করোনায় উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় সরকারের : মির্জা ফখরুল

বুধবার, জুন ৩, ২০২০

ঢাকা : করোনা মহামারীর ‘ভয়াবহ’ পরিস্থিতির দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার বিকেলে নাগরিক ঐক্যের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে এই মন্তব্য করে তিনি বলেন, আজকে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জোর করে নিয়েছেন তারা জনগণকে কোনো মূল্য দেন না, তাদের কাছে অনেক বেশি মূল্য হচ্ছে ব্যবসার, তাদের কাছে অনেক বেশি মূল্য হচ্ছে তাদের সো-কলড প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর। কোনোটাই বাড়বে না, সবকিছু নিচে নেমে যাচ্ছে এবং ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছে। এই অবস্থায় তারা তৈরি করেছে, এই দায়-দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

সরকারি ছুটি তুলে নেয়ার সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকারের টেকনিক্যাল কমিটি বলছে যে, এই মুহুর্তে সরকারি ছুটি তুলে নেয়াটা একটা বিপদজনক অবস্থা হবে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর যিনি ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. আবদুল্লাহ তিনিও বলেছেন যে, এটা খুব ভাল সিদ্ধান্ত হচ্ছে না, এটা একটা সুইসাইডাল সিদ্ধান্ত। আমরা কার কাছে কী বলব? কোথায় যাবেন আপনারা? এদেশের মানুষ কার কাছে যাবে? এদেশের প্রতিটি মানুষ আজকে আতঙ্কে আছে।

তিনি বলেন, আমি জানি না যে, এখান থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবেন সরকার বা এদেশের মানুষ কিভাবে বেরিয়ে আসবে। সমগ্র বিশ্ব যখন এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ এখন পর্যন্ত কোনো ঔষধ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি এবং হওয়াও ডিফিকাল্ট। এরমধ্যে আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে সকলের সাথে আলোচনা করে, যদি পরামর্শ করে পদক্ষেপ নেয়া হতো তাহলে হয়তো আমরা এই অবস্থার সম্মুখীন নাও হতে পারতাম। দুর্ভাগ্য আমাদের যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জোর করে নিয়েছেন তারা জনগণকে মূল্য দেন না। তাদের কাছে অনেক বেশি মূল্য হচ্ছে ব্যবসার।

‘দেশ রসাতলের দিকে’ যাচ্ছে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমার মনে পড়ছে অনেক আগের কথা। ১৯৭৪ সালে ঠিক একইভাবে সেদিন অবহেলা করা হয়েছিলো সমস্যগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলে কি হয়েছিলো খাদ্য থাকা সত্ত্বেও চরম দুর্ভিক্ষ হয়েছিলো। তৎকালীন অর্থনীতি সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম সমিতির প্রথম অধিবেশনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে সামনে বসিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশ তীব্র গতিতে রসাতলে যাচ্ছে। আজকেও বাংলাদেশ রসাতলের দিকে যাচ্ছে। এখান থেকে টেনে তোলার দায়িত্ব সকলের। সরকার কোনো উদ্যাগ নেবেন না, উদ্যোগ নেয়ার মতো তাদের সেই মানসিকতাও নেই। জনগণকে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, আজকে আমি বলছি, ঐক্য দরকার, জনগণের ঐক্য দরকার। দেশের সকল রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ঐক্য দরকার যারা জনগণের কল্যাণের বিশ্বাস করে। এজন্য আমরা প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা করে এ বিষয়ে অতিদ্রুত উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে বলে আমি মনে করি। আসুন ভীত না হয়ে আমাদেরকে উঠে দাঁড়াতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে জনগনকে সঙ্গে নিয়েই। সেজন্য আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে হবে, সমাল দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। সবাইকে নিয়ে আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে, করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

