সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার দায় আসলে কার

শনিবার, জুলাই ১১, ২০২০

ঢাকা : রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিককে অবসরের পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এর মধ্য দিয়ে মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল যুগের অবসান ঘটল।

সরকার বলছে, লোকসানের কারণেই এসব পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে গবেষকরা বলছেন লোকসানের জন্য দায়ী ছিল ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি আর দুর্নীতি যেগুলো সরকার কখনো বন্ধের চেষ্টা করেনি।

অথচ গত বছরের পাট দিবসে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন ‘এত হতাশ হওয়ার কী আছে। আর আমি লোকসান লোকসান করব কেন। এমন একটি পণ্য যার কিছুই ফেলা যায়না সেটি কেন লোকসান হবে। আমরা লোকসান শুনতে চাই না। লাভজনক কিভাবে করা যায়, কীভাবে করতে হবে সেটি দেখতে হবে। কৃষিপণ্য হিসেবে পাটজাত পণ্য প্রণোদনা পেতে পারে।’

এক বছর আগে জাতীয় পাট দিবসের অনুষ্ঠানে লোকসানে হতাশ না হওয়ার কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই শেষ পর্যন্ত লোকসানকেই কারণ হিসেবে দেখিয়ে ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা কার্যকর হয়েছে ১ জুলাই থেকে। এর ধারাবাহিকতাতেই এখন চলছে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের দেনা পাওনা মেটানোর হিসাব।

যদিও সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরেই পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছিল ৮ শতাংশের মতো। তবে আর এ রপ্তানির ৮০ ভাগই বেসরকারি পাটকলগুলোর। বিপরীতে গত এক দশকেই রাষ্ট্রায়ত্ত কলগুলো লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।

অথচ একটা সময় ছিল যখন পাটকলের চাকরিই ছিল সোনার হরিণের মতো, বলছিলেন খুলনার ইস্টার্ন জুটমিলে তিন দশকেরও বেশি সময় কাজ করেছেন এমন একজন শ্রমিক আব্দুল মজিদ।

‘আমি ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারিতে চাকরিতে যাই। আমার তখন ২২ বছর বয়স। আমরা জুট মিলকে কেন্দ্র করে রঙিন স্বপ্ন দেখতাম। অন্য চাকরিতে বোনাস পেতো না। জুট মিলে আমরা পেতাম। অনেক আর্থ সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ছিল। সে জন্য চাকরিতে আগ্রহী হলাম যে নিজেরা ভালো থাকব, ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পারব। এ আশা নিয়েই জুট মিলে ঢুকেছিলাম কিন্তু হাজার হাজার শ্রমিক আজ পথে নেমে গেছে।’

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়ার পর সরকার অবশ্য বলেছে, শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না কারণ তাদের প্রাপ্য যত অর্থ আছে সব পরিশোধ করা হবে, যার ফলে চাকরি হারানো প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কমপক্ষে ১৪ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫৪ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ পাবেন।

আর এত অর্থ ব্যয় করে পাটকলগুলো বন্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারের একমাত্র যুক্তিই হলো এগুলোর লোকসান, এখন যার পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। সরকারি পাটগুলোর দায়িত্বে থাকা বিজেএমসি সর্বশেষ লাভের মুখ দেখেছিল ২০১১ সালে, তাও সেটি ছিল ২৭ বছরের মধ্যে লাভের একমাত্র উদাহরণ।

স্বাধীনতার পর সব পাটকল সরকারি করে সেগুলো পরিচালনার জন্য যখন বিজেএমসি গঠন করা হয়েছিল, তখন পাটই ছিল সরকারের আয়ের প্রধান উৎস।

সরকারি কৃষি তথ্য সার্ভিসের হিসেবে স্বাধীনতার পর দেড় যুগ ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের অবদানই ছিল বেশি। সেই পাট খাত বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের এমন পরিণতির কারণ কী?

