কারাগারে অনুশোচনাহীন নিঃসঙ্গ জীবন ‘লেডি ডন’ পাপিয়ার

বৃহস্পতিবার, জুন ১১, ২০২০

ঢাকা: রাতারাতিই যেন বদলে গেছে অন্ধকার জগতের ‘লেডি ডন’ খ্যাত শামীমা নূর পাপিয়ার জীবন। যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত বহুল আলোচিত এই নেত্রীর কাছে পাঁচতারা হোটেল বিলাসবহুল ঘর এখন দিবাস্বপ্নই বটে। আর বিলাসী জীবন, সে-তো দুঃস্বপ্ন। যার সূর্য ওঠে কারাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে, আবার সন্ধ্যা ঝুলে পড়ে গারদের লোহার দেয়ালে, তার কাছে এসব বিলাসিতা দুঃস্বপ্নই। কারাগারের বন্দি জীবনে অতীত পাপের খেসারত দিচ্ছেন অন্ধকার দুনিয়ার সম্রাজ্ঞী পাপিয়া। এখন তার সময় চলছে কচ্ছপের পিঠে চড়ে। আচরণে কোনও অনুতাপ নেই। নেই অহমিকা। চলাফেরায় ভাবলেশহীন। নির্লিপ্ত দিনযাপন। এমনই তথ্য মিলেছে কারাসূত্রের সঙ্গে তার সম্পর্কে আলাপচারিতায়।

করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‌্যাব) রিমান্ডের মাঝপথে তাকে কাশিমপুর কারাগারের হাজতে পাঠানো হয়। তিনটি মামলায় ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হলেও পাপিয়ার আরও ১০ দিনের রিমান্ডের অপেক্ষা।

কারাগার সূত্রে জানা যায়, নিঃসঙ্গ জীবনে পাপিয়ার মধ্যে কোনও অনুশোচনা নেই। সংবেদনশীল আসামি হওয়ায় বন্দি সেলে পাপিয়ার কারও সঙ্গে সেভাবে মেলামেশারও সুযোগ নেই। তাকে আলাদাই রাখা হয়েছে। কারাগারে আসার পর থেকে পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ তার সঙ্গে দেখাও করতে আসেনি।

এদিকে পাপিয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ এনে আরও একটি মামলা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলাটি করেছে। তবে করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সেটার তদন্ত কাজ স্থগিত হয়ে আছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা। এই নিয়ে তার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা হলো।

নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের (বর্তমানে আজীবন বহিষ্কৃত) সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্বামী মফিজুর রহমান সুমন, দুই সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও কাজী তায়্যিবা নূরসহ দেশত্যাগের সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন। ধরা পড়ার পর তাকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে তিনটি মামলা করে র‌্যাব।

যুবলীগের এই নেত্রী (পরে বহিষ্কৃত) গ্রেফতারের আগে গুলশানের অভিজাত হোটেল ওয়েস্টিনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ভাড়া নিয়ে মাসে বিল গুণতেন কোটি টাকা। সব সময় সঙ্গে থাকত ৭ জন অল্পবয়সী তরুণী। আর তার মঞ্জিলে আনাগোনা ছিল সমাজের নানা পর্যায়ের এলিট মানুষের।

কারাগার সূত্রটি জানিয়েছে, সংবেদনশীল আসামি হওয়ায় পাপিয়াকে রাখা হয়েছে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের বিশেষ একটি সেলে। তার সঙ্গে আর কোনো বন্দি নেই। দিন-রাত একাকী কাটে ছোট্ট ঘরের চার দেয়ালে। মাঝেমধ্যে বই পড়েন। বাকি সময় শুয়ে-বসে আর ঘুমিয়েই কাটান একসময়ের পাঁচতারকা হোটেলের বিলাসী গ্রাহক পাপিয়া। তাছাড়া করোনা ভাইরাসের বিশেষ পরিস্থিতির জন্য আপাতত এই কারাগারের বন্দিদের সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনদের দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে।

এত অপকর্মে লিপ্ত থাকলেও পাপিয়ার মধ্যে তেমন কোনো অনুশোচনার লক্ষণ নেই বলে জানায় কারাসূত্র। তারা বলছে, তার মধ্যে কোনও অনুশোচনা বোধ নেই। তবে মাঝেমধ্যে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করেন। বিলাসবহুল চলাচলে অভ্যস্ত পাপিয়া এই বন্দি পরিবেশ মানিয়ে নিতে শুরুর দিকে কষ্টই করেছেন।

এদিকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আনোয়ার রিপন বলেন, ‘পাপিয়ার শারীরিক পরিস্থিতি ভালো আছে এবং তিনি সুস্থ আছেন। কোনও সমস্যা নেই। আমরা নিয়মিত তার খোঁজ রাখি।’

র‌্যাব জানিয়েছে, তিন মামলায় পাপিয়ার ১৫ দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছিল আদালত। গত ১৬ মার্চ পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে নিয়ে আসে র‌্যাব। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ায় তাকে ৫ দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত ২০ মার্চ কারাগারে পাঠানো হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।