কৃষিপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

শুক্রবার, মে ১৫, ২০২০

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদের জন্ম ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই, ঢাকায়। তিনি ১৯৮৮ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে এবং ১৯৯০ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসিতে সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর তিনি ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সে উন্নয়ন অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন। তিনি নেদারল্যান্ডসের ওয়েগেনগিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৯৮ সালে তিনি বিআইডিএসে যোগদান করেন। তিনি বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, অ্যাকশন এইডসহ নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। কাজ করেছেন বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক হিসেবে। চলতি বোরো মৌসুমে ধান কাটার সংকট, করোনা পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনাসহ কৃষিসংক্রান্ত বিষয়ে

কৃষিপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদের জন্ম ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই, ঢাকায়। তিনি ১৯৮৮ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে এবং ১৯৯০ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসিতে সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর তিনি ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সে উন্নয়ন অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন। তিনি নেদারল্যান্ডসের ওয়েগেনগিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি বিআইডিএসে যোগদান করেন। তিনি বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, অ্যাকশন এইডসহ নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। কাজ করেছেন বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক হিসেবে। চলতি বোরো মৌসুমে ধান কাটার সংকট, করোনা পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনাসহ কৃষিসংক্রান্ত বিষয়ে সঙ্গে কথা বলেছেন।

প্রাইম নিউজবিডি : গত ৫ এপ্রিল থেকে সরকারের ধান কেনার কথা। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, লকডাউন পরিস্থিতির কারণে এখনো পর্যন্ত ৮০ ভাগ ধান কাটাই বাকি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসারে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

নাজনীন আহমেদ : সরকার এ বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ দেরিতে হলেও নিয়েছে। সেটা হলো ধান কাটার সময় যেসব শ্রমিক এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়, তারা এবার লকডাউনের কারণে যেতে পারছে না। সরকার তাদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করেছে। আমরা যতদূর বুঝতে পেরেছি, সরকার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবহনেরই ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিশেষ করে, সারা দেশের বোরো ধানের যে ২০ ভাগ হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত হয়, সে ধান কাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আমরা এ ফসলের পুরোটা কেটে উঠতে পারব কি না সেটা বলা যাচ্ছে না। দেরি হওয়ার কারণে এ অঞ্চলে শ্রমিকরা যে যাবে এবং ধান কাটবে, তাতেই তো কয়েক দিন লেগে যাবে। সে কারণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বেশ সময়ক্ষেপণ হয়ে গেছে। তবে বোরো ধানের যে হারভেস্ট তা বৈশাখ মাসে অর্ধেক হয় এবং জ্যেষ্ঠ মাসেও চলতে থাকে। কারণ এটাতে বেশি পরিমাণ চাল হয়। প্রায় ১৯ মিলিয়ন টন।

এজন্য সরকারের সংগ্রহের জন্য প্রস্তুতি এখনই রাখা দরকার। আর সরকার তো একবারে এটা কেনে না। ধানও কেনে, আবার চাল কেনে মিলারের কাছ থেকে। সুতরাং এ ধান কিন্তু মিলারের কাছেও যেতে হবে। তাই যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত, সেগুলো হলো : হাওরের ধান কাটার জন্য যে দেরি হয়ে গেছে, সেটা যেন অন্য এলাকাতেও না হয়। উৎপাদনকারী এলাকায় শ্রমিকের যাওয়ার জন্য অনুমতি দেওয়া এবং সেটার ব্যবস্থা করতে হবে। যানবাহনের সুযোগ রাখতে হবে। সেই যানবাহনগুলো যেন স্বাস্থ্যসম্মত হয়, সেটার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সহযোগিতা দরকার। সবচেয়ে ভালো উদ্যোগ হবে, যেসব শ্রমিক বাইরে থেকে আসবেন এবং এলাকা থেকে যেসব শ্রমিক ধান কাটায় নিয়োজিত হবেন তাদের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তাই যেসব এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার আছে, সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। আর বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যেমন স্কুল-কলেজ ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে এই সময়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো ব্যবহার করার প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে। যেহেতু বাজার খোলা থাকবে না, তাই শ্রমিকদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা সেখানেই করতে হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে এটা করা গেলে রোগ ছড়াবে না এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে।

প্রাইম নিউজবিডি : এবারের বোরো মৌসুমে ২ কোটি ৪ লাখ টন ধান উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার ১৯ লাখ টন ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার আর কী কী ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে পারে?

