বেসরকারি ব্যাংকে আতঙ্ক

সোমবার, জুলাই ১৩, ২০২০

ঢাকা : করোনা সংকটের সময় ওয়ান ব্যাংকসহ মোট চারটি ব্যাংক তাদের কর্মকর্তাদের বেতন কমানোর ঘোষণা দিলো। এর আগে এক্সিম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এবং এবি ব্যাংকও বেতন কমানোর ঘোষণা দেয়। বৃহস্পতিবার ওয়ান ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, মূল বেতনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ এবং মোট বেতনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমানো হবে।

তবে ৫০ হাজার টাকার নীচে কারো বেতন নামবে না। ১ জুলাই থেকেই এটা কার্যকর হবে। ব্যাংকের অ্যাসিটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে ঊর্ধ্বতনদের মূল বেতন ১০ শতাংশ কমে যাবে। আর প্রিন্সিপাল অফিসার থেকে নীচের গ্রেডের অফিসারদের মূল বেতন ৫ শতাংশ।

এর আগে গত জুনে সিটি ব্যাংকতাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১৬ শতাংশ বেতন-ভাতা কমায়। ১ জুন থেকে তা কার্যকর হয়েছে।এক্সিম ব্যাংক বেতন কমিয়েছে ১৫ শতাংশ। কার্যকর হয়েছে ১ জুন থেকে।

এই দুটি ব্যাংকে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবি ব্যাংক মে ও জুন মাসের বেতন ৫ শতাংশ কমিয়েছে। তারা একসঙ্গে সিদ্ধান্ত না দিয়ে মাস ধরে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। গত মাসে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়।বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) করোনা মহামারিতে গত জুন মাসে ব্যাংকারদের বেতন কমানোর পরামর্শ দেয়।

তবে বেশ কিছু ব্যাংক বেতন না কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ইউসিবি, এসবিএসি, প্রাইম ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। কিন্তু বাকি বেসরকারি ব্যাংকগুলো কী করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংক আছে ৬০টি।

যেসব ব্যাংকে বেতন কমানো হয়েছে, সেখানকার কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ। অন্য ব্যাংকগুলোতেও বেতন কমানোর আতঙ্ক রয়েছে। বেতন কমানো হয়েছে এমন একটি ব্যাংকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন,‘‘ আমরা করোনার মধ্যে সেবা দিচ্ছি। আমাদের ব্যাংক খাতের ১০ ভাগ কর্মকর্তা কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ৩৫ জন মারা গেছেন। তারপরও বেতন কমানোয় আমরা হতাশ হয়ে পড়ছি।”

ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করোনায় সাধারণ ছুটির দুই মাস দায়িত্ব পালনের জন্য প্রণোদনা ভাতা পেয়েছেন । এখন আর সেটাও দেয়া হয় না। আর স্বাস্থ্য নিরাপত্তার উপকরণও দেয়া হয় নামে মাত্র। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষা সামগ্রী নিজেদের কিনতে হচ্ছে।

আরেকজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, “ব্যাংকগুলো তার কর্মকর্তাদের বেতনেরই যদি সুরক্ষা দিতে না পারে, তাহলে গ্রাহকরা তাদের আমানতের সুরক্ষার ব্যাপারে নিশ্চিত হবে কিভাবে? এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকের ওপর আস্থা কমে যাবে।”

এর বাইরে এপ্রিল মাস থেকে ব্যাংক সুদের হার বেঁধে দেয়ায় ব্যাংকে আমানত কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এপ্রিল থেকে আমানতের জন্য শতকরা ৬ ভাগ এবং ঋণের সুদ সর্বোচ্চ ৯ ভাগ বেধে দেয়া হয়েছে।

যেসব ব্যাংক বেতন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে সেসব ব্যাংকের এমডি বা পরিচালনা পর্ষদের কয়েক জনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেছেন,‘‘ বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে উৎসাহ হারায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে আমরা বিরত থাকতে বলেছি। এই করোনা মহামারির সময় তাদের ওপর চাপ পড়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত যেন না নেয়া হয়। আর সরকার এই সময় করোনা মোকাবেলায় ব্যাংকের মাধ্যমে বেশ কিছু আর্থিক প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে। কোনো কারণে সেগুলোও যেন বাধাগ্রস্থ না হয়।”

কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিজেরাই ঠিক করে। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো ভূমিকা থাকে না বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশে মোট বেসরকারি ব্যাংক ৬০টি। তাদের কর্মী সংখ্যা এক লাখ ৯ হাজারের বেশি। এখনো খুব অল্প সংখ্যক ব্যাংকই বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই এর ফলে এখনই ব্যাংকিং খাতে কোনো নেতবিাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখছেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি বলেন,” যেসব ব্যাংক বেতন কমিয়েছে, সেইসব ব্যাংকের কর্মকর্তারা স্বাভাবিকভাবেই হতাশ হবেন। তবে সেগুলো ছোট ব্যাংক। তারা হয়তো টিকে থাকার জন্যই বেতন কমাচ্ছে।”

সরকারি ব্যাংক বেতন কমায়নি। বড় ব্যাংকগুলোও কামায়নি। আর যারা কমিয়েছে, তাদের কমানোটা সামায়িক বলে মনে করেন তিনি। তার আশা, বেসরকারি ব্যাংকগুলো করোনার কারণে চাপে আছে। আর এ চাপ কমে গেলেই যারা বেতন কমিয়েছে, তারা আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। সূত্র : ডয়চে ভেলে