দুদক কমিশনার ও ঊর্ধ্বতনদের ‘সম্পদের বিবরণ প্রকাশ’ চায় টিআইবি

বুধবার, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২০

ঢাকা: দুর্নীতি দমন কমিশন। সংক্ষেপে দুদক নামেই প্রতিষ্ঠানটি বেশি পরিচিত। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ এবং সুনির্দিষ্ট কিছু অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিচালনার জন্য ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দুদক।

দুদকের বিভিন্ন ধরনের র‍্যালি, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষের মনে জায়গায় করে নিয়েছে। বর্তমানে চারপাশে ঘটতে থাকা দুর্নীতি নিয়ে জনগণ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ জানান এ দুদকের কাছে। এই জানানোর পরিমাণও বেড়েছে অনেক।

২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত মোট ৩ বছরের সংশ্লিষ্ট তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এ সকল তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়ন চূড়ান্ত করা হয়। এসকল তথ্য নিয়ে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ উদ্যোগ: বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর একটি গবেষণা করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

টিআইবির গবেষণায় বলা হয়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৪৭ হাজার ৫৪৯ টি অভিযোগের মধ্যে ৩ হাজার ২০৯ টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয়। একইসময়ে ৪ হাজার ৩০৮টি অনুসন্ধানের মধ্যে ৮৪৮টিতে মামলা করে দুদক।

দুদকের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ‘২০১৬ সালে কমিশনে ১২ হাজার ৯৯০টি অভিযোগ আসে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭ টি অনুসন্ধানের জন্য বিবেচিত হয়। আর ২০১৫ সালে দুদকে আসে ১০ হাজার ৪১৫টি অভিযোগ।’

টিআইবির গবেষণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা:

টিআইবির গবেষণায় ৬টি ক্ষেত্রে মোট ৫০টি নির্দেশকের ওপর তথ্য সংগ্রহ করে। ২০১৬, ২০১৭ ও ১৮ সাল তথা ৩ বছরের তথ্য নিয়ে দুদকের ওপর গবেষণা করেছে সংস্থাটি। আর সেই ৬টি ক্ষেত্র হচ্ছে- স্বাধীনতা ও মর্যাদা, অর্থ ও মানবসম্পদ, জবাবদিহিতা ও শুদ্ধচার, অনুসন্ধান-তদন্ত ও মামলা দায়ের, প্রতিরোধ, শিক্ষা ও আউটরিট কার্যক্রম, সহযোগিতা ও বাহ্যিক সম্পর্ক।

আর এই ৬টি ক্ষেত্রভিত্তিক স্কোরের দিকে রয়েছে স্বাধীনতা ও মর্যাদায় দুদকের স্কোর ৬৭, অর্থ ও মানবসম্পদে ৬১, জবাবদিহিতা ও শুদ্ধচারে ৫০, অনুসন্ধান-তদন্ত ও মামলা দায়েরে ৪৪, প্রতিরোধ, শিক্ষা ও আউটরিট কার্যক্রমে ৭৫, সহযোগিতা ও বাহ্যিক সম্পর্কে ৬৭। সবমিলিয়ে এবার টিআইবির গবেষণায় দুদকের স্কোর ৬০। যা ২০১৫ সালের গবেষণায় ছিল ৬১।

টিআইবি’র গবেষণার ফলাফলে দুদককে নিয়ে ১৬টি সুপারিশ করা হয়েছে:

১ম সুপারিশ: দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ আরও স্বচ্ছ করতে হবে। অর্থপাচার ও ব্যক্তিমালিকানাসহ বেসরকারিখাতের দুর্নীতিকে দুদকের আওতাভুক্ত করতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য দুদকের সুপারিশকে বাধ্যতামূলক করা। পূর্বানুমতি ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের গ্রেফতার না করার বিধান রহিত করা।

২য় সুপারিশ: দুদকের অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী দক্ষ কর্মী নিয়োগ, দুদক কর্মীদের প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ ও দুদকের বাজেট বাড়ানো।

৩য় সুপারিশ: অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং প্রতিরোধ কার্যক্রমে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো।

৪র্থ সুপারিশ: দুদকের কর্মী বিশেষ করা যারা তদন্ত, মামলা পরিচালনা ও প্রতিরোধ কাজে জড়িত এবং দুদকের প্যানেল আইনজীবীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বুনিয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