নাজনীন আহমেদ : ধান কাটার পরে তা মিলারের কাছে নিয়ে যায় স্থানীয় ফড়িয়ারা, যাদের আমরা পাইকার বলে থাকি। এজন্য চালকলে ধান নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে। তারা যেন যেনতেনভাবে ধান চালকলে নিয়ে না যায়, যাতে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো যায়, সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। ধান কাটলেই তা মিল পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রস্তুতি রাখতে হবে। ধান সাধারণত হাটে বিক্রি হয়, অনেক সময় মিলমালিকরা ক্ষেত থেকে ধান কিনে নিয়ে যান। অনেক জায়গায় পাইকাররা সংগ্রহ করে থাকেন। একেক জায়গায় একেক রকম। এবার যেহেতু হাটের সম্ভাবনা বা অন্যভাবে নেওয়ার ব্যবস্থা নেই, তাই কীভাবে মিল পর্যন্ত ধান নেওয়া যায় সেটা ঠিক করার জন্য স্থানীয় পাইকার বা ফড়িয়াদের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন বা কৃষি কর্মকর্তাদের সমন্বয় করে ধাপে ধাপে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি শুধু ধান চাষি নয়, সব ধরনের কৃষক এবং খামারিদের জন্যও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে যে, সবজি পচে যাচ্ছে। আবার গরু-ছাগলের খামারিরা তাদের উৎপাদিত দুধ ফেলে দিচ্ছে। এজন্য সবচেয়ে জরুরি হলো পণ্যের সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা, অর্থাৎ কৃষিপণ্যের পরিবহন ব্যবস্থা ঠিক রাখা। যারা এটা বহন করবেন, সেটা যেন স্বাস্থ্যসম্মতভাবে করেন, সে ব্যবস্থাটা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে, কীভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে এগুলো বহন করা যায়। সরকারি পুলের যেসব ট্রাক আছে, বিটিআরসির যেসব ট্রাক আছে সেগুলো ব্যবহার করা যায়। সরকারি দপ্তরগুলো কবে খুলবে সেটা বলা মুশকিল। তাদের তো অনেক লরি, জিপ, মাইক্রোবাসসহ নানা ধরনের পরিবহন বসে আছে। সেগুলোও এসব কৃষিপণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা যায়। তাই আমরা সরকারি পুলের এসব গাড়ি এবং তাদের ড্রাইভারদের বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক বা উপজেলাভিত্তিক পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহার করতে পারি। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এগুলোর যেন কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা।

প্রাইম নিউজবিডি : সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক সব ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের অনুরোধ করেছেন, তারা যেন প্রয়োজনে স্থানীয়ভাবে মাইকিং করে হলেও কৃষকদের ধান কাটা শুরু করার জন্য আহ্বান অব্যাহত রাখেন। কৃষি যন্ত্রপাতি মেরামত করার জন্য ওয়ার্কশপ খোলা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন এবং রোজগার হারানো জেলার রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ঠেলাগাড়িচালকসহ অন্য শ্রমজীবীদের দিয়ে ধান কাটার ব্যবস্থা করেছেন। ধানকাটা শ্রমিকদের জন্য সরকারি ত্রাণের ব্যবস্থা করারও উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

