বেরোবি ভিসির দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ায় শিক্ষককে শোকজ: বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদ

বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৬, ২০২০

বেআইনিভাবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এইচ এম তারিকুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করায় প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠন। এর আগে ব্যক্তিগত ফেসবুক ওয়ালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দেয় তারিকুল ইসলাম। তার (তারিকুল ইসলাম) স্ট্যাটাস আপত্তিজনক ও মনগড়া বক্তব্য উল্লেখ করে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই নোটিশকে ন্যায়ের পক্ষের কণ্ঠকে রোধ করার অপচেষ্টা বলে মনে করছেন অনেকে।

জানা যায়, গত ১৪ এবং ২৮ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন্তব্য করে ফেসবুকে ব্যক্তিগত ওয়ালে স্ট্যাটাস দেয় এইচএম তারিকুল ইসলাম। তার এই বক্তব্য আপত্তিজনক এবং মনগড়া উল্লেখ করে ৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিন দিনের মধ্যে তারিকুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নোটিশকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে সমালোচনার ঝড়। তারিকুল ইসলামের পক্ষে বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে স্ট্যাটাস দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তারা বলছে- তারিকুল ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি। বর্তমান উপাচার্যের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় সরব ছিলেন তিনি। সেজন্য তার কণ্ঠেকে রোধ করতেই এমন নোটিশ বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

এদিকে রসায়ন বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপককে সম্পূর্ন বেআইনিভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তিনটি সংগঠন ‘অধিকার সুরক্ষা পরিষদ’, ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’, এবং ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ’- এর তীব্র নিন্দ ও প্রতিবাদ জানায়।

অধিকার সুরক্ষা পরিষদ তাদের প্রতিবাদ লিপিতে বলেন- ২০০৯ সালের ২৯ নং আইনের দ্বারা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়। এ আইনের ৪৭ নম্বর ধারায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে সংবিধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ৩৯ নং ধারার ১ এর ৪ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে ‘চ্যান্সেলর কর্তৃক অনুমোদিত না হইলে সিন্ডিকেট এর প্রস্তাবিত কোন সংবিধি বৈধ হইবে না।’ ‘সরকারী কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা-২০১৮’ উল্লেখ করে যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে তা দুটি কারণে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মেলেনা এবং সাংঘর্ষিক। প্রথমত, সরকারি চাকুরিজীবীদের সাথে দর্শনগত কোন মিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। দ্বিতীয়ত, এটি চ্যান্সেলর কর্তৃক অনুমোদিত নয়। আইন প্রণয়নের পর আজ পর্যন্ত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন সংবিধি চ্যান্সেলর কর্তৃক অনুমোদিত হয়নি। ফলে যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে তা বেআইনি।

অধিকার সুরক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মতিউর রহমান বলেন- তাকে (তারিকুল ইসলাম) যে আইনে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে সেটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য নয়। অন্যায়ভাবে তাকে নোটিশ প্রদান করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন- বঙ্গবন্ধু পরিষদ বেরোবি প্রশাসনের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থেকেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনিয়ম-দুর্নীতির শুদ্ধি অভিযান যেন বেরোবিতে কার্যকর না হয় সেজন্য সবসময় উপাচার্য নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়কে নানাভাবে উত্তপ্ত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে এবং সেটা অব্যাহত। বঙ্গবন্ধু পরিষদ পরিষ্কার ভাষায় বলতে চায়- এই সব অনিয়ম দুর্নীতি এবং সরকারের বিরুদ্ধে অপচেষ্টাকারিদের কোন রকম ছাড় দেবেনা বঙ্গবন্ধু পরিষদ। বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহসভাপতি তারিকুল ইসলামকে যে নোটিশ প্রদান করা হয়েছে তা সম্পূর্ন ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে বঙ্গবন্ধু পরিষদ এবং যারা এ নোটিশ প্রদান করে নিজের অন্যায়-অনিয়ম চাপা দিয়ে ক্যাম্পাস উত্তপ্ত করতে চায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ তাদের বিরুদ্ধে যেন দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদের সদস্য সচিব ড. বিজন মোহন চাকী বলেন- বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী তাকে (তরিকুল ইসলাম) শোকজ করার মতো সে কোন কাজ করেনি। সম্পূর্ন বেআইনিভাবে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবু কালাম মো: ফরিদ উল ইসলাম বলেন- অন্যায়ের প্রতিবাদ যে কেউ করতে পারে। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নাগরিক অধিকার। এই কারণে কাউকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়াটা সমুচিন নয়। এ নোটিশ প্রত্যাহার এবং পরবর্তীতে যেন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, সেজন্য শিক্ষক সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা উপাচার্য মহোদয়কে চিঠি প্রদান করব।