ফাউচির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে মরিয়া ট্রাম্প প্রশাসন

মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তার প্রশাসনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং হোয়াইট হাউসের করোনা টাস্কফোর্সের অন্যতম সদস্য ডা. অ্যান্থনি ফাউচি। এই অবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসন ড. অ্যান্থনি ফাউচির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ফাউচি ও তার সতর্কতাকে গুরুত্বহীন করে তুলতে কাজ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ডা. ফাউচিকে নিয়ে হোয়াইট হাউসে সমালোচনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছেই। সিএনএন বলছে, দেশজুড়ে করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ে কাজ করা নয় বরং হোয়াইট হাউস এখন অ্যান্থনি ফাউচির মতো গোটা আমেরিকায় সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন ব্যক্তিত্বের সুনাম নষ্ট করার মতো গর্হিত কাজে ব্যস্ত।

রবিবার এনবিসি নিউজকে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের অনেকেই ড. ফাউচির বিভিন্ন বিষয়ে করা ভুলগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন’। এই বিষয়টি প্রমাণ করতে ওই কর্মকর্তা মহামারি নিয়ে ফাউচির বেশ কিছু মন্তব্যের তালিকা তুলে ধরেন। কর্মকর্তাদের দাবি, এসব মন্তব্য গুরুতর ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, হোয়াইট হাউসে অ্যান্থনি ফাউচির সমালোচনা বৃদ্ধির মধ্যেই রোববার ট্রাম্প প্রশাসনের এক তালিকা প্রকাশ করেছেন। তাতে অতীতে ‘বিভ্রান্তিকর’ মন্তব্য করেছেন সেগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে। ওই তালিকায় ডা.অ্যান্থনি ফাউচির মন্তব্যও তুলে দিয়েছে হোয়াইট হাউস।

সোমবার হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা পিটার নাভারো সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি ফাউচির পরামর্শ গ্রহণ করবো কিনা তাহলে আমি বলবো করলেও তা শুধু সতর্কতার সঙ্গে করবো।’ ট্রাম্পও ফাউচির মতপার্থক্য নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে জানা গেছে।

দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি), চিকিৎসক, গণমাধ্যম এবং বিরোধীদল ডেমোক্র্যাট মিথ্যা বলছে বলে দাবি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। অথচন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ আক্রান্ত দেশ। সংক্রমণ ও মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ধারেকাছে নেই কোনো দেশ। ট্রাম্প এগুলো স্বীকার করে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজি এর প্রধান ড. ফাউচি হোয়াইট হাউসে করোনা টাস্কফোর্সের ও জনগণকে ভাইরাসের বিষয়ে অবহিত করার ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় সদস্য ছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে পরিস্থিতির মূল্যায়ন নিয়ে ফাউচির পর্যালোচনা সাংঘর্ষিক হওয়ার পর এই ভূমিকা কমে আসে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে ফাউচি হয়ে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্রের সব মানুষের একটা ভরসার জায়গা। আর যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু গবেষণা ক্ষেত্রে বিশেষ আধিপত্য দেখায়, বিশ্বজুড়েই অ্যান্থনি ফাউচির ওপর এক ধরনের ভরসা তৈরি হয়েছে। তবে তিনি এর আগে থেকেই মার্কিনিদের চোখে একজন ‘হিরো’ হিসেবেই পরিচিত।

ফাউচি অনেক সময় ভুল কথা বলেছেন (মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেসব কথা বলেছেন বিজ্ঞানকে ভিত্তি হিসেবে ধরে ফাউচি যেসব পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেছেন) সেগুলোর জন্য হোয়াইট হাউসের অনেকেই তার ওপর নাখোশ। তাদের মতে, ফাউচি উল্টোপাল্টা কথা বলছেন।

সম্প্রতি ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থান জানাচ্ছেন ফাউচি। বিশেষ করে ভাইরাস মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালো করছে এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দ্রুত অর্থনীতি পুনরায় চালু করার সমালোচনামূলক মন্তব্য করছেন তিনি। এমনকি তিনি বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক সংক্রমণ ১ লাখ ছাড়িয়ে গেলেও তিনি অবাক হবেন না।

ড. ফাউচির বিভিন্ন মন্তব্য ও পর্যালোচনাকে খাটো করার উদ্যোগ এমন সময় নেওয়া হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন নতুন আক্রান্তের রেকর্ড হচ্ছে। যদিও ট্রাম্প বরাবরই সংক্রমণ বাড়ার চেয়ে পরীক্ষার সংখ্যা বেশি হচ্ছে বলে জোর দিয়ে যাচ্ছেন।

বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ভালোভাবে যুক্তরাষ্ট্র করোনা প্রতিরোধ করছে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেন ফাউচি তার বিরোধিতা করেছেন। এর পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অনেকে দেশ ভাইরাসটির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনলেও ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতায় ছয় মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আরও বেশি মাত্রায় তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে ভাইরাসটি।

প্রথম যখন ট্রাম্প ইবোলার ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন করোনায় গেম চেঞ্জার বলে দাবি করেন তখনই এর বিরোধিতা করেন ফাউচি। কেননা তখন কোনো গবেষণায় ওষুধটি কোভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে যে কার্যকর তার প্রমাণ মেলেনি। পরেও অনেক গবেষণা শেষে দেখা যাচ্ছে, উপকার তো নয় ওষুধটি মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।

এরপর ট্রাম্প বলেছিলেন, যত মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে এর মধ্যে ৯৯ শতাংশের কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফাউচি ট্রাম্পের এমন বক্তব্য দৃঢ়তার সঙ্গেই প্রত্যাখান করেন। আর কেন করবে না, যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত বিশ্বে সর্বোচ্চ ৩৩ লাখের বেশি আক্রান্তের মধ্যে তো ১ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মারা গেছেন।