আমি পাইনি। তাই এর মধ্যে অন্য কোনও অর্থ খোঁজার পক্ষপাতী নই।

সারনের কাছে প্রশ্ন ছিল, তেল থেকে বন্দর ইরানের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে চীনের বিপুল বিনিয়োগ ভারতের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। আপনার কী মনে হচ্ছে দেখেশুনে?

জবাবে শ্যাম সারন বলেন, ঠিকই যে সাম্প্রতিক অতীতে ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সামরিক সম্পর্ক ক্রমশই বেড়েছে। কিন্তু তার গুরুত্বকে একটু বাড়িয়ে দেখা হচ্ছে বলেই মনে হয়। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ইরান সফরে, ১০ বছরের জন্য ষাট হাজার কোটি ডলার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষিত হয়েছিল। বাস্তবে দেখা গিয়েছে, কোনও বছরই তা সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলার ছাড়ায়নি। ইরান-চীন কৌশলগত অংশীদারিত্বের খসড়াটি গত বছর প্রকাশ্যে আসে। তাতে দেখা যায়, ইরানের পরিকাঠামো, তেল ও গ্যাস-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের সম্ভাব্য বিনিয়োগ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এখন ব্যাপার হল, এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংলাপের অন্যতম উপাদান হয়ে উঠেছে প্রবল ভাবে। খোদ ইরানই তো বলেছে, গোটা ব্যাপারটা প্রস্তাবের স্তরে রয়েছে, যা চীনকে পাঠানো হয়েছে। এর পর সে দেশের সংসদের অনুমতি প্রয়োজন। চীন তো কোনও মন্তব্যই করতে চাইছে না।

আবার অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইসরায়েলের সঙ্গেও চীন সম্পর্ক প্রসারিত করেছে, যাদের সঙ্গে ইরানের অহি-নকুল সম্পর্ক। ভারতের কাছে ইরান বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। আমাদের উচিত তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং সহযোগিতা বজায় রাখা। ভারতের পরিচালনাধীন চাবাহার বন্দর, নর্থ-সাউথ করিডোর যার মাধ্যমে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ছাড়িয়েও সংযোগ গড়া সম্ভব।

নেপালের সঙ্গে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটছে। ভারত-নেপাল সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এ প্রশ্নে

শ্যাম সারন বলেন, নেপালের সঙ্গে সম্পর্কের এই অধঃপতন বেড়ে চলেছে কে পি ওলি সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসার পর। দুর্ভাগ্যজনক। ভারত-বিরোধী আবেগ খুঁচিয়ে তুলে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন সে দেশের রেওয়াজ হয়ে গিয়েছে এবং ওলি তাকেই সুকৌশলে কাজে লাগিয়ে চলেছেন, তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে বহু ধাপ এগিয়ে কালাপানির মতো সামান্য মতবিরোধকে ভূখণ্ডের দাবিতে পরিণত করছেন, যা কৌশলগত ভাবে ভারত-চীন-নেপালের ত্রিপাক্ষিক সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সংবিধানের সংশোধন ঘটিয়ে নেপালের মানচিত্রে একতরফা ভাবে এই ভূখ-টি অন্তর্ভুক্তও করছেন। আগামী দিনে নেপালের কোনও সরকারের পক্ষে এই মানচিত্রকে ফের আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক ভাবে অসম্ভব। ভারতের পক্ষেও এটা মেনে নেয়া মুশকিল। আমার মনে হয়, এটি একটি অমীমাংসিত বিষয় হিসেবেই থাকবে। আশা করি, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্য দিকগুলিতে এর প্রভাব পড়বে না। আসলে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে কূটনৈতিক দৌত্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির বিভিন্ন রাজনৈতিক স্তরে যোগাযোগ রেখে চলা উচিত। একমাত্র তা হলেই বড় সঙ্কট তৈরি হওয়ার আগে সর্তকবার্তা পাওয়া যায় এবং সমস্যাটি অঙ্কুরেই বিনাশ করা যায়।

ভারত-চিন সংঘাতে মস্কোর ভূমিকাকে কী ভাবে দেখছেন? গালওয়ান-কা-ে তাদের পরোক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। রাশিয়ার কোনও স্বার্থ এর পিছনে রয়েছে বলে মনে হয়?

এ প্রশ্নে সারন বলেন, ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের নিজস্ব ব্যাকরণ এবং বন্ধুত্বের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই সম্পর্ককে চীনের নিরিখে মাপা ঠিক হবে না। তবে রাশিয়ারও নিজের স্বার্থ রয়েছে। চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে ব্যালান্সিং ফ্যাক্টর হিসেবে ভারত থাকুক, সেটা রাশিয়া চায়। আমাদের অর্থনৈতিক আদানপ্রদান রাশিয়ার সঙ্গে কমেছে, কিন্তু রাশিয়া এখনও শক্তিক্ষেত্রে ভারতের বড় অংশীদার রাষ্ট্র এবং উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন অস্ত্রের সরবরাহকারীও বটে। আমি খুব একটা নিশ্চিত নই যে, রাশিয়া এই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কত দিন পালন করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত চিনের সঙ্গে সম্পর্ককে আমাদের নিজেদেরই বুঝে নিতে হবে।