জবাবে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য জাহাঙ্গীর আলম, দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর পরিস্থিতি নিয়ে যার গবেষণা আছে। তার বাবাও ছিলেন তিন দশক ধরে খুলনা অঞ্চলের একটি পাটকলের শ্রমিক।

‘যখন পাট খাতে শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয় বছর দেড়েক আগে তখন আমি খুলনা অঞ্চলের পাটগুলো নিয়ে গবেষণা করি। এ পাটকলগুলোর সংকটের কারণ হলো সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও লুটপাট। ধরেন পাট ক্রয় থেকে শুরু করে পাট পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করণ পর্যন্ত ভেতরে ও বাইরে লুটপাট ও দুর্নীতি। অব্যবস্থাপনা ছিল মারাত্মক পর্যায়ে। তার পরে পাটশিল্পের যন্ত্রপাতির আধুনিকায়নের অভাব ছিল। রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ব্যাপকভাবে।’

সরকারি পাটকলগুলোতে বরাবরই বামধারার রাজনীতির অনুসারীরা ইউনিয়নগুলো অর্থাৎ সিবিএতে প্রভাবশালী ছিল। যদিও বামধারার নানা ভাগে বিভক্ত হওয়ার প্রভাব পড়েছে সেখানেও।

আবার সামরিক শাসনামলগুলোতে শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠনগুলোকে দুর্বল করতে এসব সিবিএতে নিজেদের লোক তৈরির চেষ্টা করেছে তখনকার প্রশাসন। ফলে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংঘাত চরম আকার ধারণ করে।

নব্বইয়ের পর কার্যত দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের লোকজন ভেতর ও বাইরে থেকে এসব পাটকলে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

জাহাঙ্গীর আলম বলছেন বিশেষ করে বাইরে থেকে হস্তক্ষেপের কারণে শ্রমিকদের মধ্যে নানা দল উপদল গড়ে ওঠে, যা দুর্বল করে শ্রমশক্তিকে। এর মধ্যেই ক্রমাগত লোকসানে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে ওঠে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো।

তবে পাটকল সংগ্রাম পরিষদের একজন নেত্রী শাহানা শারমীন বলছেন লোকসান থেকে বের হওয়ার জন্য আসলে কোনো চেষ্টাই ছিল না সরকারের দিক থেকে।

‘তিন বছর ধরে পাট কেনা হয়না। পাটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক, যা জুট মিলে দরকার সেগুলো কেনা হয় না। শ্রমিকদের বসিয়ে রেখে পয়সা দিয়ে প্রচার করেছে যে লোকসান হচ্ছে। আমাদের পণ্য আমাদের দেশে বিক্রির যে একটা উদ্যোগ হয়েছিল সেটা কার্যকর করলেও এভাবে পাটকলগুলো বন্ধের দরকার হতো না।’

নির্বাচনী ইশতেহারেও পাট ছিল
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে পাটকে গুরুত্ব দেয় আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে তারা বিজেএমসিকে ৫ হাজার কোটি টাকাও দিয়েছিলো লাভজনক হবে পাটকলগুলো এমন শর্ত দিয়ে। এমনকি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া কয়েকটি কারখানা আবার ফিরিয়ে নিয়ে চালু করেছিল সরকার।

২০১০-১১ অর্থবছরে বিজেএমসি সাড়ে ১৭ কোটি টাকা লাভের পর পাটকল নিয়ে কৃতিত্বও নিতে শুরু করে সরকার। কিন্তু এরপর আবার লোকসানের ঢেউ।

২০০৯ থেকে পরবর্তী ১০ বছর এসব পাটকল নিয়ে গবেষণা করেছেন গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি বলছেন সরকারি পাটগুলোকে কিভাবে কার্যকর বাজার কাঠামোতে আনা যায় সেটি কখনো সরকারের দিক থেকে বিবেচনাই করা হয়নি।

‘কখনই আমরা পাটকলগুলোকে বাজারভিত্তিক কাঠামোতে চলবার উদ্যোগ দেখিনি। যে ধরনের ব্যবস্থাপনা বা যেভাবে লাভের বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার ছিলো সেটি দেখা যায়নি। এ ধরনের কর্পোরেশনে দীর্ঘমেয়াদী পেশাদার নেতৃত্ব দরকার ছিলো। কিন্তু এখানে চেয়ারম্যান বা ডিরেক্টররা কেউ দীর্ঘ সময় কাজ করেননি। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সময়ে কোনো চেয়ারম্যান ১৩ মাসের বেশি ছিলেন না। ডিরেক্টররা ছিলেন আরও কম সময়ে।’

এ ভূখণ্ডে পাটকলগুলো গড়ে উঠতে শুরু করেছিলো পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আদমজী পাটকল। পরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে গড়ে ওঠে অনেকগুলো পাটকল যার বেশিরভাগই ছিল লাভজনক।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রথমে ৬৭টি পাটকলকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। পরে আরও পাটকল সরকারি করে বিজেএমসির আওতায় আনা হয় মোট ৮২টি পাটকলকে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকগুলোর নেতৃত্ব ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে কার্যকর কোনো কর্মপরিকল্পনা কখনো হয়নি যা ক্রমশ পাটকলগুলোকে দুর্বলতর করেছে বলে মনে করেন মোয়াজ্জেম।

