শর্টকাট সফলতার পথ দীর্ঘ করে

রবিবার, মে ১৭, ২০২০

জীবনে খুব দ্রুত সাফল্য পেতে কার না মন চায়। কিন্তু সাফল্য যদি সত্যিকারে দ্রুতই পাওয়া যেত তাহলে সংসারের সব মানুষ সফল হতো। জীবনে প্রকৃত সাফল্য পেতে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। শর্টকাট রাস্তা দিয়ে জীবনে দ্রুত সাফল্য পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব।

যেমন ধরুন— আপনি সংসারের জন্য দ্রব্যাদি কিনতে গ্রামের বাজারে যাবেন। আপনার বাড়ি থেকে নির্মিত রাস্তা দিয়ে বাজারে হেটে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। এতে প্রচুর কায়িক পরিশ্রম হয়। তাই আজ আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে আজ শর্ট-কাটে দশ মিনিটে বাজারে যাবেন। পরিশ্রম করা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়।

সবার জন্য নির্মিত রাস্তা দিয়ে আপনি বাজারে যেতে হলে আপনাকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়। যা আপনি অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। তাই শর্টকাটে আপনি মানুষের বাড়ির মধ্য দিয়ে, জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এবং পুকুর পাশ দিয়ে বাজারে যাচ্ছেন।

শর্ট-কাট রাস্তাগুলো সাধারণত মানুষের হেটে যাবার উপযোগী নয়। অধিকাংশ সময় এসব রাস্তাগুলো উঁচু-নিচু হয় এবং রাস্তায় প্রচুর খাদ বা গর্ত থাকে। কিন্তু আপনি আজ শর্টকাটে যেতে বদ্ধপরিকর। শর্টকাট রাস্তা দিয়ে বেশ কিছু দূর গেলেন এবং কিছুক্ষণ পর একটি গর্তে পা পিছলে পড়ে যান। এতে আপনি ভীষণ ব্যথা পান এবং আপনার একটি পা ভেঙ্গে গেল। এখন একটি ভাঙ্গা পা দিয়ে আপনি কিভাবে বাজারে যাবেন?

অথবা আপনার ভাঙ্গা পা দিয়ে এখন আপনি ইচ্ছে করলেও সবার জন্য নির্মিত রাস্তা দিয়ে হেটে যেতে পারবেন না। শুধু শুধু শর্টকাট রাস্তা দিয়ে যেতে আপনার যাত্রার বিলম্বন হচ্ছে। একটু ভেবে দেখুন। আপনি তাড়াতাড়ি বড়লোক বা ধনী হতে চান। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন আপনার সব জায়গা-সম্পত্তি বিক্রি করে শেয়ার বাজারে খাটাবেন অথবা ক্যাসিনোতে গিয়ে জুয়া খেলবেন।

কারণ এতে আপনি দ্রুত বড়লোক হতে পারবেন। শেয়ার বাজার দ্রুত উঠা-নামা করে আর ক্যাসিনোতে জুয়ার ভাগ্য অনিশ্চিত। যাই হোক, সবকিছু জেনেও আপনি শর্টকাট রাস্তাতে তাড়াতাড়ি সফল হতে চান। শেয়ার বাজারে আপনার সব টাকা খাটালেন বা ক্যাসিনোতে জুয়া খেললেন।

আগেই বললাম যে শর্ট-কাটের রাস্তাগুলো অনেক বিপদের হয়। শেয়ার বাজারে ধস নামে। আপনি আপনার সব টাকা হারিয়ে ফেললেন। নিঃস্ব হয়ে এখন আপনাকে রাস্তা নামতে হচ্ছে। কারণ আপনার বসবাস করার বাড়িটিও অন্যের কাছে বন্ধক দিয়ে অর্থ নিয়েছেন। শর্ট-কাট রাস্তা দিয়ে আপনার সফলতার গন্তব্যে যেতে আপনি সর্বস্ব হারালেন।

আপনি যদি দ্রুত সাফল্যের জন্য শর্ট-কাট রাস্তাটি বেছে না নিয়ে কিছু টাকা দিয়ে ছোট-খাট ব্যবসা করতেন, তাহলে আজ আপনাকে রাস্তায় উন্মাদের মত ঘুরতে হত না। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ছোট-খাট একটি ব্যবসা করে একদিন আপনি নিশ্চয় সফলতা পেতেন।