নাজনীন আহমেদ : বিষয়টা অবশ্যই ইতিবাচক, তবে উদ্যোগগুলো আগে গ্রহণ করা উচিত ছিল। এখানে একটি বিষয়ের ঘাটতি রয়েছে। সেটা হলো সবাইকে আমি আহ্বান জানালাম, কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা করলাম না, তাহলে তো হবে না। যেসব শ্রমিক এসব এলাকায় ধান কাটেন, দেখা যায় যে তারা যাদের জমিতে ধান কাটেন, তাদের বাড়িতেই থাকেন এবং তারাই তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এখন এটা করা যাবে না। তাই যারা ধান কাটবেন, তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার জায়গা ও খাদ্যের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। না হলে কিন্তু তাদের মাধ্যমে গ্রামে বা কৃষকের পরিবারে করোনা ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। হাওরাঞ্চলে অবশ্যই ধান কাটার জন্য শ্রমিক নিতে হবে। বিশেষ করে, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে এ অঞ্চলের পাকা ধান নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ধান কাটার জন্য শ্রমিক, বিশেষ করে বাইরের শ্রমিক দরকার। এখন তারা কোথায় খাবে এবং থাকবে সেই ব্যবস্থাটাও গ্রহণ করা দরকার। সে জন্যও মাইকিং দরকার। যেসব শ্রমিক বাইরে থেকে আসছেন, তাদের জন্য থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্তও যারা ধান কাটাবেন তাদেরই করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এসব শ্রমিক গরিব মানুষ। তাদের জন্য সরকার তো ত্রাণ দিচ্ছেই। এখন কৃষি অফিস এবং উপজেলা প্রশাসককে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাইম নিউজবিডি: চলমান করোনা সংকটে হাওরের সাত জেলায় ধান কাটার জন্য জরুরি ভিত্তিতে নতুন ১৮০টি কম্বাইন হার্ভেস্টার ও ১৩৭টি রিপার বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষির যান্ত্রিকীকরণের এই উদ্যোগ হাওরাঞ্চলে কৃষি-শ্রমিক সংকট মোচনে কতটুকু সুফল বয়ে আনবে বলে আপনি মনে করেন?

নাজনীন আহমেদ : আমি বুঝতে পারছি না, কেন এখন এসে তারা এসব উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাহলে কখন এটা ওখানে পৌঁছাবে। হাওরাঞ্চলের ধান আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কাটতে হবে। এর পর তো ধান কাটার পরিস্থিতি থাকবে না। বৃষ্টি শুরু হতে পারে। তখন এ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আমার জানা মতে, হাওরের ধান আরও ১৫ দিন আগে থেকে তৈরি আছে। এখন ১৫ দিনের মধ্যে কাটা শুরু করলে তো মাসখানেক সময় লাগবে। এ সময়ে হাওরাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অনেক দেরি হয়ে গেছে।

কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এ যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে পৌঁছাতে যদি হাওরাঞ্চল তলিয়ে যায়, তাহলে যন্ত্রপাতি দিয়ে কী হবে? তবে খুব দ্রুততার সঙ্গে এগুলো যদি পৌঁছানো যায়, তাহলে এটা ইতিবাচকভাবে কাজ করবে। যেহেতু শ্রমিক সংকট আছে, তাই এ উদ্যোগ ভালো। কিন্তু তা দ্রুততর সময়ে পৌঁছাতে হবে। আর দ্রুততর সময়ে যদি এগুলো না পৌঁছায়, তাহলে এ বরাদ্দ দিয়ে লাভ হবে না।

প্রাইম নিউজবিডি : সরকার করোনা পরিস্থিতিতে কৃষকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার নীতি নিয়েছে। সরকারের এ প্রণোদনাকে কীভাবে দেখছেন?

নাজনীন আহমেদ : প্রথমেই বলে রাখা দরকার, এ কৃষিঋণটা কিন্তু শস্যকৃষির আওতাধীন কৃষকরা পাবে না। সরকার যে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছে তা মূলত কৃষির এন্টারপ্রাইজের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে। শস্য-চাষিরা এর আওতাভুক্ত নন। এটা নির্দেশনায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। ফল-ফুল, মৎস্যচাষ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামারিরা এটা পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় এটা স্পষ্ট করা আছে। ধানচাষিদের কথা বলা নেই। এ

