বৈরুতে বিস্ফোরণের প্রতিবাদে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ

শুক্রবার, আগস্ট ৭, ২০২০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বৈরুতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর ‘অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের’ মত মারাত্মক দাহ্য পদার্থের ঝুঁকি জেনেও কেন ‍বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয়েছিল, তার জবাব চেয়ে লেবাননে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করেছে হাজারো মানুষ। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় দেশটির পার্লামেন্টের কাছে বিক্ষোভ শুরু হলে পুলিশ তাদের থামাতে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে বলে জানায় বিবিসি।

অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মারাত্মক দাহ্য, যেকোনো সময় ঘটতে পারে বিস্ফোরণ। সব জেনেও বৈরুত বন্দরের কাছের একটি গুদামে ২০১৩ সাল থেকে দুই হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট অনিরাপদ অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল।

গত মঙ্গলবার বিকালে যা থেকেই ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের ধাক্কায় পুরো বৈরুত শহর ভূমিকম্পের মত কেঁপে ওঠে। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় সব। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরো পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।

রাজধানী বৈরুতের অর্ধেকই ধুলিস্যাৎ হয়েছে গেছে। এখনো নিখোঁজ বহু মানুষ। তাই হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়বে। এ ঘটনায় তিন লাখের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৬ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানায় দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ, যাদের মধ্যে বন্দরের মহাব্যবস্থাপকও রয়েছেন। বিস্ফোরণের পর সরকারের প্রতি গাফিলতির অভিযোগ এনে বুধবার এমপি মারওয়ান হামাদহ পদত্যাগ করেন। আরো দুই শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাও পদত্যাগ করেছেন।

এ ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেশটির নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন জর্ডানে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূত ট্রেসি শামৌন। তিনি নিজেও বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করেন।

বৈরুতে বিস্ফোরণের পর আন্তর্জাতিক নেতাদের মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রো প্রথম লেবানন সফর করেছেন। বৃহস্পতিবার বৈরুতের অবস্থা পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, লেবাননে দেশ পরিচালনায় ‘বড় ধরনের’ পরিবর্তন প্রয়োজন। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বানও জানান তিনি।

ফ্রান্সের একটি উদ্ধারকারী দল বৈরুতে উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছে। ধ্বংসস্তুপের নিচে এখনো জীবিত মানুষ আটকা পড়ে আছে বলে ধারণা করছেন তারা।

বিস্ফোরণে এত মানুষ আহত হয়েছেন যে তাদের চিকিৎসা দিতে হাসপাতালগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গণস্বাস্থ্য মন্ত্রী হামাদ হাসান আহতদের চিকিৎসায় সাহায্য করার আবেদন জানিয়েছেন।

প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, লেবাননের কর্মকর্তারা বিস্ফোরণের জন্য যে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটকে দুষছেন, সেটি আসলে লেবাননের নয়, বরং রাশিয়ার মালিকানাধীন একটি পণ্যবাহী জাহাজে করে লেবাননে পৌঁছেছিল।

ছয় বছরেরও বেশি সময় আগের ওই ঘটনায় মোজাম্বিকে যাওয়ার পথে থাকা ওই রুশ জাহাজ ফুটো হয়ে যাওয়ায় লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বন্দরে ভিড়ে। জাহাজটিতে বহন করা হচ্ছিল ২ হাজার টনের বেশি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। সার বানাতে কিংবা বোমা তৈরির কাজে এই রাসায়নিক ব্যবহার হয়।

জাহাজটির আর গন্তব্যে ফেরা হয়নি। অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিরোধের কারণে যে রুশ ব্যবসায়ী জাহাজটি লিজ নিয়েছিলেন তিনি চুক্তি বাতিল করেন। এরপরই জাহাজের অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বৈরুতের বন্দরের কাছের একটি গুদামে নেওয়া হয়। এতবছর ধরে সেখানেই তা পড়ে ছিল।

লেবাননের এক আইনপ্রণেতা সেলিম আউন সরকারি নথির বরাত দিয়ে বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এই দাহ্য পদার্থ কীভাবে সরানো হবে সে পরামর্শ চেয়ে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত লেবাননের কাস্টমস কর্মকর্তারা আদালতে অন্তত ছয়বার চিঠি লিখেছেন।

তারা ২,৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট রপ্তানি করা কিংবা লেবাননের সেনাবাহিনীকে তা অনুদান হিসাবে দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। কিন্তু বিচারবিভাগ তাদের চিঠির কোনও জবাব দেয়নি।

বৈরুত বন্দরের জেনারেল ম্যানেজার হাসানও বুধবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কাস্টমস এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বার বার অনুরোধের পরও ‘কিছুই হয়নি’।

তিনি বলেন, “আমাদেরকে বলা হয়েছিল, ওই পণ্য নিলামে বিক্রি করা হবে। কিন্তু তা আর কখনও হয়নি। বিচারবিভাগও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।”