‘পাপিয়ার মোবাইল ফোন অশ্লীল ভিডিওতে ঠাসা’

মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০

ঢাকা : জাল টাকা উদ্ধার, অস্ত্র ও মাদকের পৃথক তিনটি মামলায় ১৫ দিনের রিমান্ডে থাকা নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়ার মোবাইল ফোন ঘেটে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খরা বাহিনী। মোবাইল ফোনে থাকা ভিডিওর সূত্র ধরেই এখন পাপিয়ার পাপের সাম্রাজ্যের সঙ্গে জড়িতদের ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে র‌্যাব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এই এলিট ফোর্সের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পাপিয়ার মোবাইল ফোন অশ্লীল ভিডিওতে ঠাসা। এসব ভিডিওতে উঠতি বয়সী সুন্দরী তরুণীদের সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী ছাড়াও আমলা ও বেশকিছু রাজনৈতিক নেতার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি রয়েছে। এরইমধ্যে কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ নিয়ে চলছে ব্যাপক তোলপাড়।

র‌্যাব সূত্র জানায়, রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলোতে সুন্দরী তরুণী সরবরাহ করতো পাপিয়া। ভিআইপিদের কাছে সুন্দরী তরুণী পাঠিয়ে বড় কাজ বাগিয়ে নিতো। অনেক সময় ভিআইপিদের ফাঁদে ফেলতে সুন্দরী তরুণী পাঠিয়ে তাদের প্রলুব্ধ করে ছবি তুলে রাখতো। সেই ছবি দিয়ে সুবিধা বুঝে ব্ল্যাকমেইল করতো।

জানা গেছে, রাজনীতির আড়ালে মাদক ও নারীদের নিয়ে বাণিজ্য করতো পাপিয়া। মাঝেমধ্যেই রাজধানীর তারকা হোটেলগুলোতে ‘ককটেল পার্টি’র আয়োজন করতেন। যেখানে সমাজের উচ্চস্তরের লোকজনকে খুশি করতো উঠতি বয়সী সুন্দরীরা। মদের নেশায় টালমাটাল আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে কৌশলে তরুণীদের অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে পরে সেগুলো ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিতো মোটা অংকের টাকা।

ওই র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, নানারকম অপকর্ম করে দ্রুতই নরসিংদী ও ঢাকায় একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি. ফ্ল্যাট, প্লটসহ বিপুল পরিমাণ টাকার মালিক বনে যান পাপিয়া। স্ত্রীর এসব কাজে সহযোগিতার পাশাপাশি থাইল্যান্ডে বারের ব্যবসা ছিল পাপিয়ার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমনের। এমনকি নরসিংদী থেকে চাকরি দেয়ার নামে অনেক সুন্দরী তরুণীকে এনে ঢাকায় পার্টি গার্ল হিসেবে ব্যবহার করতেন পাপিয়া।

র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা জানান, ফেসবুকে প্রকাশ্যে যৌন ব্যবসার গ্রুপ ‘এসকর্ট’ থেকেও সুন্দরী তরুণী সংগ্রহ করতেন পাপিয়া। পরে মোটা অংকের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকে শয্যাসঙ্গী হতে বাধ্য করতেন। অশ্লীল ভিডিও তুলে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করতেন পাপিয়া। লজ্জায় কেউ মুখ খুলত না। এসব ভিডিওতে থাকা ৭ জন উঠতি বয়সী তরুণীর সঙ্গে র‌্যাবের কথা হয়েছে। টিপসের বাইরে এসব তরুণীদের প্রত্যেককে মাসে ৩০ হাজার টাকা করে দিতেন। পাপিয়ার এসব অপকর্মের বেশিকিছু ভিডিও এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে।

ছবি কিংবা ভিডিও ধারণ করে কাউকে ব্ল্যাকমেইল করার সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে এসব তরুণীদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান ওই র‌্যাব কর্মকর্তা।

এর আগে দেশত্যাগের সময় গত শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাপিয়াসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব)। গ্রেফতার অপর দুজন হলেন- সাব্বির খন্দকার (২৯) ও শেখ তায়্যিবা (২২)।

গ্রেফতারকালে তাদের কাছ থেকে ৭টি পাসপোর্ট, নগদ ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকার জাল মুদ্রা, ১১ হাজার ৯১ ইউএস ডলারসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা জব্দ করা হয়।

গ্রেফতারের পর ওইদিন রাতেই পাপিয়ার নরসিংদীর বাসায় ও পরদিন রবিবার সকালে হোটেল ওয়েস্টিনে তাদের নামে বুকিং করা বিলাসবহুল প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এর পর রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ২৮ নম্বর ইন্দিরা রোডে রওশন’স ডমিরো রিলিভো নামক বিলাসবহুল ভবনে তাদের দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি পিস্তলের ম্যাগজিন, ২০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ ও নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, ৫টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক, বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা ও এটিএম কার্ড জব্দ করে র‌্যাব সদস্যরা।

গত রবিবার বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমা আকতার ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অপু উকিল স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পাপিয়াকে নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়।

এরইমধ্যে গতকাল সোমবার পৃথক তিন মামলায় ৫ দিন করে পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমনকে ১৫ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত।