হিন্দুত্বাবাদীদের টার্গেটে মুসলিমরা: কোন পথে ভারত?

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২০

ভারত-পাকিস্তান ডেস্ক: নরেন্দ্র মোদী হিন্দুত্বাবাদী সরকারের চাপিয়ে দেয়া মুসলিমবিদ্বেষী নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনকে (সিএএ) নিয়ে শুরু থেকেই প্রতিবাদে সরব ছিল সাধারণ মানুষ। এখন এই বিতর্ক ইস্যুতে অগ্নিগর্ভ রাজধানী দিল্লি।

উগ্র হিন্দুত্ববাধীদের তাণ্ডবে প্রাণ হারিয়েছে অসংখ মানুষ। ইতোমধ্যেই অন্তত ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলিম, তবে হিন্দুদের সংখ্যা রয়েছে। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন অনেকেই। রাজধানীর অলিতে গলিতে আগুন জ্বলছে। মোদী সরকারের কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমেছেন লাখো মানুষ।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সহিংসতার বেশীরভাগ ঘটনায় মুসলিমদের বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলার খবর পাওয়া গেছে। উত্তর-পূর্ব দিল্লির মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় মুসলমানদের ঘর-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, মসজিদে আগুন দিয়ে মিনারের চূড়ায় হনুমানের পতাকা লাগিয়ে দিয়েছে উগ্র হিন্দুরা।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি ও আল জাজিরার রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাংবাদিকরা দেখতে পেয়েছেন একটি মসজিদ আংশিক পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে ধর্মীয় গ্রন্থের কিছু পৃষ্ঠা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব ছবি, ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে তাতে ওই শহরটির একটি হিম শীতল রূপ ধরা পড়েছে। অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। দলবদ্ধভাবে লাঠি, লোহার রড এবং ইটপাথর হাতে লোকজনকে দেখা গেছে রাস্তায়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শান্তি ফিরিয়ে আনার আবেদন জানানো ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের উপদ্রুত এলাকা সফরের পরেও বুধবার অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গিয়েছে ভজনপুরা, মৌজপুর ও কারাওয়াল নগর এলাকাগুলোতে। মৌজপুর, জাফরাবাদের মতো বেশ কয়েকটি এলাকার পরিস্থিতি এখনও থমথমে।

ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে মুসলিমরা

আনন্দাবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গভীর রাতে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিতে দিতে হাজারখানেক যুবক ঢুকেছিল মুসলিম অধ্যুষিত মৌজপুরের মহম্মদ তাহিরদের গলিতে। তাদের হাতে ছিল বন্দুক, ধারালো অস্ত্রশস্ত্র। গলিতে ঢুকেই তারা মারধর শুরু করল সেখানকার বাসিন্দাদের। ঘরে ঘরে ঢুকে শুরু করল লুঠপাট। তারপর একটা একটা করে বাড়িতে আগুন লাগাতে থাকল। লোকজন যে বাড়িগুলির ভিতরে রয়েছেন, তার পরোয়াই করল না।

গলির মুখ থেকে ৪-৫ বাড়ির পরেই ছিল ৬৫ বছর বয়সী মহম্মদ তাহিরের বাড়ি। এখন গোটা বাড়িটাই ছাই হয়ে গিয়েছে। বাড়ি যখন দাউদাউ করে জ্বলছে দেখে প্রাণে বাঁচতে আর কয়েকজন প্রতিবেশির মতো তাহিরও তার পরিবারের লোকজনকে নিয়ে উঠে যান ছাদে। তারপর এক এক করে সেই ছাদ থেকে পাশের বাড়ির ছাদে ঝাঁপ দেন। সেই বাড়ির ছাদ থেকে তারপরের বাড়ির ছাদে। এই ভাবে ছাদ টপকে টপকে তাহিরার পৌঁছে যান গলির শেষ প্রান্তে।

এই পরিস্থিতি শুধু খাজুরি খাসের নয়। রাজধানীর মৌজপুর বাবরপুর, ভাগীরথী বিহার, সর্বত্রই ছবিটা এক। বন্দুক, লাঠি, ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি ধ্বনি দিতে দিতেই গলির একের পর এক ঘরবাড়িতে ওরা আগুন লাগাচ্ছে। গুলিও চালাচ্ছে এলোপাথাড়ি। গলিতে গলিতে ঢুঁ মেরে দেখা গেল, গত রবিবার থেকে টানা হিংসার ঘটনার পর খাজুরি খাস, মৌজপুর বাবরপুর, ভাগীরথী বিহারের মুসলিম এলাকাগুলি খাঁ খাঁ করছে।

গুজরাটের মডেল দিল্লিতে

গত এক দশকের মধ্যে চলমান ঘটনাবলীকে ভারতে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই সহিংসতা কেবল নতুন নাগরিকত্ব আইন নিয়ে হচ্ছে না। এটি এখন সাম্প্রদায়িক রূপ নিয়েছে এবং আশেপাশের কয়েকটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

জয় শ্রীরাম, হর হর মহাদেব স্লোগানে আকাশ কাঁপিয়ে হামলা চালানো হচ্ছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের মসজিদে। দিল্লির অশোকনগর এলাকায় এক মিনারের মাথায় উঠে হনুমান পতাকা লাগানোর হিন্দুত্ববাদী আস্ফালনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। একটি মাজারে কীভাবে পেট্রল বোমা, আগুন দেয়া হচ্ছে অল্পবয়সীদের দিয়ে তাও সামনে এসেছে।

অগ্নিসংযোগ, গুলি, বাড়িতে ঢুকে হামলা—বাদ নেই কোনো কিছুই। চার দিন ধরে খাস রাজধানীর একটা অংশে এমন হিংসাত্মক ঘটনা চলছে, অথচ পুলিশ তা নিয়ন্ত্রণে কার্যত ব্যর্থ। এখানেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, তবে কি পুলিশের এই ‘অপারগতা’ পরিকল্পিত? ঠিক যেমন অভিযোগ উঠেছিল ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময়। কার্যত ‘নিষ্ক্রিয়’ থেকে বাড়তে দেওয়া হয়নি তো দিল্লির সংঘর্ষ? এমন প্রশ্ন উসকে দিয়েছে বিরোধীরা; কেউ সরাসরি, কেউ ইঙ্গিতে।

সেই মোদী, সেই অমিত শাহ
২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সে সময়ে তার মন্ত্রিসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বিষয়টি কাকতালীয় হলেও অনেকের মনেই দিল্লির বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২০০২ সালের গুজরাটের সেই প্রেক্ষাপট ভেসে উঠছে।

২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে প্রায় তিন মাস ধরে চলে হামলা, অগ্নিসংযোগ, হত্যালীলা। সরকারি হিসাবেই মৃত্যু হয়েছিল এক হাজার ৪৪ জনের, নিখোঁজ ছিল ২২৩ জন। আহত প্রায় আড়াই হাজার। নিহতদের মধ্যে ৭৯০ জন ছিল মুসলমান। হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৫৪ জন।

অভিযোগ উঠেছিল, সেই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেননি, উল্টো প্রচ্ছন্ন মদদ দিয়েছিলেন দাঙ্গায়। পুলিশ-প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাঙ্গা থামাতে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দেননি। এমন অভিযোগও ওঠে, সরকারি কর্মকর্তারাই মুসলিমদের বাড়িঘর, সম্পত্তির তালিকা তুলে দিয়েছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের হাতে।