করোনায় দেশের পরিস্থিতি ও বিএনপির অবস্থান

শুক্রবার, মে ১৫, ২০২০

মেহেবুব মাসুম শান্ত

সমসাময়িক সময়ে করোনা নামক ভাইরাসটি একটি বৈশ্বিক মহামারি রূপে পৃথিবীর বুকে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় সকল দেশের মানুষই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। উন্নত দেশগুলিতে করোনার তাণ্ডবে কয়েক লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। বিশ্বের প্রায় সকল উন্নত রাষ্ট্রই করোনা ভাইরাসের প্রকোপে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে, অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেছেন, একমাত্র আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নাই, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপে কন্তের ভাষণও একইরকম।

এমতাবস্থায় আজ দুই মাসেরও অধিক সময় অতিবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশেও করোনার প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলেছে, সেই সাথে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, এপর্যন্ত তিন শতাধিক লোকের মৃত্যু হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছে বিশ হাজারের বেশি লোক। আমাদের বাংলাদেশ একটি ছোট রাষ্ট্র আর জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি এবং দেশের বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। পাশাপাশি করোনা একটি মারাত্মক ধরনের ছোঁয়াচে ভাইরাস যা বাতাসে ভেসে অনেকদূর পর্যন্ত যেতে সক্ষম। একারণে করোনা বিস্তারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা হিসেবে জাতিসংঘ ও WHO বারবার সরকারকে সতর্ক করে আসছে। দেশের এই প্রেক্ষাপটে দল-মত নির্বিশেষে জনগণের পাশে সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র পক্ষ থেকে এই বিষয়ে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানানো হয়েছে বারবার।

অত্যন্ত দুঃখের সাথে দেখছি সরকারের পক্ষ থেকে এব্যাপারে কোন সাড়া তো নেই-ই, বরং তারা সুকৌশলে এই বিষয়টিকে না শোনার ভান ধরেছে। দেশের এই ক্রান্তিকালে এটি সত্যিই অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। শুধু তাই না, প্রতিদিনই আমরা খবরের কাগজ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টিভির মাধ্যমে জানতে পারছি, দেখতে পাচ্ছি সারা দেশজুড়ে অসহায় হতদরিদ্র ক্ষুধার্ত মানুষের ত্রাণ নিয়ে কি এক হরিলুট শুরু হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের সরকারি দলের মেম্বার, চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে কোথাও কোথাও সরকারি কর্মকর্তারাও ত্রাণের চাল, তেল, চিনি আত্মসাৎ করছেন এবং এরকম ঘটনা দেশব্যাপী কয়েক হাজার ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদেরকে সাজা দিলেও স্থানীয় এমপি বা দলীয় নেতাদের সুপারিশে এক বা দুইদিন পর সেই চাল চোরেরা জামিনে বেরিয়ে আসছে। আর যেখানেও বা ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে সেগুলো একান্তই সরকারদলীয় লোক ও তাদের আত্মীয়স্বজন অথবা তাদের

মনোনীত লোকজন। একাধিক জায়গায় সরকারি ত্রাণ জনগণকে না দিয়ে গোডাউনে রাখার কারণে পঁচে গেছে এমন ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে। ক্ষুধার্ত মানুষগুলো দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, কখনো কখনো দলীয় পেটোয়া বাহিনী দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে, কিন্তু দিনশেষে কাঙ্খিত ত্রাণ না পেয়ে কেঁদে কেঁদে ফিরছে। কয়েক জায়গায় খাদ্যের অভাবে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকা শহরের রাস্তায় ইদানিং শুধুই অসহায় দরিদ্র ক্ষুধার্ত মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। দোকানে যেয়ে কিছু কিনে মানিব্যাগ বের করে টাকা দিতে গেলেই ২/৩ জন অভাবি মানুষ এসে ঘিরে ধরে হাত পেতে থাকে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ১৫/২০ জন হতদরিদ্র মানুষ কেউ শুয়ে আছে, কেউ বসে আছে, কেউ ফুটপথের গাছ ধরে দাঁড়িয়ে আছে- শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত, কেউ যদি খাবার নিয়ে আসে এই আশায়, কি এক নির্মম আহাজারী।