৫ম সুপারিশ: একই ধরনের দুর্নীতির মামলার ক্ষেত্রে দুদককে একই ধরনের পদক্ষেপ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।

৬ষ্ঠ সুপারিশ: দুদকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সমন্বিত ও বিশেষায়িত আচরণবিধি প্রণয়ন করা।

৭ম সুপারিশ: দুদককে অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানের সংখ্যা বাড়ানো। এক্ষেত্রে অভিযোগ বাছাই কী মাপকাঠিতে হচ্ছে এবং কোন অভিযোগ কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না তার ব্যাখ্যা প্রকাশ করা।

৮ম সুপারিশ: দুদককে মামলার হার বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া। যেমন, সঠিক অনুসন্ধান পরিচালনা, পদ্ধতিগত ভুল না করা ইত্যাদি।

৯ম সুপারিশ: দুদক আইনে উল্লেখিত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষ করা।

১০ম সুপারিশ: দুর্নীতির মামলায় দোষীদের কিভাবে সাজার হার বাড়ানো যায় সে জন্য দুদককে তদন্ত ও মামলার ঝুঁকি চিহ্নিত করা। এমনকি মামলা করার আগে আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করা।

১১তম সুপারিশ: দুদককে দুর্নীতির মামলা থেকে সম্পদ পুনরুদ্ধার, জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করার জন্য উদ্যোগী হয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া।

১২তম সুপারিশ: বার্ষিক প্রতিরোধমূলক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুদককে ৫ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা অনুসরণ করতে হবে।

১৩তম সুপারিশ: দুদককে পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ এবং দক্ষ জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে গবেষণা বিভাগকে শক্তিশালী করা।

১৪তম সুপারিশ: দুদকের ওপর জনগণের আস্থা আরও বেশি বৃদ্ধি করার জন্য দুদকের কার্যক্রম সম্পর্কে আরও প্রচারণার ব্যবস্থা করা। দুদক কমিশনার ও ঊর্ধ্বতনদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করা। শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।

১৫তম সুপারিশ: দুদককে অন্যান্য দেশের দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠানের সাথে সহযোগিতা ও যোগাযোগ বৃদ্ধির করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

১৬তম ও সর্বশেষ সুপারিশ: দুদককে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিশেষ প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে তাদের সহজ অভিগম্যতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেয়া।

গবেষণায় বলা হয়, জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহ নেই দুদকের। নারী ও সংখ্যালঘুসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির কোনও লক্ষ্য, কৌশল নেই।

দুদকের ওয়েবসাইট থাকলেও তা নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না। ওয়েবসাইটে সীমিত সংখ্যক সচেতনতামূলক বার্তা দেয়া হয়। আর সীমিত আকারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এখন পর্যন্ত দুদকের নিজস্ব কোনও গবেষণা নেই। ২০১৮ সালে দুর্নীতির ঝুঁকি, প্রেক্ষাপট ও অবস্থা নিয়ে তিনটি গবেষণার উদ্যোগ নেয়া হলেও কোনটিই সম্পাদনা কিংবা প্রকাশ হয়নি।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জনগণের কাছে সেবাটি দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য ২০১৭ সালে একটি হটলাইন নম্বর চালু করে। হটলাইন নম্বরটি হলো ১০৬। এই হটলাইন নম্বরে ও লিখিতভাবে একের পর এক বেড়েই চলছে দুদকে অভিযোগ। এমনটাই গবেষণায় উল্লেখ করে টিআইবি।

টিআইবি গবেষণা প্রকাশ অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘হটলাইনে প্রচুর অভিযোগ আসে। হটলাইনটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে যে জিনিসটাতে ঘাটতি সেটা হলো হটলাইনে প্রাপ্ত কিংবা অন্য মাধ্যমে আসা অভিযোগগুলো খুব কমই আমলে নেয়া হয়। জবাবদিহিতা না থাকায় দুদককে আমরা প্রত্যাশিত যায়গায় দেখতে পাই না।’

টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে দুদক সচিব কিংবা চেয়ারম্যান কোনও ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা জানান, টিআইবি’র রিপোর্টটি তারা দেখেননি। তাই এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্যও দিতে পারবেন না।