প্রণোদনাটা অবশ্যই ইতিবাচক। যেহেতু পোলট্রি শিল্প, পশুর খামারি এবং ফল-ফুল চাষিরা আমাদের কৃষির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ, তাই এ প্রণোদনা তাদের প্রয়োজন ছিল। আর ধানচাষিরা এখন ঋণ দিয়ে কী করবে? তাদের দরকার লোক। হ্যাঁ, অনেক সময় তারা শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার সময় কারও কাছ থেকে ঋণ নেয়। এজন্য তাদের কিছু টাকার প্রয়োজন রয়েছে। তাই এ প্রণোদনা শস্যকৃষকদের জন্য নয়, মূলত এন্টারপ্রাইজের জন্য। তাদের জন্য এটা উপকারী। তারপরও কথা আছে। আপনি যদি পোলট্রিসহ সব এন্টারপ্রাইজের সাপ্লাই চেইন ঠিক না করেন, তাহলে হবে না। অর্থাৎ আপনি যে দুধটা উৎপাদন করছেন, যে হাঁস-মুরগির ডিম উৎপাদন করছেন তা যদি ভোক্তাদের কাছে অর্থাৎ বাজার ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন ঠিক না থাকে, তাহলে ঋণ দিয়ে কী হবে? তাহলে তো কেউ ঋণ নিয়ে উৎপাদন করতে যাবে না।

যে কেউ তখন ঋণ নেবে যখন সে নিশ্চিত হবে যে, তার উৎপাদিত পণ্যের বাজার ঠিক আছে; সে উৎপাদিত পণ্য বাজারে বেঁচে ঋণ শোধ করতে পারবে। কাজেই এ মুহূর্তে প্রণোদনাটা ইতিবাচক, কিন্তু এটি যথার্থ হয়ে উঠবে যখন কৃষির সাপ্লাই চেইন ঠিক থাকবে। শস্যকৃষকদের জন্য সরকার বীজ, সার এবং সেচে ভর্তুকি দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা আগামীর কৃষির জন্য কাজে লাগবে। তবে প্রশাসন এবারের কথা বিবেচনা করে যদি কৃষিশ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার জন্য কৃষকদের সহযোগিতা করে, তাহলে তা ইতিবাচক হবে। তবে যদি সাপ্লাই চেইন ঠিক না হয়, অর্থাৎ কৃষক যদি ধান না বেচতে পারে, তাহলে মিলাররা ইচ্ছেমতো দাম দিয়ে ফসল কিনবে। ফড়িয়ারা ইচ্ছেমতো দাম দিয়ে কিনে নিতে পারবে।

যখন প্রচুরসংখ্যক মিলার থাকবে, ফড়িয়া থাকবে, তখন কিন্তু ইচ্ছেমতো দাম দিয়ে ধান কেনা যাবে না। তাই সাপ্লাই চেইন ঠিক করা সবচেয়ে বড় কাজ। সরকার শস্যকৃষকদের জন্য যে ভর্তুকির প্রতিজ্ঞা করেছে, এটা তাদের জন্য যথেষ্ট। আর যেসব কৃষক, পোলট্রি ও খামারিদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, সেটা কাজে লাগবে না যদি সাপ্লাই চেইন ঠিক না হয়।

সঙ্গে কথা বলেছেন।

প্রাইম নিউজবিডি : গত ৫ এপ্রিল থেকে সরকারের ধান কেনার কথা। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, লকডাউন পরিস্থিতির কারণে এখনো পর্যন্ত ৮০ ভাগ ধান কাটাই বাকি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসারে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

নাজনীন আহমেদ : সরকার এ বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ দেরিতে হলেও নিয়েছে। সেটা হলো ধান কাটার সময় যেসব শ্রমিক এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়, তারা এবার লকডাউনের কারণে যেতে পারছে না। সরকার তাদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করেছে। আমরা যতদূর বুঝতে পেরেছি, সরকার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবহনেরই ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিশেষ করে, সারা দেশের বোরো ধানের যে ২০ ভাগ হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত হয়, সে ধান কাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আমরা এ ফসলের পুরোটা কেটে উঠতে পারব কি না সেটা বলা যাচ্ছে না। দেরি হওয়ার কারণে এ অঞ্চলে শ্রমিকরা যে যাবে এবং ধান কাটবে, তাতেই তো কয়েক দিন লেগে যাবে। সে কারণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বেশ সময়ক্ষেপণ হয়ে গেছে। তবে বোরো ধানের যে হারভেস্ট তা বৈশাখ মাসে অর্ধেক হয় এবং জ্যেষ্ঠ মাসেও চলতে থাকে। কারণ এটাতে বেশি পরিমাণ চাল হয়। প্রায় ১৯ মিলিয়ন টন।

