করোনা সন্দেহে মৃত: চেয়ারম্যানের হুমকিতে লাশ ফেলে দিল তিস্তায়

সোমবার, মে ২৫, ২০২০

লালমনিরহাট : গ্রামের বাড়িতে মেয়ের লাশ দাফন হবে না এজন্য এক অ্যাম্বুলেন্স চালকের সাথে ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে চুক্তি করেছিলেন মেয়ের মৃতদেহ দাফনের। চুক্তির টাকাও পরিশোধ করেছিলেন হতভাগ্য বাবা। কিন্তু সেই মৃতদেহ ওই অ্যাম্বুলেন্সের চালক দাফন না করে ফেলে দেয় মহিপুর সংলগ্ন তিস্তা নদীতে।

দুইদিন পর সেই মৃতদেহ তিস্তার পানিতে ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেয় স্থানীয়রা। পরে আদিতমারী থানা পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় শনাক্ত হবার পর সেই হতভাগ্য বাবার কাছে পুনরায় লাশ দাফনের দায়িত্ব এসে কাঁধে চাপে। কিন্তু ঘটনা জানতে পেরে এবার পুলিশেই দায়িত্ব তুলে নেয় লাশ দাফনের।

লালমনিরহাটের আদিতমারীতে করোনা সন্দেহে মৃত পোশাক শ্রমিক মৌসুমী আক্তারের (২২) মরদেহ তিস্তা নদী থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। সোমবার(২৫ মে) বিকেলে মরদেহের জানাজা শেষে মৃত্যের নিজ গ্রামে দাফন করা হয়েছে।

মৃত পোশাক শ্রমিক মৌসুমী আক্তার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রামের গোলাম মোস্তফার মেয়ে। তিনি একই উপজেলার বাউড়া ইউনিয়নের সরকারের হাট এলাকার মিজানুর রহমানের স্ত্রী।

পুলিশ ও নিহতের পরিবার জানান, বাউড়া ইউনিয়নের সরকারের হাট এলাকার আবুল কালামের ছেলে মিজানুর রহমানের সাথে ৬ মাস আগে বিয়ে হয় পোশাক শ্রমিক মৌসুমী আক্তারের। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে একাই গাজীপুরে পোশাক কারখানায় কাজ করতেন মৌসুমী। গত বৃহস্পতিবার(২১ মে) অসুস্থতা অনুভব করলে একটি ট্রাকে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি।

পথিমধ্যে রংপুরের তাজহাট এলাকায় পৌছলে ট্রাকচালক তাকে মৃত দেখে মরদেহ ফেলে পালিয়ে যান। অজ্ঞত মরদেহ হিসেবে তাজহাট থানা পুলিশ উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। পরদিন শুক্রবার খবর পেয়ে মৃতের বাবা গোলাম মোস্তফা তাজহাট থানায় গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন। মেয়ের মরদেহ বুঝে নিয়ে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নিশাতকে মোবাইলে বিষয়টি অবগত করে নিজ এলাকায় দাফনের অনুমতি চান। কিন্তু চেয়ারম্যান ওই মরদেহসহ পুরো বাড়ি এবং মরদেহবাহী গাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার হুমকী দেন বলে অভিযোগ মৃতের বাবা গোলাম মোস্তফার।

অবশেষে নিরুপায় হয়ে গরীব বাবা মেয়ের মরদেহ দাফন করতে তাজহাট এলাকার একজন লাশবাহী গাড়ি চালককে ৫ হাজার টাকা প্রদান করেন। তারা মরদেহ দাফনের আশ্বাস দিয়ে বাবাকে বাড়ি পাঠিয়ে মরদেহটি তিস্তা নদীতে ফেলে দেন। দুই দিন পরে স্থানীয়দের খবরে রোববার(২৪ মে) রাতে উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্দ্ধন গ্রামে তিস্তা নদী থেকে সরকারী ব্যাগে মোড়ানো অজ্ঞত মরদেহটি উদ্ধার করে আদিতমারী থানা পুলিশ। সোমবার(২৫ মে) ঈদের নামাজ শেষে আদিতমারী থানা পুলিশ মরদেহটির জানাজা শেষে কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফনের প্রস্তুতি নিতেই পরিচয় সনাক্ত করেন মৃতের বাবা গোলাম মোস্তফা। অবশেষে আদিতমারী থানা পুলিশ পাটগ্রাম থানা পুলিশের সহায়তায় নিজ গ্রামে মৃত মৌসুমীকে দাফন করে।

মৃত মৌসুমীর বাবা গোলাম মোস্তফা বলেন, হাতে পায়ে ধরতে চেয়েও লাশ গ্রামে নিতে দেয়নি আবু সাঈদ নিশাত চেয়ারম্যান। বাধ্য হয়ে একজন চালককে ৫ হাজার টাকা দিয়েছি দাফন করতে। তারাও দাফন না করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। অবশেষে আবারো মেয়ের মরদেহ সনাক্ত করতে হলো আদিতমারী থানায়। পুলিশের পাহারায় মেয়ের মরদেহ দাফন করি। মেয়ের মরদেহ নিয়ে যারা ব্যবসা করেছে তাদের বিচার দাবি করেন তিনি।

বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নিশাতের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

আদিতমারী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি অত্যান্ত দুঃখজনক। সরকারি ব্যাগে মোড়ানো মর্গের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ইউডি মামলা করা হয়েছে। মৃত্যের পরিচয় জানার পরে মেয়ের বাবার আকুতি শুনে পুলিশ সুপারের নির্দেশে দুই থানা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে মরদেহ তার গ্রামে দাফন করা হয়েছে। ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।