তিনি বলছেন এসব পাটকলের দুর্দশার জন্য সঠিক নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা না দিয়ে সবসময় শ্রমিকদের দায়ী করার একটি প্রবণতা ছিল সরকারের দিক থেকেও।

‘এ জন্য আসলে শ্রমিকরা দায়ী নয়। বরং অব্যবস্থাপনার কারণে ও রাজনৈতিক প্রভাবে বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত শ্রমিক নেয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে অধিকাংশ কারখানা উদ্বৃত্ত শ্রমিকের কারখানায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী কারখানাগুলোকে দাঁড় করানো গেলে শ্রমিকরা দক্ষতা বাড়াতে পারত ও কারখানাগুলোও লাভজনক হতো।’

বেসরকারি খাতে পাটকল বন্ধ হলে শ্রমিকরা কোনো সুবিধা পায়?
আবার সরকারি খাতের পাটকলগুলো বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হওয়ার পর শ্রমিক কর্মচারীদের পাওনা ও প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করা হলেও সরকারী থেকে বেসরকারি খাতে যাওয়ার পর যেসব পাটকল বন্ধ হয়েছে সেগুলোর শ্রমিকরা আদৌ কোনো সুবিধা পেয়েছেন- এমন নজির পাওয়া খুব কঠিন।

জাতীয় শ্রমিক জোটের সাবেক সভাপতি ও জাসদের একাংশের সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য শিরিন আখতার বলছেন বেসরকারি খাতের কোনো পাটকল বন্ধ হলে সেখানকার শ্রমিকদের কথা বলারই সুযোগ নেই।

‘বেসরকারি খাতে যাওয়া পাটকলের যে সম্পদ তা দিয়ে কারখানা চালিয়েও শ্রমিকরা ভালো থাকার কথা। কিন্তু অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা দেখেছি সেসব কারখানার শ্রমিকরা সত্যিকার অর্থে তাদের প্রাপ্য পায়না। কিছু ক্ষেত্রে অল্প কিছু বা বেতন দেয়া হলো কিন্তু সেটিও প্রাপ্য পাওনার চেয়ে কম। আর বেসরকারি কলগুলোতে শ্রমিকদের সংগঠিত হবার অধিকারও নেই তাই তাদের পাওনাও হয় খুব কম।’

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ’৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই। পরে জেনারেল এরশাদের আমলে ৩৫টি পাটকলকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয় এবং সরকার পুঁজি প্রত্যাহার করে নেয় আরও ৮টি পাটকল থেকে। ’৯৩ সালে সংস্কার কর্মসূচির আওতায় বন্ধ করা হয় আর ১১টি কারখানা। এর পরে বিএনপি সরকারের সময়ে বন্ধ হয়ে যায় আদমজী।

শেষ পর্যন্ত যে ২৫টি কোনো রকমে চলছিল, সেগুলোও বন্ধ করে দিলো শেখ হাসিনার সরকার।

অন্যদিকে সরকারি পাটকল বন্ধের প্রক্রিয়ার মধ্যেই ’৮৪ সালে শুরু হয়েছিল বেসরকারি পাটকলের যাত্রা। এখন বেসরকারি খাতে পাটকল আছে স্পিনিং মিল সহ দুশোরও বেশি। এর মধ্যে কোনো কোনো কোম্পানি একাই যা আয় করছে তা সব সরকারি পাটকলের মোট আয়ের চেয়ে বেশি।

তবে এর আগে রাষ্টায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে যেসব বেসরকারি মালিককে দেয়া হয়েছিল তাদের অনেকেই সেগুলো কম মূল্যে নিয়ে শুধু যন্ত্রপাতি বিক্রি করেই বেশি টাকা পেয়ে সরে পড়েছেন।

এ অভিযোগ স্বীকার করেই বেসরকারি পাটকল মালিক ও পাট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলছেন সরকারি পাটগুলোর প্রধান কাজ ছিল বেতন ভাতা জোগানো আর বেসরকারিগুলো ব্যবস্থাপনার কারণেই কম খরচে বেশি উৎপাদনের সাফল্য পাচ্ছে।