এজন্য সরকারের সংগ্রহের জন্য প্রস্তুতি এখনই রাখা দরকার। আর সরকার তো একবারে এটা কেনে না। ধানও কেনে, আবার চাল কেনে মিলারের কাছ থেকে। সুতরাং এ ধান কিন্তু মিলারের কাছেও যেতে হবে। তাই যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত, সেগুলো হলো : হাওরের ধান কাটার জন্য যে দেরি হয়ে গেছে, সেটা যেন অন্য এলাকাতেও না হয়। উৎপাদনকারী এলাকায় শ্রমিকের যাওয়ার জন্য অনুমতি দেওয়া এবং সেটার ব্যবস্থা করতে হবে। যানবাহনের সুযোগ রাখতে হবে। সেই যানবাহনগুলো যেন স্বাস্থ্যসম্মত হয়, সেটার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সহযোগিতা দরকার।

সবচেয়ে ভালো উদ্যোগ হবে, যেসব শ্রমিক বাইরে থেকে আসবেন এবং এলাকা থেকে যেসব শ্রমিক ধান কাটায় নিয়োজিত হবেন তাদের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তাই যেসব এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার আছে, সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। আর বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যেমন স্কুল-কলেজ ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে এই সময়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো ব্যবহার করার প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে। যেহেতু বাজার খোলা থাকবে না, তাই শ্রমিকদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা সেখানেই করতে হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে এটা করা গেলে রোগ ছড়াবে না এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে।
প্রাইম নিউজবিডি : এবারের বোরো মৌসুমে ২ কোটি ৪ লাখ টন ধান উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার ১৯ লাখ টন ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার আর কী কী ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে পারে?

নাজনীন আহমেদ : ধান কাটার পরে তা মিলারের কাছে নিয়ে যায় স্থানীয় ফড়িয়ারা, যাদের আমরা পাইকার বলে থাকি। এজন্য চালকলে ধান নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে। তারা যেন যেনতেনভাবে ধান চালকলে নিয়ে না যায়, যাতে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো যায়, সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। ধান কাটলেই তা মিল পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রস্তুতি রাখতে হবে। ধান সাধারণত হাটে বিক্রি হয়, অনেক সময় মিলমালিকরা ক্ষেত থেকে ধান কিনে নিয়ে যান। অনেক জায়গায় পাইকাররা সংগ্রহ করে থাকেন। একেক জায়গায় একেক রকম। এবার যেহেতু হাটের সম্ভাবনা বা অন্যভাবে নেওয়ার ব্যবস্থা নেই, তাই কীভাবে মিল পর্যন্ত ধান নেওয়া যায় সেটা ঠিক করার জন্য স্থানীয় পাইকার বা ফড়িয়াদের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন বা কৃষি কর্মকর্তাদের সমন্বয় করে ধাপে ধাপে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

পাশাপাশি শুধু ধান চাষি নয়, সব ধরনের কৃষক এবং খামারিদের জন্যও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে যে, সবজি পচে যাচ্ছে। আবার গরু-ছাগলের খামারিরা তাদের উৎপাদিত দুধ ফেলে দিচ্ছে। এজন্য সবচেয়ে জরুরি হলো পণ্যের সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা, অর্থাৎ কৃষিপণ্যের পরিবহন ব্যবস্থা ঠিক রাখা। যারা এটা বহন করবেন, সেটা যেন স্বাস্থ্যসম্মতভাবে করেন, সে ব্যবস্থাটা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে, কীভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে এগুলো বহন করা যায়। সরকারি পুলের যেসব ট্রাক আছে, বিটিআরসির যেসব ট্রাক আছে সেগুলো ব্যবহার করা যায়। সরকারি দপ্তরগুলো কবে খুলবে সেটা বলা মুশকিল। তাদের তো অনেক লরি, জিপ, মাইক্রোবাসসহ নানা ধরনের পরিবহন বসে আছে। সেগুলোও এসব কৃষিপণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা যায়। তাই আমরা সরকারি পুলের এসব গাড়ি এবং তাদের ড্রাইভারদের বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক বা উপজেলাভিত্তিক পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহার করতে পারি। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এগুলোর যেন কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা।
প্রাইম নিউজবিডি : সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক সব ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের অনুরোধ করেছেন, তারা যেন প্রয়োজনে স্থানীয়ভাবে মাইকিং করে হলেও কৃষকদের ধান কাটা শুরু করার জন্য আহ্বান অব্যাহত রাখেন। কৃষি যন্ত্রপাতি মেরামত করার জন্য ওয়ার্কশপ খোলা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন এবং রোজগার হারানো জেলার রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ঠেলাগাড়িচালকসহ অন্য শ্রমজীবীদের দিয়ে ধান কাটার ব্যবস্থা করেছেন। ধানকাটা শ্রমিকদের জন্য সরকারি ত্রাণের ব্যবস্থা করারও উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

