ডায়েট করুন, তবে অন্ধ অনুসরণ নয়

শনিবার, জুন ৬, ২০২০

লকডাউনে বাড়িতে বন্দী সকলেই। বাইরে যাওয়া বন্ধ। এতে হাঁটাচলা কমে গেছে। এছাড়া এ সময়ে জিমে যাওয়াও সম্ভব না। ফলে অনেকেরই ওজন বেড়ে গেছে। বাড়তি ওজন কমাতে ওয়েবসাইট দেখে কিংবা অনলাইনে পড়াশোনা করে নিজের মতো ডায়েট চার্ট তৈরি করে অনুসরন করেন অনেকে। আবার অনেকে যখন যে ডায়েট ট্রেন্ড, তখন সেই ডায়েট ফলো করেন। ফলে হঠাৎ করে কখনও কিটো ডায়েট, এক সপ্তাহ ইন্টারমিটেন্ট… এ রকম ইচ্ছে মতো করায় এসবের বিরুপ প্রভাব পড়ে শরীরে। তাই যা খুশি ডায়েট হঠাৎ শুরু করা উচিত নয়। একইসঙ্গে ডায়েট সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করে নেওয়া ভীষণ জরুরী।

ডায়েট মানেই ওজন কমানো নয়: একেক মানুষ ছোট থেকে একেক রকমের খাদ্যাভ্যাসে বেড়ে ওঠে। কিন্তু আজও বেশিরভাগ মানুষ ওজন কমানোর জন্য ডায়েটিশিয়ানের কাছে গিয়ে চার্ট তৈরি করে মেপে খান। কেউ কেউ আবার নিজের ওজন ধরে রাখার জন্যও ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেন। কিন্তু সবচেয়ে আগে জানা দরকার, শারীরিক ওজনই শেষ কথা নয়। তাই সেটাই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। অনেককে দেখতে স্লিম লাগলেও ওজন মেশিন অন্য কথা বলে। আসলে অনেকেরই শরীরে হাড়ের ওজন, পেশির ওজন কম-বেশি হতে পারে। তাই শারীরিক ওজন বেশি হলেও কোন অসুস্থতা না থাকলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তাই ওজন না কমিয়ে চাইলে ইঞ্চির ভিত্তিতে বা ইঞ্চ লসের মাধ্যমে নিজেকে মেনটেন করা শ্রেয়। বাড়তি ওজন যেমন মাত্র সাত দিনে বাড়েনি, তেমন সাত দিনে ৮-১০ ওজন কমানোও যায় না। কমানো গেলেও সেটি কখনও বৈজ্ঞানিক এবং স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি হতে পারে না। ওজন কমা নির্ভর করে নানা বিষয়ের উপরে, শরীরের গঠন, ফ্যাটের অ্যাকিউমুলেশন, মেটাবলিক রেট, স্ট্রেস লেভেল, রোগের ইতিহাস ইত্যাদি। তাই সকলের যে একই হারে ওজন কমবে, তা ঠিক নয়। কারও সাত দিনে ৫০০ গ্রাম ওজন কমে, কারও আবার এক মাসও লেগে যায়।

বিএমআর এবং বিএমআই: শরীর যখন বিশ্রামে থাকে, তখন শরীরের নানা কাজ চালানোর জন্য যত ক্যালরি লাগে সেটাই শরীরের বিএমআর বা বেসাল মেটাবলিক রেট। বিএমআর হল বডি মাস ইনডেক্স। অর্থাৎ উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের আদর্শ ওজন। তবে এই দুটোই শুধুমাত্র প্যারামিটার নয়। কারণ এক এক জনের ক্যালরি বার্ন হওয়ার হার আলাদা। এই বিষয়গুলো লিঙ্গ ও শারীরিক সুস্থতার উপরেও অনেকাংশে নির্ভর করে। আবার ক্যালরি মাপাও নির্দিষ্ট গাইডলাইন মেনে হয় না। অনেকেরই প্রবণতা থাকে বাজারচলতি অ্যাপের মাধ্যমে সারা দিনের খাবারের ক্যালরি সহজেই মেপে ফেলার। কিন্তু বেশিরভাগ খাবারে অনেক রকম মাইক্রো ও ম্যাক্রো নিউট্রিয়েন্টস থাকে। সব মিলিয়ে যোগ করে বিশেষ ক্যালরি পাওয়া যায়।

ওজন মাপার নিয়মকানুন: বিভিন্ন ওজনের মেশিন বিভিন্ন মাপ দেখাতে পারে। তাই নিয়মিত ওজন মাপার প্রয়োজন হলে যে কোনও একটি মেশিনেই মাপা উচিত। এমনকি ডায়েট ফলো করার সময়ে প্রত্যেক দিন ওজন মাপার দরকার নেই। কারণ রোজ মাপলে হতোদ্যম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই দু’সপ্তাহ পরপর মাপাই যথেষ্ট। ওজন মাপার আদর্শ সময় সকালবেলা। সারাদিনে ওজনের হেরফের হয়। আবার মেয়েদের ক্ষেত্রে পিরিয়ডস চলাকালীনও ওজন বাড়ে-কমে। তাই ডায়েট ফলো করলেও সাইকল চলাকালীন ওজন করার বিশেষ দরকার নেই।

সুস্থ থাকার জন্য: অনেকেরই ধারণা, ওজন কমানোর জন্য সবার আগে ভাত, আলু সব বাদ দিতে হবে। এটি ঠিক নয়। কেননা,কার ডায়েটে কী কমালে উপকার হবে, সেটা নির্ধারণ করতে পারেন ডায়েটিশিয়ান।

অনেকে ইমিউনিটি বুস্টিং শেক, প্রোটিন শেক, সাপ্লিমেন্ট ওজন কমাতে খেয়ে থাকেন। সুস্থ থাকার জন্য বাড়ির খাবারই যথেষ্ট। ওজন ঠিক রাখার অন্যতম সফল চাবিকাঠি হল খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সময়মত খাবার খাওয়া।

ইচ্ছামত ডায়েট করলে, তা থেকে নানা সমস্যা হতে পারে। ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চুল পড়ে যাওয়ার মতো সমস্যার পাশাপাশি ডিহাইড্রেশন, অ্যাসিডিটি, ব্লোটিং, কোষ্ঠকাঠিন্য, অনিয়মিত পিরিয়ডস অস্বাভাবিক নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসের অভাব ঘটে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রতিরোধ ক্ষমতায়। কখনও মাসল স্ট্রেংথ কমজোরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ভুল ডায়েট মেনে চলার ফলে অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়।

তাই ‘স্লো বাট স্টেডি’ পদ্ধতিতে অগ্রসর হওয়া ভালো। যে ডায়েট ধরে রাখা যায়, সেই চার্টেই আস্থা রাখুন। মেনে চলা সম্ভব-এমন ডায়েট ফলো করুন।

কোন ডায়েটিশিয়ানের কাছে যাওয়ার আগে ভাল করে তার অভিজ্ঞতা, কাজের ইতিহাস সম্পর্কেও জেনে নেওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। এই ক্ষেত্রেই বেশি অবহেলা করে মানুষ। সুস্বাস্থ্যের জন্য শরীরের যত্ন নেওয়া খুব কঠিন কাজ নয়। এবং তা নিতে হবে নিয়ম মেনে।