যেভাবে শতাধিক ইহুদির প্রাণ বাঁচান তিন মুসলিম কূটনীতিক

বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২০

ফিলিস্তিনে দখলদার ইহুদিরা প্রতিনিদিনই মুসলিমদের খুন-জখম করলেও মুসলিদের দ্বারা তাদের প্রাণ বাঁচানোর বহু নজির রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তেমনই এক ঘটনায় শতাধিক ইহুদির প্রাণ বাঁচানোর ঘটনা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

১৯৭৭ সালের ৯ই মার্চ সশস্ত্র একদল কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান মুসলিম ওয়াশিংটনে একটি ইহুদি দাতব্য সংস্থার অফিসে এবং একটি মসজিদসহ তিনটি ভবনে হামলা চালিয়ে বহু লোককে জিম্মি করে।

তাদের মূল টার্গেট ছিল বিনাই ব্রিথ নামে ইহুদি একটি দাতব্য সংস্থার ভবন। তারা সেখানে একশরও বেশি কর্মীকে প্রায় চারদিন ধরে জিম্মি করে রেখেছিল। বিনাই ব্রিথ ভবন যেটি ছিল আমেরিকায় ইহুদি অ্যাকিটভিজমের প্রধান কেন্দ্র।

তিনদিন ধরে কয়েকটি মুসলিম দেশের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যস্থতায় সেই জিম্মি নাটকের অবসান হয়েছিল।

বিনাই ব্রিথ নামে ইহুদিদের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ভবনে সেসময় জিম্মি হয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা পল গ্রিন। বিবিসির সাইমন ওয়াটের কাছে রোমহর্ষক সেই জিম্মি নাটকের স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি।

বিনাই ব্রিথের বয়স ছিল তখন ২৬। ফ্লুর কারণ কয়েকদিন ছুটিতে থাকার পর তিনি যেদিন কাজে যোগ দেন তার পরদিনই ঐ হামলার ঘটনা ঘটে। সবে তিনি সেদিন তার প্রথম মিটিং শেষ করেছেন। হঠাৎ একটি শব্দের দিকে তার কান গেল।

“হঠাৎ ঝম ঝম করে কাঁচ ভাঙার শব্দ পেলাম । তারপর দেখলাম এক ব্যক্তি তরতর করে উপরে উঠে আসছে। পরে শুনেছিলাম তার নাম আব্দুল লতিফ। হাতে দুটো পিস্তল। সে চিৎকার করে আমাকে বললো আমি যেন না নড়ি। সে আমাদের বললো এখনই যদি মেঝেতে না শুয়ে পড়ি, তাহলে আমাদের মরতে হবে।”

ঠিক সেসময় গুলির শব্দ শুনলেন পল গ্রিন। পরপরই আমরা তিনি দ্বিতীয় আরেকজনকে দেখলেন সেমি-অটোমেটিক একটি রাইফেল হাতে।

সুপরিকল্পিত এই হামলার শিকার হয়ে পড়লেন পল গ্রিন এবং তার একশরও বেশি সহকর্মী।

নব্য মুসলিম আফ্রিকান-আমেরিকান একদল লোক ঐ হামলা চালিয়েছিল।

তাদের নেতা ছিলেন হামাস আব্দুল খালিস নামে একজন যিনি একসময় নেশন অব ইসলাম গোষ্ঠীর একজন সদস্য ছিলেন। তার মানসিক ব্যাধিতে ভোগার ধাত ছিল। ওয়াশিংটনে তিনি সেদিন তিনটি পৃথক হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল তার ব্যক্তিগত এবং ধর্মীয় কিছু দাবির ব্যাপারে মনোযোগ আকর্ষণ।

হামলার শুরুর দিকেই এক হামলাকারী পল গ্রিনকে রাইফেলের বাট দিয়ে মুখে আঘাত করে।

“আমার থুতনির হাড় ভেঙ্গে গিয়েছিল। প্রচণ্ড রক্ত পড়ছিল। আমার জামা, প্যান্ট রক্তে ভিজে গিয়েছিল। সেসময় আরেকজন আমার দিকে পিস্তল তাক করে আমাকে অন্য সহকর্মীদের শরীরের ওপর শুয়ে পড়তে বললো।”

হামলা হয়েছিল ওয়াশিংটন ইসলামিক সেন্টারেও
তারপর ঐ অফিসের কর্মীদের ধরে ধরে একজনকে আরেকজনের ওপর শোয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।

“শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল। অনেকের শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। কয়েকজনকে ছুরি মারা হয়েছিল। কয়েকজনকে গুলিও করা হয়েছিল। সবাই ভাবছিল তারা মারা যাবে। তারপরও ভবনের অন্যান্য তলা থেকে লোকজনকে ধরে ধরে এনে আমাদের ওপর ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছিল। আমার শরীরের ওপর যে পড়েছিল তার নাম ছিল মিমি ফেলম্যান। আমি মিমির হাত ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম।”

হামলা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে পল গ্রিন হামাস আব্দুল খালিসকে চিনতে পারলেন, কারণ মিডিয়াতে তিনি তাকে আগে দেখেছেন। কয়েক বছর আগে তার পরিবারের বেশ কজন সদস্যকে নির্যাতন করে হত্যার এক ঘটনার পর তাকে টিভিতে দেখা গিয়েছিল। খালিস ঐ হামলার জন্য তখন নেশন অব ইসলামকে দায়ী করেছিলেন।

“হামাস আব্দুল খালিস এবং তার সঙ্গীরা আমাদের বলছিলেন আমরা ইহুদিরা বিশ্বের সমস্ত সমস্যার মূলে। সে কারণে আমাদের এখন মরতে হবে।”

বিশেষ করে ইহুদি ঐ প্রতিষ্ঠানে যেসব কৃষ্ণাঙ্গ কাজ করছিলেন তাদেরকে সবচেয়ে বেশি গালাগালি করছিলেন হামলা।কারীরা।

“তারা আমার কৃষ্ণাঙ্গ সহকর্মীদের গালিগালাজ করছিল যে কেন তারা শ্বেতাঙ্গ ইহুদিদের জন্য কাজ করছে। আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ কর্মীদের ধরে ধরে পেটাচ্ছিল তারা। একটি ছেলেকে তো ধরে ছুরি দিয়ে কোপালো।”

পুলিশ বেশ দ্রুতই বিনাই ব্রিথ ভবনের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। পুলিশ যাতে ঢুকতে না পারে, সেজন্য খালিস এবং তার সঙ্গীরা রাউন্ডের পর রাউন্ড গুলি ছুঁড়ছিল। সেই সাথে খালিস চিৎকার করে তার দাবিগুলো জানাচ্ছিল।

সে বলতে থাকলো তার পরিবারের হত্যাকারীদের তার হাতে তুলে দিতে হবে যেন সে নিজে তাদের মুন্ডুচ্ছেদ করতে পারে। সে সময় আমেরিকাতে নবী মহম্মদের ওপর একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছিল। খালিসের আরেকটি দাবি ছিল ঐ সিনেমার প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে।

এরপর পুলিশ যত এগুতে থাকলো, হামলাকারীরা জিম্মিদের উঠিয়ে ভবনের আট তলায় জড়ো করলো।

জিম্মি নাটকের সময় ওয়াশিংটন ডিসিতে পুলিশের অপেক্ষা, মার্চ ৯, ১৯৭৭
“তারা প্রথমে মেয়েদেরকে নিয়ে গেল। তারপর তারা পুরুষদের দাঁড়াতে বললো। প্রত্যেকের গলা থেকে টাই খুলে নিয়ে তা দিয়ে হাত পেছনে মোড়া করে বাঁধল।

তারপর সিঁড়ি দিয়ে ছয়তলা হাঁটিয়ে আট তলায় নিয়ে গেল। আমার মুখ দিয়ে তখনও রক্ত পড়ছিল। আমি যখন উঠে দাঁড়ালাম, আমার মনে হচ্ছিল না যে আমি ছয়তলা হেঁটে উঠতে পারবো। তারা আমাদের হুমকি দিল, উঠতে গিয়ে সিঁড়িতে বসে পড়লে গুলি করা হবে। মনের জোরে হেঁটে উঠলাম।”

এই তলায় ৪০ ঘণ্টারও বেশি এই জিম্মিদের থাকতে হয়েছিল। হামলাকারীরা অন্য একটি রুমে তাদের কম্যান্ড সেন্টার তৈরি করলো। খালিস সেখান থেকে টেলিফোনে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে শুরু করে।

১৯৭৭ সালে মুসলিম কট্টরপন্থীদের ব্যাপারে আমেরিকানদের তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিলনা। ফলে ইসলামী কিছু দেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছ থেকে সহায়তা চাইলো হোয়াইট হাউজ।

প্রেসিডেন্ট কার্টারের ব্যক্তিগত অনুরোধে সাড়া দিয়েছিলেন ঐ রাষ্ট্রদূতরা। কারণ মি কার্টারের উপদেষ্টারা ভয় পাচ্ছিলেন হামলাকারীরা জিম্মিদের মেরে ফেলতে হয়তো দ্বিধা করবে না।

মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন ওয়াশিংটনে তৎকালীন ইরানের রাষ্ট্রদূত আদেশ শাহ হাদি।