নাজনীন আহমেদ : বিষয়টা অবশ্যই ইতিবাচক, তবে উদ্যোগগুলো আগে গ্রহণ করা উচিত ছিল। এখানে একটি বিষয়ের ঘাটতি রয়েছে। সেটা হলো সবাইকে আমি আহ্বান জানালাম, কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা করলাম না, তাহলে তো হবে না। যেসব শ্রমিক এসব এলাকায় ধান কাটেন, দেখা যায় যে তারা যাদের জমিতে ধান কাটেন, তাদের বাড়িতেই থাকেন এবং তারাই তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এখন এটা করা যাবে না।

তাই যারা ধান কাটবেন, তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার জায়গা ও খাদ্যের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। না হলে কিন্তু তাদের মাধ্যমে গ্রামে বা কৃষকের পরিবারে করোনা ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। হাওরাঞ্চলে অবশ্যই ধান কাটার জন্য শ্রমিক নিতে হবে। বিশেষ করে, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে এ অঞ্চলের পাকা ধান নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ধান কাটার জন্য শ্রমিক, বিশেষ করে বাইরের শ্রমিক দরকার। এখন তারা কোথায় খাবে এবং থাকবে সেই ব্যবস্থাটাও গ্রহণ করা দরকার। সে জন্যও মাইকিং দরকার। যেসব শ্রমিক বাইরে থেকে আসছেন, তাদের জন্য থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্তও যারা ধান কাটাবেন তাদেরই করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এসব শ্রমিক গরিব মানুষ। তাদের জন্য সরকার তো ত্রাণ দিচ্ছেই। এখন কৃষি অফিস এবং উপজেলা প্রশাসককে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাইম নিউজবিডি: চলমান করোনা সংকটে হাওরের সাত জেলায় ধান কাটার জন্য জরুরি ভিত্তিতে নতুন ১৮০টি কম্বাইন হার্ভেস্টার ও ১৩৭টি রিপার বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষির যান্ত্রিকীকরণের এই উদ্যোগ হাওরাঞ্চলে কৃষি-শ্রমিক সংকট মোচনে কতটুকু সুফল বয়ে আনবে বলে আপনি মনে করেন?

নাজনীন আহমেদ : আমি বুঝতে পারছি না, কেন এখন এসে তারা এসব উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাহলে কখন এটা ওখানে পৌঁছাবে। হাওরাঞ্চলের ধান আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কাটতে হবে। এর পর তো ধান কাটার পরিস্থিতি থাকবে না। বৃষ্টি শুরু হতে পারে। তখন এ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আমার জানা মতে, হাওরের ধান আরও ১৫ দিন আগে থেকে তৈরি আছে। এখন ১৫ দিনের মধ্যে কাটা শুরু করলে তো মাসখানেক সময় লাগবে। এ সময়ে হাওরাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অনেক দেরি হয়ে গেছে।

কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এ যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে পৌঁছাতে যদি হাওরাঞ্চল তলিয়ে যায়, তাহলে যন্ত্রপাতি দিয়ে কী হবে? তবে খুব দ্রুততার সঙ্গে এগুলো যদি পৌঁছানো যায়, তাহলে এটা ইতিবাচকভাবে কাজ করবে। যেহেতু শ্রমিক সংকট আছে, তাই এ উদ্যোগ ভালো। কিন্তু তা দ্রুততর সময়ে পৌঁছাতে হবে। আর দ্রুততর সময়ে যদি এগুলো না পৌঁছায়, তাহলে এ বরাদ্দ দিয়ে লাভ হবে না।

প্রাইম নিউজবিডি : সরকার করোনা পরিস্থিতিতে কৃষকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার নীতি নিয়েছে। সরকারের এ প্রণোদনাকে কীভাবে দেখছেন?