‘বেসরকারি খাতে যে পাটকলগুলো দেয়া হয়েছে তাদের অনেকে যন্ত্রপাতি বিক্রি করে চলে গেছে, অনেকে চলে গেছে, অনেকে দেউলিয়া এটি ঠিক। আবার বেসরকারি খাতে অনেক লাভজনক অবস্থায় আছে। তার পরও পাট রপ্তানিতে দ্বিতীয়। গার্মেন্ট প্রথম। কিন্তু পার্থক্য হলো গার্মেন্টের অনেক কিছু বিদেশ থেকে আনতে হয়। কিন্তু পাটের জন্য কিছু আনতে হয় না। সব কিছু দেশেই। যে বৈদেশিক মুদ্রা আসে তা দেশেই শতভাগ জমা হয়।’

তবে এসব বিষয় খুব একটা গুরুত্ব যেমন পায়নি, তেমনি ব্যবসায়ীক কৌশলের অনেক কিছুকেই গুরুত্ব দেয়া হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন বাংলাদেশ ছাড়াও অনেক দেশে পাট উৎপাদন বেড়েছে আবার আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের চাহিদা কমছিলো।

ভালো মানের পাট দরকার সেটিও বাংলাদেশে হচ্ছিলোনা উন্নত বীজ ও মানসম্পন্ন উপকরণের অভাবে। সব মিলিয়ে পাটের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে বাংলাদেশের সরকারি খাত খাপ খাওয়াতে পারেনি বলে মনে করেন বায়াত্তর সাল থেকে পাটের সাথে জড়িত কাইয়ুম।

অথচ আশার কথাই বলা হয়েছিল
২০১০ সালে পাটের জীবনরহস্য উদ্ভাবনের পর তার ব্যাপক কৃতিত্ব নিয়ে সরকারী মহল থেকেই পাটের পুনর্জাগরনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিলো। আবার পাটের বহুবিদ ব্যবহার যেমন ভেষজ হিসেবে পাটপাতার ব্যবহার, পাটের চা, পাটের ডেনিম, পাটের নানা কাপড় ছাড়াও পলিথিনের বিকল্প পাটের পলিব্যাগ উদ্ভাবনসহ নানা কিছুকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছিল যাতে করে মনে হচ্ছিলো যে পাটের হারানো সুদিন ফিরে পাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এর মধ্যেই লোকসানে লোকসানে জর্জরিত সরকারি পাটকলগুলোতে প্রায় তিনগুণ মজুরি বাড়ানো হয়েছিল ২০১৫ সালে। কিন্তু সুদিনের মধ্যে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে সরকারি পাট খাত।

অর্থনীতিবিদ সায়মা হক বিদিশা বলছেন সরকারি পাট খাত ঘিরে বড় সংস্কার পরিকল্পনা কখনোই হয়নি। এখানে সংস্কারের কথা বলে শুধু পাটকল বন্ধ করা হয়েছে আর মাঝে মধ্যে স্বপ্ন দেখানো হলেও সংস্কারের জন্য কার্যকর কোনো পন্থা কখনোই অবলম্বন করা হয়নি।

‘২০১৫ সালের দিকে স্বল্প,মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা করা হয়েছিলো কিন্তু তার বাস্তবায়ন দেখিনি। মূলত পাটকলের ব্যবস্থাপনায় যারা ছিলেন তারা সংস্কার বা উন্নতি বা নতুন ইনোভেটিভ কোনো কিছু দিকে তাদের কোনো আগ্রহ দেখিনি। ফলে অনিয়ম দুর্নীতি চলে ও তার দায়ভার শ্রমিকের ঘাড়ে পড়েছে।’

তিনি বলছেন এখন রাষ্ট্রায়ত্ত কলগুলোর ভবিষ্যৎ কি হয় নির্ভর করবে সরকারি বেসরকারি খাতের নামে এগুলোর পরিচালন পদ্ধতি কেমন হয় তার ওপর। তবে দুর্নীতিমুক্ত ও কার্যকর ব্যবসায়িক নীতির ভিত্তিতে হলে সামনে পাট খাতে শক্তিশালী ভিত পাবে বলেই আশা করছেন তিনি।

তবে এবার পাটকল বন্ধের ঘোষণা দিয়ে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী বলেছেন বন্ধ করা পাটকলগুলো বিক্রি না করে এগুলোতে দক্ষ ম্যানেজমেন্ট দেয়া হবে সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিতে এবং এর মাধ্যমে আর বিকশিত হয়ে উঠবে এক সময়ের সোনালি আঁশ-পাট।