পোশাক শ্রমিক মৌসুমির লাশ নিয়ে ধূম্রজাল

মঙ্গলবার, জুন ২, ২০২০

শাহিনুর ইসলাম প্রান্ত, লালমনিরহাট প্রতিনিধি : লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের পোশাক শ্রমিক মৌসুমি আক্তারের রহস্যজনক মৃত্যু ও তার লাশ তিস্তা নদীতে পাওয়া নিয়ে ধূম্রজাল কাটছে না। মৌসুমি আক্তার ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে যে ট্রাকে মৃত্যুর শিকার হয় ওই ট্রাকের চালক আজিজুল ইসলাম ও হেলপার রতনকে রংপুর তাজহাট পুলিশ আটক করলেও মৌসুমির বাবা গোলাম মোস্তফা তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে রাজি হয়নি।

উল্টো মৌসুমির বাবা নিজের জিম্মায় নিয়ে চালক ও হেলপারকে থানা থেকে ছেড়ে নিয়ে আসেন। ফলে কী কারণে ট্রাক চালক ও হেলপারকে থানা থেকে ছেড়ে নিলেন মৌসুমির বাবা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রংপুর মহানগর তাজহাট থানার ওসি শেখ রোকনুজ্জামান বলেন, ২২ মে বিকালে আমরা মৌসুমির লাশ উদ্ধার করি এবং ট্রাকের চালক আজিজুল ইসলাম ও হেলপার রতনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসি। মৌসুমি আক্তারের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে তা জানতে লাশ ময়না তদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করি। ২৩ মে মৌসুমির ময়না তদন্ত শেষে বাবা গোলাম মোস্তফার কাছে লাশ হস্তান্তর করি। এ সময় তাকে আমার ফোন নম্বর দেয়া হয় এবং রাস্তায় যেতে কোনো সমস্যা হলে জানাতে বলি। মৌসুমির বাবা তার মেয়ের মৃত্যু নিয়ে ও লাশ এলাকায় নিয়ে যেতে বাধা পাচ্ছে এমন কোনো অভিযোগ করেনি। মৌসুমির বাবা আটক চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ না করে উল্টো তিনি নিজ জিম্মায় তাদের থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। ফলে আমরা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করি। ময়না তদন্তের রিপোর্ট আসলে মৃত্যুর রহস্য বের হবে।

লাশ পরিবহনকারী গাড়ির চালক নাঈম বলেন, তাজহাট থানা থেকে ডাকলে প্রথম দিন লাশ উদ্ধার করে প্রথমে থানায় পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরের দিন আমি লাশ নিয়ে বুড়িমারী যেতে থাকি। পথিমধ্যে বড়খাতা এলাকায় মৌসুমির বাবা একটি ভ্যান ডেকে সমস্যার কথা বলে লাশ নামিয়ে নেয়। তারপর লাশ নিয়ে সৌমুমির বাবা কোথায় গেল তা আমি জানি না। লাশ দাফনের নাম করে আমি ৫ হাজার টাকা নিয়েছি এমন অভিযোগ সত্য নয়।

তবে মৌসুমি আক্তারের বাবা গোলাম মোস্তফার দাবি, তার মেয়ের লাশ করোনা রোগী সন্দেহে এলাকায় নিয়ে এসে দাফনে বাধা পাওয়ায় রংপুরের এক লাশ পরিবহনকারী গাড়ির চালকের কাছে লাশ হস্তান্তর করে দাফনের জন্য ৫ হাজার টাকা দিয়ে তিনি বুড়িমারীতে চলে আসেন। পরে ওই চালক লাশ কি করেছেন তা তিনি জানেন না।

এদিকে পুলিশ মৌসুমির লাশ ময়না তদন্ত শেষে দাফনের জন্য তার বাবা গোলাম মোস্তফার কাছে হস্তান্তর করলেও সেই লাশ দাফন না করে নদীতে কারা ফেলে দিলো? লাশ যাতে এলাকায় নিয়ে আসা না হয় এজন্য কারা বুড়িমারীতে করোনা গুজব ছড়িয়ে বিক্ষোভ করলো কারা? সুস্থ মৌসুমি আক্তার কীভাবে ট্রাকে মারা গেল? ট্রাক চালক ও হেলপারকে আটকের পরও কী কারণে পুলিশ তাদের ছেড়ে দিলো? ট্রাকের চালক আজিজুল ইসলাম ও হেলপার রতনকে পুলিশ আটক করলেও কী কারণে মৌসুমির বাবা তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে রাজি হয়নি? এসব রহস্যময় প্রশ্নের উওর মিলছে না। পুরো ঘটনা নিয়ে মেয়ের বাবা গোলাম মোস্তফা, মা সাহেরা বেগম, তার দুই বোন শান্তনা ও রুমানা এবং লাশ পরিবাহনকারী গাড়ির চালক ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তবে এ মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্নের উত্তর বের করতে ও প্রকৃত রহস্য খুঁজতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তদন্তে নেমেছেন।

আদিতমারী থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, মৌসুমির লাশ নদীতে পাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সহকারে দেখা হচ্ছে। মৌসুমির বাবা ও গাড়ির চালক ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। আশা করছি, মূলরহস্য বের করতে পারবো।

উল্লেখ্য, মৃত পোশাক শ্রমিক মৌসুমি আক্তার ওই উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রামের গোলাম মোস্তফার মেয়ে ও একই উপজেলার বাউড়া ইউনিয়নের সরকারের হাট এলাকার মিজানুর রহমানের স্ত্রী। ওই গার্মেন্টস কর্মী ঢাকা থেকে বাড়ি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে ফেরার পথে ২২ মে ট্রাকে রহস্য জনক মৃত্যুর শিকার হয়। তার লাশ রংপুর তাজহাট থানা পুলিশ উদ্ধার করে ময়না তদন্ত শেষে ২৩ মে তার বাবার কাছে হস্তান্তর করেন। কিন্তু লাশ দাফন না করে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। ২৪ মে ওই মৌসুমির লাশ লালমনিরহাটের আদিতমারী এলাকায় তিস্তা নদী থেকে উদ্ধার করেন পুলিশ