করোনা ভাইরাস: মহামারি নিয়ন্ত্রণে সরকারি বার্তা কাজে লাগছে না কেন?

শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২০

ঢাকা : দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়িয়ে গেছে আর মৃত্যুও দুই হাজারের কাছাকাছি। ভাইরাসের সংক্রমণ এখন ব্যাপকভাবে দেশের গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যবার্তা নির্মাণ ও প্রচার প্রচারণায় কার্যকর যোগাযোগ কৌশলের ঘাটতি আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্যবিধি মানা, সামাজিক দূরত্ব, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, সাধারণ ছুটি বা লকডাউনের মতো বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। তবে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের কাছে কতটা সহজ এবং কার্যকরভাবে এ বিষয়ক বার্তাগুলো পৌঁছানো গেছে সেটি নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

আবার সীমিত আকারে খুলে দেয়া বা লাল-হলুদ-সবুজ এলাকা কোথায় এর অর্থই বা কী এসব নিয়ে রয়ে গেছে বিভ্রান্তি। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. কাবেরী গায়েন সার্বিকভাবে এক্ষেত্রে যোগাযোগ কৌশলের ঘাটতি দেখছেন।

“বাংলাদেশ সরকার অনেক কাজ করেছে, অনেকে টাকা পয়সাও বরাদ্দ করেছে অনেক উদ্যোগও নিয়েছেন। কিন্তু একটি জায়গায় আমি মনে করি ফেইল করে গেছে, সেটা হচ্ছে যে সমন্বিত কোনো কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি ছিল না।”

“বাংলাদেশের কিছু কিছু বার্তাও তৈরি করা হয়েছে। আপনি যদি টেলিফোন খোলেন যে বার্তা দিচ্ছে সেটা কিন্তু আস্থার জায়গায় নিয়ে যায় না। বোঝাতে পারে না।”

ভাইরাস থেকে বাচঁতে বার বার হাতধোয়া মাস্ক পরা, দূরত্ব বজায় রাখা এবং ঘরে থাকার মতো বার্তাগুলো তৈরি হয়েছে। মহামারিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বহু গাইডলাইন।

এ নিয়ে যেসব ভিডিও কনটেন্ট, মেসেজ তৈরি হয়েছে সেটা শহুরে মানুষের কাছে পৌঁছালেও গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে কতটা কার্যকর সে প্রশ্ন কাবেরী গায়েনের।

“কনটেক্সট অনুযায়ী কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে না। দেখাতে হবে বল সাবান দিয়ে গ্রামের মানুষ হাতটা ধুচ্ছে। রোদে শুকানো গামছা দিয়ে হাত মুছছে। তাদের স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়ার দরকার নাই কিন্তু। এ ধরনের কোনো মেসেজ আমি দেখিনি।”

“একই চ্যানেল সবার কাছে যাবে না। গ্রামের যে বয়স্ক নারী যে মোবাইল ব্যবহার করেন না। তিনি কিন্তু জানেনও না যে কোন মেসেজটা দেয়া হচ্ছে। তো তার কাছে যাবে কীভাবে।”

“তার কাছে ফোক মোটিভে যেতে পারে। কাজেই এই যে একটা কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি হবার কথা ছিল সেটি না হবার কারণে আমরা সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট করে বার্তা পৌঁছাতে পারিনি।”

রাজধানী ঢাকাতেই সবচে বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। অথচ ঢাকার প্রধান সড়কে বা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের বিলবোর্ডে করোনা স্বাস্থ্যবার্তা খুব একটা চোখে পড়ে না। অনেক দেশেই মহামারির পর্যায় ভিত্তিক নতুন স্লোগান হচ্ছে।

নিয়ম-কানুন বিধি নিষেধ তুলে ধরা হয়েছে মানুষের নজর পড়ে এমন সব জায়গায়। এছাড়া বিভিন্ন দেশ সংক্রমণ ঝুঁকি বোঝার জন্য মডেল বা প্রজেকশন কার্ভ তৈরি করেছে এবং জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছে।

বাংলাদেশেও নীতি-নির্ধারণের প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞরা মডেলিং করেছে কিন্তু জনগণকে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা দিয়ে সেটি প্রকাশ করা হয়নি। করোনা মহামারিতে সবচেয়ে আক্রান্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে চিকিৎসক আদিবা আঞ্জুম বলছেন এ ধরনের পূর্বাভাস জনগণকে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ।