নাজনীন আহমেদ : প্রথমেই বলে রাখা দরকার, এ কৃষিঋণটা কিন্তু শস্যকৃষির আওতাধীন কৃষকরা পাবে না। সরকার যে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছে তা মূলত কৃষির এন্টারপ্রাইজের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে। শস্য-চাষিরা এর আওতাভুক্ত নন। এটা নির্দেশনায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। ফল-ফুল, মৎস্যচাষ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামারিরা এটা পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় এটা স্পষ্ট করা আছে। ধানচাষিদের কথা বলা নেই।

এ প্রণোদনাটা অবশ্যই ইতিবাচক। যেহেতু পোলট্রি শিল্প, পশুর খামারি এবং ফল-ফুল চাষিরা আমাদের কৃষির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ, তাই এ প্রণোদনা তাদের প্রয়োজন ছিল। আর ধানচাষিরা এখন ঋণ দিয়ে কী করবে? তাদের দরকার লোক। হ্যাঁ, অনেক সময় তারা শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার সময় কারও কাছ থেকে ঋণ নেয়। এজন্য তাদের কিছু টাকার প্রয়োজন রয়েছে। তাই এ প্রণোদনা শস্যকৃষকদের জন্য নয়, মূলত এন্টারপ্রাইজের জন্য।

তাদের জন্য এটা উপকারী। তারপরও কথা আছে। আপনি যদি পোলট্রিসহ সব এন্টারপ্রাইজের সাপ্লাই চেইন ঠিক না করেন, তাহলে হবে না। অর্থাৎ আপনি যে দুধটা উৎপাদন করছেন, যে হাঁস-মুরগির ডিম উৎপাদন করছেন তা যদি ভোক্তাদের কাছে অর্থাৎ বাজার ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন ঠিক না থাকে, তাহলে ঋণ দিয়ে কী হবে? তাহলে তো কেউ ঋণ নিয়ে উৎপাদন করতে যাবে না। যে কেউ তখন ঋণ নেবে যখন সে নিশ্চিত হবে যে, তার উৎপাদিত পণ্যের বাজার ঠিক আছে; সে উৎপাদিত পণ্য বাজারে বেঁচে ঋণ শোধ করতে পারবে। কাজেই এ মুহূর্তে প্রণোদনাটা ইতিবাচক, কিন্তু এটি যথার্থ হয়ে উঠবে যখন কৃষির সাপ্লাই চেইন ঠিক থাকবে। শস্যকৃষকদের জন্য সরকার বীজ, সার এবং সেচে ভর্তুকি দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এটা আগামীর কৃষির জন্য কাজে লাগবে। তবে প্রশাসন এবারের কথা বিবেচনা করে যদি কৃষিশ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার জন্য কৃষকদের সহযোগিতা করে, তাহলে তা ইতিবাচক হবে। তবে যদি সাপ্লাই চেইন ঠিক না হয়, অর্থাৎ কৃষক যদি ধান না বেচতে পারে, তাহলে মিলাররা ইচ্ছেমতো দাম দিয়ে ফসল কিনবে। ফড়িয়ারা ইচ্ছেমতো দাম দিয়ে কিনে নিতে পারবে। যখন প্রচুরসংখ্যক মিলার থাকবে, ফড়িয়া থাকবে, তখন কিন্তু ইচ্ছেমতো দাম দিয়ে ধান কেনা যাবে না। তাই সাপ্লাই চেইন ঠিক করা সবচেয়ে বড় কাজ। সরকার শস্যকৃষকদের জন্য যে ভর্তুকির প্রতিজ্ঞা করেছে, এটা তাদের জন্য যথেষ্ট। আর যেসব কৃষক, পোলট্রি ও খামারিদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, সেটা কাজে লাগবে না যদি সাপ্লাই চেইন ঠিক না হয়।