এবার ছাত্র-ছাত্রীদের বলছি। ধরুন, আপনার সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা আসছে এবং আপনি গণিত বিষয়টিতে খুব কাঁচা। গণিত একদম আপনার মাথায় ঢুকে না। আপনার স্বপ্ন একদিন বড় হয়ে ভাল একটি চাকরি করবেন এবং মানুষের মত মানুষ হবেন। কিন্তু আপনার মনে হচ্ছে এই গণিত বিষয়ের জন্য আপনি আপনার সফলতার গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন না।

তাই ভেবেছেন আপনাকে যে কোন মূল্যে গণিত বিষয়টি পাশ করতে হবে। গণিত বিষয়ে পাশ করার জন্য আপনার কাছে দুইটি রাস্তা আছে। এক. সফলতার রাস্তা, সে জন্য আপনাকে বেশি করে গণিত অনুশীলন করতে হবে। শিক্ষকরা ক্লাসে গণিত করার সময় প্রচুর নোট নিতে হবে। শিক্ষকের পিছনে লেগে থাকতে হবে। সম্ভব হলে কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে দিনেরাতে পরিশ্রম করে গণিত বিষয়টি রপ্ত করতে হবে।

দুই. শর্ট-কাট রাস্তা। পরীক্ষার কক্ষে অন্যের সহযোগিতা বা নকল করবেন। শর্টকাটের রাস্তাতে অনেক বেশি ঝুঁকি থাকে। কিন্তু আপনি পরিশ্রম না করে শর্ট-কাট রাস্তা অবলম্বন করবেন বলে ঠিক করেছেন। পরীক্ষার দিন হলের পরিদর্শকের হাতে আপনি নকল করতে গিয়ে ধরা খেলেন। আপনাকে সকল পরীক্ষা হতে সাসপেন্ড করা হল। কি? শর্ট-কাট রাস্তা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে যাত্রা দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে তো? তাই শর্টকাটের রাস্তার চেয়ে পরিশ্রমের রাস্তাই প্রকৃত রাস্তা।

আপনি হয়ত বলবেন, জীবনে মানুষের ঝুঁকি নিতে হয়। তা না হলে জীবনে সফলতা পাওয়া যায় না। হ্যাঁ, তা ঠিকই বলছেন। কিন্তু সেটি যুক্তিসম্মত ঝুঁকি হতে হবে। এমন কোন ঝুঁকি নেয়া উচিত নয়, যেগুলো আত্মহত্যার সামিল হবে। যেমন ধরুন, আপনি এখন বিশ তলা দালানের সবচেয়ে উপরের তলায় বসবাস করছেন। কিছু জরুরী কাজে আপনাকে এখন নিচে যেতে হবে।

প্রতিদিন আপনাকে লিফটের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। আবার লিফট থেকে নেমে আপনাকে বেশ-দূর হাঁটতেও হয়। আপনার কাছে একটি প্যারাসুট আছে। আপনি প্যারাসুট ব্যবহার করতেও জানেন, তাই আজ সিদ্ধান্ত নিলেন আজকে আপনি ঝুঁকি নিবেন, কারণ জীবনে মানুষের ঝুঁকি নিতে হয়, তা না হলে সাফল্য পাওয়া যায় না।

একবার ভেবে দেখুন আপনার এ ঝুঁকি নেয়া কি যুক্তিসম্মত? আপনি প্যারাসুট ব্যবহার করে নিচে নামতে গিয়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। আপনার শরীরের সমস্ত হাঁড় ভেঙ্গে গেছে। আপনি হয়ত আর কোনদিন হাঁটতেও পারবেন না। এবার বুঝলেন তো জীবনে অযথা ঝুঁকি না নেয়াই উত্তম?

