সাবরিনা-আরিফের ছিলো বেপরোয়া জীবনযাপন

শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২০

ঢাকা: করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) টেস্ট জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ও জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের চিকিৎসক ডা. সাবরিনা চৌধুরী দ্বিতীয় বিয়ে করার পর বেপরোয়া জীবনযাপনেও হয়ে উঠেন।

বিভিন্ন মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদফতরে প্রভাব খাটিয়ে স্বামী আরিফুল চৌধুরীর জোবেদা খাতুন সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা তথা জেকেজি হেলথকেয়ারকে সরকারি কাজ পাইয়ে দিতেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরী। ফলশ্রুতিতে করোনার এ দুর্যোগকালে জেকেজি হেলথকেয়ার প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়।

আরিফের সঙ্গে বিয়ের পর বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ডা. সাবরিনা। দুজনে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও ঠিকাদারি কাজ পেতে নানামুখী তদবির করেন ডা. সাবরিনা।

এক্ষেত্রে ডা. সাবরিনা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)-এর কয়েকজন নেতাকে কাজে লাগান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তথ্য বলছে, আরিফের এটি চতুর্থ আর সাবরিনার দ্বিতীয় বিয়ে। তবে বিয়ের পর সুখের সংসার সাজানোর বদলে বিষে পরিণত হয়েছে। কারণ সাবরিনার দাবি, আরিফ অনেক সময় তাকে মারধর করতেন। আর বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২৭তম বিসিএসে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেয়া সাবরিনাও অনেকটা বেপরোয়া চলাফেরা করতেন। তার প্রথম বরের সম্পর্কে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। কেউ বলছেন, বরও চিকিৎসক ছিলেন। অন্য একটি সূত্র বলছে, টেলিকম কোম্পানির উচ্চ পদের কর্মকর্তা ছিলেন। প্রথম স্বামীর ঘরে তার দুটি সন্তানও আছে বলে জানা গেছে।

সাবরিনার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে। তার বাবা সাবেক আমলা। তিনি ঢাকার শ্যামলীতে নিজ বাড়িতে বসবাস করেন। তার দুই মেয়ের মধ্যে ডা. সাবরিনা বড়। বাবার চাকুরীর সুবাদে বিদেশে বসেই এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন সাবরিনা। পরে সলিমুল্লাহ মেডিকেলে চান্স পেয়ে দেশে আসেন। সেখান থেকে এমবিবিএস পাস করেন তিনি।

সাবরিনার প্রথম পোস্টিং দিনাজপুরে হলেও পরে বদলি হয়ে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে যোগ দেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। সেখানেই কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রেজিস্টার হিসেবে কর্মরত আছেন।

অভিযোগ আছে, তার বিভাগীয় প্রধান ও বিএমএ’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান মিলনের সঙ্গে সুসম্পর্কের জোরে হাসপাতাল এবং অন্যত্র প্রভাব বিস্তার করতেন সাবরিনা। নিয়মিত ডিউটিও করতেন না বলে অভিযোগ আছে। তাদের দুজনের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কেরও গুঞ্জন আছে।

হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হলেও দুজনই তাদের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন। যদিও এ নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে সাবরিনাকে মারধরও করেছেন আরিফ চৌধুরী।

আরিফের একাধিক স্ত্রীর বিষয়টি গ্রেফতারের পর প্রকাশ্যে এসেছে। আরিফের এক স্ত্রী থাকেন রাশিয়ায়, অন্যজন লন্ডনে। আরেকজনের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। পরে ভালোবেসে ২০১৫ সালে বিয়ে করেন সাবরিনাকে।

অভিযোগ আছে, আরিফ মাদকাসক্ত। যেকারণে সবসময় উগ্রভাব তার মধ্যে। সবশেষ গ্রেফতারের পর তেজগাঁও থানা পুলিশের কাছে রাতে ইয়াবা এনে দেয়ার আবদার করেন তিনি। ওই রাতে থানা হাজতের ফ্যান ও সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করেন আরিফ।

জানা গেছে, ওভাল গ্রুপ নামে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরিফ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করলেও সাবরিনাকে বিয়ের পর স্বাস্থ্য খাতের ব্যবসায় নামেন। পরে নিয়মিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনুষ্ঠান করত তার প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্যসেবা সপ্তাহ ২০১৮-এর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করে। আর এসব কাজ বাগিয়ে নিতে সাবরিনা সহযোগিতা করতেন।

করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট ডেলিভারি দেয়া ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে গত ১২ জুলাই গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রথমে তাকে তেজগাঁও থানা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকলেও সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ১৩ জুলাই তার তিন দিনের রিমান্ডে মঞ্জুর করেন আদালত। তবে মামলার সুষ্ঠু তদন্তে আরও জিজ্ঞাসাবাদের স্বার্থে ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে আরও ৫ দিনের রিমান্ড চান তদন্তকারী কর্মকর্তা।

তবে শুনানি শেষে মহানগর হাকিম মাসুদুর রহমান দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।