“যে পরিমাণ মানুষ আক্রান্ত হলো এবং মারা গেল এই জিনিসটা আমরা বন্ধ করতে পারিনি এই ফ্ল্যাটেনিং অফ দ্যা কার্ভ ঠিকমতো না বুঝতে পারার কারণে।”

“এটা এত জরুরি যে হোয়াট ইজ দ্য কার্ভ, ফ্ল্যাটেনিং অফ দ্যা কার্ভ মানে কী? কেন সবাইকে মানা করা হচ্ছে সব জায়গায় বেরুনোর জন্য এবং লকডাউনের মানেটা কী? মানুষ যদি নাই যানে যে ঝুঁকি কতটা তাহলে বুঝবে কী করে?”

অন্যদিকে করোনভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্বশীলদের একেকজনকে একেকরকম বক্তব্য-বিবৃতি দিতে দেখা গেছে। স্বাস্থ্য এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি ইস্যু করে আবার সেটি প্রত্যাহার করতে দেখা গেছে।

ড. কাবেরী গায়েন বলেন, “যেকোনো দুর্যোগে ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের একটা ব্যাপার আছে। মহামারি পরিস্থিতিতে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ম্যানুয়াল আছে, সেখানে তিনটা জিনিসের কথা বলেছে।”

“কোন কন্টেক্সে কথা হচ্ছে, কন্টেন্ট আমার কেমন হবে আর কোন টোনে আমি কথা বলবো।”

“যোগাযোগের মানুষ হিসেবে আমি এর সাথে আরো দুটো জিনিস যুক্ত করতে চাই। একটি হচ্ছে কোন চ্যানেলে যাবে আর আমাদের দেশের জন্য চ্যানেলটা খুব গুরুত্বপূর্ণ আর রেলেভেন্সটা কতখানি।”

তিনি বলেন, “এটা যুদ্ধের মতোই একটা ক্রাইসিস মোমেন্ট। এখানে সহানুভূতি তৈরি করা দরকার ছিল সর্বমাত্রিক যোগাযোগের মাধ্যমে, যে রাষ্ট্র তার যা যা আছে তাই নিয়ে তোমার সাথে আছে।”

“এই মেসেজটা সমন্বিতভাবে সারাদেশে পৌঁছায়নি। যে কারণে বিভ্রান্তি অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এ জাতীয় সময়ে কোনো একক মন্ত্রণালয় নয় সবাইকে নিয়ে একটি জাতীয় যোগাযোগ পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়।”

বিশ্লেষকরা বলছেন এ সময়ে সমন্বিত যোগাযোগ কৌশল থাকা দরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনাভাইরাস মহামারিতে সমন্বিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে সম্প্রতি একটি কমিটি গঠন করেছে।

এ কমিটির সভাপতি ডা. হাবিবুর রহমান মনে করেন গণমাধ্যমে যেভাবে স্বাস্থ্য তথ্য প্রচার হচ্ছে তাতে মানুষের জানার কোন ঘাটতি নেই।

“আমরা যে ভাষায় কথা বলছি সেটাতো কঠিন ভাষায় কথা বলছি না। গ্রামের মানুষ বোঝার মতোই কথা বলছি। আমাদের এডিজি ম্যাডাম প্রতিদিন ব্রিফিং দিচ্ছেন। সেখানে সুস্পষ্টভাবে বোঝার মতোই কথা বলছেন।”

“এখন সবাই টিভি দেখে। এখান থেকে তারা শিক্ষা নিচ্ছেন। গ্রামগঞ্জে যদি রুট লেভেলেও যান আমরা আশা করছি সবাই ইনফরমড।”

“এই কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে তাদের যে করণীয় বিষয়গুলো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক পরা, কোয়ারেন্টিনে থাকা, আইসোলেশনে থাকা এ বিষয়গুলো সবাই জানেন। এবং রিস্ক ফ্যাক্টর যাদের আছে তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি এ বিষয়গুলো সবাই জানেন। এখন জানা আর মানা সেটা কিন্তু এককথা নয়।”

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের এই না মানার একটা বড় কারণই হলো কার্যকর যোগাযোগের অভাবে মানুষকে বোঝাতে ব্যর্থ হওয়া।

তবে মি. রহমান বলেন, “আমরা কিন্তু বসে নাই। এ কাজটাকে আরো ত্বরান্বিত করা এবং আরো সুক্ষ্মভাবে করার জন্যই এ কমিটি করা হয়েছে।”