এ কোন মহাযজ্ঞের ভেতর পড়েছে স্বদেশ আমার? এর থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই কি? আসলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার প্রয়োজন হয়নি বলেই স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা এই মহামারীর মাঝেও এতো বেপরোয়া, হিংস্র দানব হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এর পাশাপাশি দলীয় উপরওয়ালাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও মদদ তো আছেই।
এখন আসি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র কথায়। আজ ১৩ বছর ধরে এ দলটি ক্ষমতার বাইরে আছে। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ দমন-পীড়ন, নির্যাতন, হামলা-মামলা, গুম-খুন এ দলের নেতাকর্মীর উপর চলেছে।

সারাদেশে আটানব্বই হাজারের অধিক মামলায় বিশ লক্ষাধিক নেতাকর্মী আসামি হয়ে আছে, অনেকেই এখনো ফেরারী জীবন যাপন করছে। শুধু তাই নয়, দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ৭৪ বছর বয়সে প্রচন্ড অসুস্থ অবস্থায় ভুয়া মামলায় দুই বছরের অধিক কারাভোগ করেছেন, যদিও আপাতত তিনি জামিনে আছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেও বিএনপি এবং এর সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত জনগণের পাশে থেকে অসহায় দরিদ্র মানুষের সেবা করে যাচ্ছে। ৭ সপ্তাহে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষকে ত্রাণ সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডাক্তার ও নার্স এবং সাংবাদিকদের মাঝে বিনামূল্যে পিপিই, মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, স্যানিটাইজার বিতরণ করেছে যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

বিএনপি’র প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন একযোগে সারাদেশে করোনার এই মহামারীতে ঢাল হিসেবে জনগণের পাশে থেকে সেবা করে চলেছে। ছাত্রদল থেকে শুরু করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, কৃষক দল, জাসাস, মহিলা দল, ড্যাব সকলেই করোনার এই মহামারীর ভেতরেও একযোগে মাঠে আছে। ছাত্রদল দেশের বিভিন্ন জায়গায় ত্রাণ দিচ্ছে, ক্ষুধার্ত মানুষদের রান্না করা খাবার বিতরণ করছে, বাজার ও জনবহুল স্থানে স্প্রে করছে, কৃষকের ধান কেটে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছে। যুবদলও ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে ত্রাণ বিতরণ করে চলেছে।

পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে করোনাআক্রান্ত রোগী মারা গেলে তাদের জানাজা, মাটি দেওয়া, হিন্দুদের মৃতদেহ সৎকার করাসহ মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রভৃতি নিয়মিত বিতরণ করে চলেছে। একই ভাবে স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল জাসাস, মহিলা দল প্রত্যেকেই সারাদেশব্যাপী জনগণের পাশে থেকে সবধরণের সেবা করে চলেছে। বিএনপি’র ডাক্তারদের সংগঠন ড্যাব প্রতিদিনই কোন না কোন হাসপাতালে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস, গগলস, স্যানিটাইজার, প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রী প্রভৃতি বিতরণ করে চলেছে। ড্যাব ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন মিলে ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে তিন শতাধিক বেসিন স্থাপন করেছে। এক কথায় দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সর্বশক্তি নিয়ে জনগণের পাশে থেকে দেশ ও দশের সেবা করে চলেছে। তাছাড়া প্রতিটি সংসদীয় আসনে যারা যেসকল স্থানে মনোনয়ন প্রার্থী ছিলেন, তারা নিজ নিজ এলাকায় ধারাবাহিকভাবে প্রতিনিয়ত ত্রাণ বিতরণ করে চলেছেন।

আর যে দলটি বর্তমানে সরকারে আছে তাদের কোন অঙ্গ সংগঠনকে জাতির দুর্দিনে আমরা কোথাও দেখতে পেলাম না, যা সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। রাজনীতির অপর নাম যদি মানবসেবাই হয়, তাহলে সেই নীতি ও আদর্শের জায়গা থেকে তারা পুরোপুরি বিচ্যুত। তাদের দায়িত্বশীল লোকদের টেলিভিশনে বুলি আওড়ানো আর ফটোসেশনের জন্য পাকা ধান ক্ষেতে মই দেওয়া ছাড়া আমরা কোথাও দৃশ্যমান কিছু দেখলাম না, দেখলাম না মানুষের মাঝে যেয়ে সহযোগিতার হাত বাড়াতে- যা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। ইতিহাসের পাতায় একদিন বিএনপি’র নাম দিবালোকের সূর্যের মতন জ্বল জ্বল করে জ্বলবে, পক্ষান্তরে আপনাদেরকে অমাবস্যার গহীন আঁধারের মাঝে মাইক দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

মেহেবুব মাসুম শান্ত, সাবেক ছাত্রনেতা