‘চরম দুর্নীতি স্বাস্থ্যখাতে’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজকে যেসমস্ত জায়গায় চিকিৎসার কথা বলা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে সেখানে চিকিৎসা হচ্ছে না। আমরা বলেছি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে গেছে, ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এটা এখন নামে মাত্র টিকে আছে। প্রথম দিকেই সব কিছু এলোমেলো করে ফেলা হয়েছে। ডাক্তারদের তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যে তাদের যেসমস্ত কিটস, ইকুপমেন্ট দরকার সেই সমস্ত ইকুপমেন্ট সরবারহ করা হয়নি। শুধু সরবারহই করা হয়নি, এগুলো নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি করা হয়েছে, মাত্র কয়েকদিন আগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক বললেন যে, অত্যন্ত শক্তিশালী সিন্ডকেট তৈরি হয়েছে এই ব্যবসা করার জন্য, প্রকৃতপক্ষে তাই হয়েছে। এই চরম দুর্যোগে, চরম দুর্দিনে এটা একটা বড় বাণিজ্য হয়েছে, ব্যবসা হয়েছে, দুর্নীতি হয়েছে। যার ফলে আজকে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ তারা শুধুমাত্র আল্লাহ কি করবেন, আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখবেন- এই বিশ্বাস ছাড়া তাদের কাছে আর কিছু নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের হাসপাতালগুলোর করুণ অবস্থার কথাও তুলেও ধরেন তিনি।

নাগরিক ঐক্যের ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) কার্যালয়ের মিলনায়তনে এই আলোচনা সভা হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সভাপতিত্বে ও সমন্বয়কারী শহীদুল্লাহ কায়সারের পরিচালনায় ইন্টারেনেটের মাধ্যমে জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব, গণফোরামের সাবেক নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও গণসংহতির প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকীও বক্তব্য রাখেন।

এছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আলোচনা সভায় উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য জগলুল হায়দার আফ্রিক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আকবর খান ও মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহমেদ খান।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে আলোচনায় অংশ নিয়ে জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব বলেন, আজকে সমগ্র পৃথিবী ও মানবসভ্যতা আজ হুমকির সম্মুখীন। করোনা মহামারীর হাত থেকে এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠি বা সরকার বাঁচতে পারবে না। সমগ্র বিশ্বকে সম্মিলিতভাবে বাঁচতে পারবে। যেহেতু সবাইকে বাঁচতে হবে, সবাইকেই সম্পৃক্ত করতে হবে। সকল সামাজিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া এই কালে আর বাঁচা যাবে না এই করোনার বিরুদ্ধে। আমি বলব, করোনার এই ভয়াবহ দুর্দিনে আরো বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে বিদ্যমান শাসন কাঠামো পরিবর্তন করে সকলকে নাগরিক ঐক্য পালন করতে হবে-এই প্রত্যাশা করছি।

সভাপতির বক্তব্যে নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এই সরকার আমাদের সরকার নয়, ওরা আমাদের কাজ করবেও না। এরা পুরো ব্যবসায়ীদের সরকার। এখন এই শাসকদের কাছে নিরাপদ নই, এখন যারা ক্ষমতা চালাচ্ছে তাদের কাছে আমরা নিরাপদ নই। পুলিশ যারা এদেরকে ক্ষমতায় থাকার জন্যে দুই বছর আগে জান দিয়ে দিয়েছে, মানুষের ভোট কেড়ে নিয়েছে, পারলে অন্যের জান কেড়ে নেয়। ওই পুলিশের জান সরকার রক্ষা করতে পারেনি। যে ডাক্তার চিকিৎসা করছেন এতো বিপদের মধ্যেও ওদেরকে পিপিই দিতে পারে না। অথচ এই পিপিই এক্সপোর্ট করে বেক্সিমকো যাতে লাভ করতে পারে তার জন্যে কিন্তু গার্মেন্টস খুলে দেয়ার বিশেষ বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সরকার ডাক্তারদের জন্য না, পুলিশদের জন্য না, মালদার যারা টাকা আছেন তাদের জন্যে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বলছেন ১৫ দিন দেখবো, তার পর কঠোর হবে। আপনারা কি হয় দেখবেন। প্রতিদিনই তো সংক্রমণ বাড়ছে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এটাকেই বলে হার্ড ইমুউনিটি। চরে খাও, বাঁচলে বাঁচো, মরলে মরো-এই হচ্ছে সরকারের পলিসি। ওরা মানুষের খাবার দিতে পারবে না, টাকা দিতে পারবে না। দুই কোটি পরিবার দিন আনে দিন খায়। এজন্য তারা (সরকার) সবকিছু খুলে দিয়েছে। এই সরকার মানুষকে মিথ্যাচার করে, প্রবঞ্চনা করে ভাওতা দিয়ে ক্ষমতায় থাকার জন্য বাহানা বার করছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত কিটের সরকারি অনুমোদন না দেয়া এবং সম্প্রতি করোনা আক্রান্ত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবস্থা তুলে ধরে তার কিছু হলে সরকারকে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন মান্না।