বাংলাদেশের রাজনীতি ও ফিরে দেখা একজন খোন্দকার দেলোয়ার

সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২০

নিউজরুম ডেস্ক: ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ এমনকি পরবর্তী পর্যায়েও বিভিন্ন পর্বে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন সেই খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের নবম প্রয়াণ দিবস আজ। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ ৭৮ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অসংখ্য নেতাকর্মী ও ভক্ত-সমর্থকদের চোখের জলে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির তৎকালীন এই মহাসচিব। সোমবার (১৬ মার্চ) তার ৯ম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে বর্ষীয়ান এই নেতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে।

খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ছিলেন বিএনপি ষষ্ঠ মহাসচিব। তিনি ২০০৭ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে দেশের রাজনীতিতে এক ক্রান্তিলগ্নে শক্ত হাতে দলের হাল ধরেছিলেন। রুখে দিয়েছিলেন দেশ ও দলের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র। তিনি মানিকগঞ্জ-১ (ঘিওর-দৌলতপুর) আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন পুরোধা এই রাজনীতিক।

১৯৩৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার খিরাম ইউনিয়নের পাচুরিয়া গ্রামে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের জন্ম। পিতা খোন্দকার আবদুল হামিদ ছিলেন একজন আলেম ও মাতার নাম আকতারা খাতুন। ১৯৪৭ সালে মানিকগঞ্জ হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা (এসএসসি) ও এর দুই বছর পর মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ (এইচএসসি) পাস করেন। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে (বিএ) অনার্স ও ১৯৫৩ সালে (এমএ) মাস্টার্স পাস করে ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে মাতৃভাষা রক্ষার দাবিকে সামনে রেখে ১৯৫২ সালেই খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল। কর্মজীবন শুরু হয়েছিল সিলেটের মুরারী চাঁদ কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে। পরে মানিকগঞ্জ মহকুমা আদালতে আইন পেশায় যোগ দেন।

তিনি ১৯৫৭ সালে যোগ দেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে। ১৯৬৫ সালে পার্টির মানিকগঞ্জ মহকুমা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। পরের বছর ছয় দফা আন্দোলন ও এরপর ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ সালে প্রথমবার তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

এর পর এলো বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলন। এলো মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের মাহেন্দ্রক্ষণ। এলো মুক্তিযুদ্ধের ডাক। ১৯৭১ সালে সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে বীরোচিত ভূমিকা রাখেন খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতির ওপর বর্বরোচিত গণহত্যা চালালে তিনি মানিকগঞ্জে বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত হন।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হলো। একটা স্বাধীন মানচিত্র ও পকাতা পেলো বাংলাদেশ। এরপর দেশের রাজনীতিতে এলো ভিন্ন প্রেক্ষাপট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। পাকিস্তানের পরাজিত প্রেতাত্মারা আবারও পর্দার আড়ালে থেকে চোখ রাঙাতে শুরু করলো।

দেশের রাজনীতিতে এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে ১৯৭৮ সালে গঠিত হলো জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন তখন সেই দলে যোগ দেন এবং দলের মানিকগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি তদানীন্তন সরকার সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একটি মাত্র দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সামগ্রিক রাজনৈতিক পট বদলে যায় এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭-এ বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন করেন। ঠিক তখনই ১৯৭৭ সালে গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল)। এসময় খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ওই দলে যোগ দেন এবং দলের মানিকগঞ্জ জেলা শাখার আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে দলটি ছিল ক্ষণস্থায়ী।

১৯৭৮ সালের শেষ দিকে জিয়াউর রহমান একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। দলের নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট জাগদলের বর্ধিত সভায় দলটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে বিএনপির অঙ্গীভূত হয়।

বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭৯ সালে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন দলের মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সাল থেকে তিনি ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির অন্যতম সদস্য।

এরপর নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অনন্য ভূমিকা রাখেন দেলোয়ার হোসেন। তিনি মানিকগঞ্জ-১ (ঘিওর-দৌলতপুর) আসন থেকে দ্বিতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একাধিকবার তিনি চিফ হুইপ ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন ও দুই মেয়াদে পার্লামেন্ট মেম্বার্স ক্লাবের সভাপতি ও বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ২০০৭ সাল থেকে আমৃত্যু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সেক্রেটারি জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সেপ্টেম্বরে গ্রেফতার হন। গ্রেফতার হওয়ার আগমুহূর্তে তিনি দলের মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূইয়াকে বহিষ্কার করে স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব পদে নিয়োগ দেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলেও তিনি পুনরায় দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০০৭ সাল থেকে আমৃত্যু বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন।

এদিকে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রবিবার রাতে বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বাণীতে বলেন, ‘খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ছিলেন দৃঢ়চেতা, আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ। তিনি দেশের মানুষের মনে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত থাকবেন। দৃঢ়তা, অটুট মনোবল, সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন ও প্রখর ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন অনন্য উচ্চতার একজন ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জনগণের মুক্তির প্রতিটি আন্দোলনে অসামান্য অবদান রেখেছেন তিনি। ওয়ান ইলেভেনের সময় দলের মহাসচিবের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দেশ ও দলের বিরুদ্ধে চক্রান্ত রুখে দিতে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন।’