আপনি আজ ঘুম থেকে উঠলেন। হঠাৎ আপনার দৃষ্টি ঘরের আয়নাটিতে পড়ল। আয়নায় নিজের চিকন বা রোগা শরীরটি দেখে আপনার মনটা খারাপ হয়ে গেল। জীবনে অনেককে ভালবাসার চেষ্টা করেছেন কিন্তু আজ আপনি বুঝতে পারলেন যে আপনার অনাকর্ষণীয় শরীরের জন্য আপনি হয়ত প্রেমে ব্যর্থ হয়েছেন। এই চিন্তা একেবারেই অবাস্তব নয়।

এতদিন আপনি ভেবে আসছেন প্রেম-ভালবাসা শুধু মনের মিলন। আজ আপনার ভুল ভাঙল, কারণ আপনার সুদর্শন সহকর্মী বা সহপাঠীরা জীবনে ভালবাসার মানুষ পেতে সক্ষম হয়েছে, শুধু আপনি ছাড়া! আর যদি ভালবাসা শুধু মনের মিলনই হত তাহলে বহু ধনী পরিবারের ছেলে-মেয়েরা বস্তিতে গিয়েও ভালবাসার মানুষ খুঁজতো।

কথায় আছে— গরীবের ধন নেই কিন্তু মনটা বেশ ভাল। হ্যাঁ, এটা শুধু শাবানা-আলমগীর বা জসীম-অঞ্জুদের জন্যই সম্ভব, বাস্তব জীবনে এর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাই আজ আপনি ভাবলেন যেকোন মূল্যে আপনি আপনাকে একজন সুদর্শন যুবকে পরিবর্তন করবেন। আপনার সামনে দুইটি পথ খোলা আছে।

এক. সফলতার রাস্তা। আপনাকে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। পুষ্টিকর খাবার সবসময় সুরুচির হয় না। আপনি পোলাও, মাংস, বিরিয়ানি খেতে অভ্যস্ত। ভাত খাওয়া কমিয়ে ফেলতে হবে। এতে আপনার অনেক অসুবিধা হতে পারে। আপনাকে নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, দৌড়তে হবে। কিন্তু আপনি কিছুদূরও হেটে যেতে অভ্যস্ত নন, সবসময় রিকশা নিয়ে চলাফেরা করতে পছন্দ করেন। আপনার জন্য যা দুষ্কর বা অসম্ভব। পুষ্টিবিদের শরণাপন্ন হতে হবে।

দুই. শর্ট-কাট রাস্তা বা অযৌক্তিক ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা। আপনি কালোবাজার থেকে অবৈধভাবে স্টেরয়েড কিনবেন বলে ঠিক করছেন। কারণ আপনি কারো কাছে থেকে শুনেছেন যে স্টেরয়েড কিনে খেলে দিনেদিনে আপনার শরীর সালমান খানের মত হয়ে যাবে। এরপর আপনার ভালবাসার মানুষটিকে খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না।

স্টেরয়েড যেহেতু অবৈধ সেহেতু আপনি সেটা কিনতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা আছে। আপনার জেল বা জরিমানা হতে পারে। কোনক্রমে আপনি স্টেরয়েড কিনতে সমর্থ হলে ভবিষ্যতে আপনার জন্য কিন্তু দূর্ভাগ্যই অপেক্ষা করছে।

স্টেরয়েড ব্যবহার করে অনেক ব্যক্তি হার্টঅ্যাটাক করে মারা গেছে। স্টেরয়েড আপনার শরীরের পেশীগুলোতে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি করে, তাই দ্রুত আপনার পেশীগুলোকে বড় দেখায়। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে সে পানিগুলো সরে যায়, ফলে পানি ভর্তি বেলুনকে ছিদ্র করলে যেমন দেখায় আপনার শরীর ঠিক একদিন তেমন হবে!

পরিশেষে শুধু এটাই বলব, পরিশ্রম করুন। পরিশ্রম করতে শিখুন। শর্টকাট রাস্তাতে চলা বন্ধ করুন। শর্ট-কাট আপনার জীবনে সফলতার চেয়ে ক্ষতি করার সম্ভাবনাই বেশি। পরিশ্রমের রাস্তা কঠিন হলেও সফলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। জীবনে সুখ আনে। নিশ্চিত জীবন-যাপন করা যায়।

লেখক: ড. রাজুব ভৌমিক, পুলিশ অফিসার, নিউইয়র্ক পুলিশ