৩০ বছরের স্বেচ্ছাবন্দি জীবনে কি করতেন ‘রহস্যময়ী সুচিত্রা’!

সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২০

বিনোদন ডেস্ক : স্বেচ্ছা নির্বাসন একটা সাধনা। একলা থাকা মানেই একাকীত্বে ভোগা নয়, বরং একলা যাপন অনেক সময়েই আরও বৃহত্তর সাধনার পরিচায়ক হয়। মহানায়িকা সুচিত্রা সেন সেই সাধনাতেই ব্রতী ছিলেন।

তার জন্য সে সময়ে তাকে কম ব্যঙ্গ, কটু কথা, অপমানজনক মন্তব্য শুনতে হয়নি। কেউ বলেছে নিজের বাজার পড়ে যাচ্ছে জেনে নির্বাসন, কেউ বলেছে শ্বেতী হয়ে গেছে, কেউ আবার রটিয়েছে ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে তার, তাই স্বেচ্ছা নির্বাসন। কিন্তু এসব কোনও কিছুই টলাতে পারেনি সুচিত্রার সাধনা।

কথায় বলে, যা নিষিদ্ধ, যার সবটা জানা যায় না, তাই নিয়ে কৌতূহল কখনও কমে না। তাই সুচিত্রার এই অন্তরাল যাপন তো শুধু রহস্য নয়, কিন্তু একটা বড় কৌতূহল থেকে গেছে, বন্দি জীবনে ঠিক কী করতেন সুচিত্রা?

নিজেকে ইহজগতের মোহ থেকে মুক্ত করার দীক্ষামন্ত্র সুচিত্রাকে দিয়েছিলেন ভরত মহারাজ। শোনা যায়, ১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ ছবি ফ্লপ করার পরে সুচিত্রা ছুটে গেছিলেন ভরত মহারাজের কাছে।

ভরত মহারাজ বলে দেন “মা, লোভ কোরো না”। ওই মন্ত্রই যেন সুচিত্রা নিজের শেষ জীবন অবধি চলার পথে পাথেয় করে নেন। সমস্ত লোভ ত্যাগ করার জন্য ঘরে বন্দি করে ফেলেন নিজেকে।

সেই সময়ে দুই নাতনি নয়না (রাইমা) ও হিয়া (রিয়া) সঙ্গে থাকত। মহানায়িকা নিজেকে মুড়ে রাখতেন বোরখায়, কোনও ভাবেই যেন তাকে দেখা না যায়। নিজের মুখ রুমাল দিয়ে ঢেকে রাখতেন সর্বদা।

শোনা যায়, তার পরিবারের লোকজনদের কাছে, ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেও তার অবাধ যাতায়াত ছিল। কারও বান্ধবী সুচিত্রা, কারও সুচিত্রা ফুপু, কারও মা, আম্মা, কারও সুচিত্রা খালা তিনি। তিনি “মেশো কিন্তু মিশে যেওনা”-তে বিশ্বাসী ছিলেন।

তাই যাদের সঙ্গে মিশতেন, সেখানেও একটা সীমারেখা টেনে রাখতেন। তাই জন্যই শেষ জীবন পর্যন্ত থাকতে পেরেছিলেন অন্তরালে।

অথচ না কোনও অবসাদ, না কোনও রোগ, না কোনও বিকার। কেবল অবসর। সুচিত্রা নিজের সেরা সময়টা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। তাই হয়তো সংবাদমাধ্যমগুলোর কৌতূহল কখনও কম পড়েনি তাকে নিয়ে।

শোনা যায়, সুচিত্রা সেন ছিলেন এমনিতেই ‘ভেরি প্রাইভেট পার্সন’। যখন ফিল্মে কাজ করতেন, তখনও তাকে সামনাসামনি কম জনই দেখতে পেতেন, শ্যুটিংয়ের বাইরে। নিজের কাজের বাইরে পার্টিও করতেন না তিনি। এড়িয়ে চলতেন মিডিয়া।

সুচিত্রা সেন যে সারাদিন পূজা করতেন, এটা একটা মিথ। এমনটা মোটেই নয়, এ কথা বলেছেন তার কন্যা মুনমুন সেনই। রমার নিজের শোয়ার ঘরেই পাশেই ছিল তাদের ‘ঠাকুরঘর’। ঠাকুর রামকৃষ্ণ, মা সারদা, বিবেকানন্দর ছবি। গোসল সেরেই পূজায় বসতেন তিনি।

পূজা বলতে ধ্যান, আর ঠাকুরের সিংহাসন ফুল দিয়ে সাজানো। কিন্তু তার মানে এই নয় সারাদিন ঠাকুরঘরে পড়ে থাকতেন। বরং তার সময় কাটত ধর্মপুস্তক পড়ে। রীতিমতো ধর্মীয় সাহিত্য নিয়ে চর্চা করতেন। তার বাড়িতেও আসতেন বেলুড় মঠের মহারাজরাও। চলত আধ্যাত্মিক আলোচনা।

একবার তো দক্ষিণেশ্বরে ভিড়ের মধ্যেই ঘোমটা দিয়ে ভবতারিণী দর্শনে মন্দিরে চলে গিয়েছিলেন। প্রণাম করেন হাঁটু গেড়ে। ততক্ষণে লোক জড়ো হয়ে গেছে। কোনও মতে বেরিয়ে আসেন। রামকৃষ্ণর মন্দিরে গিয়ে একমনে ধ্যান করতেন, তার পরে ভরত মহারাজের সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসতেন।

রিয়া-রাইমা স্কুল থেকে ফিরে সোজা চলে যেত দিদিমা সুচিত্রার কাছে। তখন তো মুনমুন ছবি করছে টলিউড-সহ সাউথেও। রাইমা-রিয়া তাই সুচিত্রাকেই মা বলে ডাকত। মুনমুনকে মাম কি মাম্মি।

নাতনিদের নিয়ে সুচিত্রা বিকেলে যেতেন লাভার্স লেনের ক্লাবে। সঙ্গে থাকতেন কখনও সাংবাদিক বন্ধু। নাতনিদের স্কেচ পেন কিনতে নিয়ে যেতেন থিয়েটার রোড এসি মার্কেটে। লম্বা কালো চুড়িদার বা শাড়ি, কিন্তু মুখ ঢাকা বড় গোগো সানগ্লাস সঙ্গে রুমালে।

মানুষের ছেঁকে ধরা এড়াতেই তার এই পন্থা। বহু উকিল বন্ধু, ডাক্তার বন্ধুর বাড়ি যেতেন যখন তখন তাদের সঙ্গে মুখ না ঢেকেই গল্প করতেন। এভাবেই নিজের জগতে নিজের পছন্দের লোকদের মাঝে আনন্দে করেই জীবন কাটিয়েছেন সুচিত্রা।

মৃত্যুর পরেও যাতে আড়াল বজায় থাকে, তাই তার শেষযাত্রা যাতে সুষ্ঠু ভাবে হতে পারে, সে জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও সুচিত্রা দেখা করেছিলেন বলে মনে করেন অনেকে। তার ইচ্ছে মেনেই, শেষযাত্রাতেও কফিনে মুড়ে বের করা হয় সুচিত্রার দেহ। ইচ্ছানুসারে চুল্লিতে নয়, চন্দনকাঠের দাহতে সুচিত্রার দেহ পোড়া ধোঁয়া মিশে যায় আকাশে।