ইরানের ঐ রাষ্ট্রদূত পরে জানিয়েছিলেন তারা টেলিফোনে হামলাকারীদের সাথে এক যোগে কোরানের কিছু আয়াত পড়তে একমত হয়েছিলেন যেসব আয়াতে বলা হয়েছে – “তুমি যদি আল্লার অস্তিত্বে বিশ্বাস করো, তাহলে তোমাকে এটাও বিশ্বাস করতে হবে বিশ্বের সবারই বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।”

বিনাই ব্রিথ ভবনের নীচতলায় এসে মুখোমুখি কথা বলতে খালিসকে রাজি করালেন রাষ্ট্রদূত হাদি। তারপর তিনি খালিসকে বোঝাতে সক্ষম হলেন একজন প্রকৃত মুসলিমের সাথে ক্ষমা করে দেওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত খালিস জিম্মি মুক্তিতে রাজি হলেন।

যখন শান্তিপূর্ণভাবে এই জিম্মি নাটকের অবসানের জন্য মীমাংসা চলছিল, পাশাপাশি পুলিশও ঐ ভবনে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

পল গ্রিন বলছিলেন উল্টোদিকের ভবনে পুলিশের স্নাইপারদের অবস্থান নিতে দেখে বন্দুকধারীরা ভীত হয়ে পড়ছিল।

“তারা ভয় পাচ্ছিল পুলিশ হয়তো যে কোনো সময় অভিযান শুরু করবে। তারা নতুন নতুন অস্ত্র বের করতে শুরু করলো। আমি শুনলাম একজন আরেকজনকে বলছে তুমি মাথায় গুলি করবে, আমি পায়ে গুলি করবো। আমি দেখলাম হামলাকারীদের দ্বিতীয় প্রধান নেতা লতিফ তার সহযোগীদের হাতে হাতে কাগজে লেখা একটি দোয়া তুলে দিচ্ছেন। মরার আগে যেন তারা সেগুলো পড়তে পারে।”

“আমরাও যতটা পারি ফিসফিস করে এক অপরকে বলছিলাম সবসময় মাথা নিচু করে রাখতে এবং শরীরের ডান দিকটা একটু উঁচু করে রাখতে। কারণ আমরা ভাবছিলাম আমাদের শরীরের ডানে গুলি লাগলে যেন অন্তত হৃদপিণ্ডটা আড়াল রাখা যায়। ঐ ভয়ঙ্কর সময়ের মুখোমুখি হয়েও সেদিন কেন যেন আমার মনে হচ্ছিল আমি হয়তো প্রাণে বেঁচে যাবো।”

ভবনে দুটো লিফট ছিল। একটি লিফটে করে পুলিশের কম্যান্ডোরা ওপরে উঠে এলো, আর ঠিক একই সময়ে অন্য লিফট দিকে হামলাকারীরা নেমে গেল। জিম্মিরা বুঝতে পারছিলেন না যে কী আসলে ঘটছে।

পুলিশ ঢোকার পর আমাদের ১৫ মিনিট মাথা তুলতে দেওয়া হয়নি। পুলিশের প্রধান ভয় ছিল সন্ত্রাসীরা তাদের সাথে কোনো বিস্ফোরক নিয়ে এসেছিল কি না- তা নিয়ে। “তারপর এক সময় তারা পুরুষদের হাতের বাঁধন খুলে দিল। আমাদের মধ্যে একজন রাবাই ছিলেন যিনি সাথে সাথেই একটি প্রার্থনা করলেন। পুলিশ এবং জিম্মি সবাই যেন কেমন চুপচাপ ছিল।”

তারপর শুরু হলো স্বস্তি এবং আনন্দের বন্যা।

ভোর দুটোর দিকে একজনের মৃত্যুর ভেতর দিয়ে জিম্মি ঐ নাটকের অবসান হলো।

“ওয়াশিংটনের প্রতিটি গির্জার ঘণ্টা বেজে উঠেছিল। পুলিশ ব্যারিকেডের পেছনে ঐ রাত দুপুরেও বহু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। ইহুদিদের বাঁচাতে তিনজন মুসলিম রাষ্ট্রদূত চেষ্টা করেছিলেন। ইহুদিদের মুক্তিতে গির্জার ঘণ্টা বাজছিল। ওয়াশিংটনের ইতিহাসে সেটি ছিল এক অসামান্য মুহূর্ত।” হামলার জন্য খালিস এবং সহযোগীদের দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড হয়েছিল। ঐ ঘটনা নিয়ে পল গ্রিন একটি বই লিখেছেন নাম। – ফরগটেন হসটেজেস। বিবিসির সৌজন্যে