করোনা ভাইরাস: ইরানে প্রথম ২ জনের মৃত্যু

বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুইজন বয়স্ক মানুষ মারা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই ভাইরাসে এটি প্রথম মৃত্যুর ঘটনা। বুধবার দেশটির পবিত্র কোম শহরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। খবর আলজাজিরা।

বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা আলিরেজা ভাহাবজাদেহ আল জাজিরাকে বলেছেন, “তেহরানের দক্ষিণে কোম শহরে করোনা ভাইরাসের কারণে দুই প্রবীণ ব্যক্তি মারা গেছেন। করোনা ভাইরাসের কারণে দু’জনেই তীব্র ফুসফুসের সংক্রমণে ভুগছিলেন।

দুই বৃদ্ধ মারা যাওয়ার একদিন আগে অর্থাৎ মঙ্গলবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিয়ানুশু জাহানপুর বলেছিলেন যে প্রাথমিক ফলাফলে দু’জনের শরীরে ভাইরাস ধরা পড়েছে। এর একদিন পরই ইমিউনজনিত ঘাটতি এবং বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন তারা।

তবে নিহতদের সঠিক বয়স এবং পরিচয় সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

মধ্যপ্রাচ্যে এই ভাইরাসে এটাই প্রথম মৃত্যুর ঘটনা। জানুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত মধ্য প্রাচ্যের মধ্যে প্রথম দেশ যেখানে নতুন করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল।

এদিকে করোনা ভাইরাসে গত ২৪ ঘণ্টায় নিহত হয়েছে ১১৪ জন। এতে চীনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ১১৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া চীনের বাইরে হংকংয়ে ও ইরানে ২, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, জাপান ও ফ্রান্সে ১ জন করে মোট ২ হাজার ২২৬ জন নিহত হয়েছে। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, এএফপি, আলজাজিরা।

এ ভাইরাসে চীনে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৫৭৬ জন এবং চীনের বাইরে ১ হাজার ১৪৯ জন। সবমিলিয়ে পুরো বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৫ হাজার ৭২৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ১৬ হাজার ২৩১ জন সুস্থ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন জানায়, চীনে নতুন করে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ৩৯৪ জন এবং মারা গেছে ১১৪ জন। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৭৪ হাজার ৫৭৬ জন এবং মারা গেছে ২ হাজার ১১৮ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ১১ হাজার ২০০ এর বেশি মানুষের অবস্থা আশঙ্কানক। এছাড়া চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে কয়েক লাখ মানুষ।

হুবেই প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুবেইতে নতুন করে ৩৪৯ আক্রান্ত হয়েছে। এ নিয়ে প্রদেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে ৬২ হাজার ৩১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১১৪ জনের মধ্যে ৮৮ জনই হুবেইতে। এ নিয়ে প্রদেশটিতে নিহত হয়েছে ২ হাজার ২৯ জন।

হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান, সেখানাকার একটি সামুদ্রিক খাদ্য ও মাংসের বাজার থেকে এই করোনা ভাইরাসটির উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।ভাইরাসটি যাতে ছড়িয়ে না যায়, সেজন্য চীন হুবেই প্রদেশকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।ওই অঞ্চলের সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে চীনসহ বাইরের বিশ্ব থেকে।

বৃহস্পতিবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৬ হাজার ২৩১ জন সুস্থ হয়েছে এবং তারা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার ছাড়পত্র পেয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ আক্রান্তের খবর আসছে, তাতে আক্রান্তের আসল খবর জানা যাচ্ছে না।কারণ, ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, শুধু তাদের হিসেব পরিসংখ্যানে ধরা হচ্ছে।তাই এর প্রকৃত হিসেব বের করা বা জানা খুবই কঠিন ব্যাপার, যা আরেকটি আশঙ্কার কারণ।

চীনের সবগুলো প্রদেশসহ বিশ্বের ৩০টি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। চীনের বাইরে এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৯ জন শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে জাপানেই ৭০৫ জন।

ভাইরাস সংক্রমণের কারণে চীন ভ্রমণে সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞা জারি এবং কড়াকড়ি আরোপ করেছে অনেক দেশ।ভারত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশ চীন থেকে আগত যাত্রীদের ভিসা বাতিল করেছে।ভাইরাসের কারণে, বিশ্বের অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।চীনে অধিকাংশ বিমান সংস্থার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্সসহ আরও অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।

এছাড়া, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে (কোভিড-১৯) চীনে ৬ স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চীনে ৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। বুধবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এ তথ্য জানিয়েছেন।

চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের সহকারী পরিচালক জেং ইজিন জানান, ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে এরইমধ্যে ৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া ৩ হাজার জন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। যা ভাইরাসটিতে মোট আক্রান্ত রোগীদের ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে হুবেই প্রদেশে রয়েছে ২ হাজার ৫০২।

এদিকে জাপানের ইয়োকোহামা বন্দরে অবরুদ্ধ ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাহাজে ১৪ মার্কিন নাগরিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ এর পরিচালক অ্যান্থনি ফসি।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র তার ৩শ’র মতো নাগরিককে ওই জাহাজ থেকে সরিয়ে নিয়েছে। সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) তাদেরকে টেক্সাসের সান অ্যান্টোনিও সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের আরও ৫শ’ যাত্রীর শরীরে ভাইরাস না পাওয়ায় বুধবার তার জাহাজ থেকে নেমে যাবে।

অন্যদিকে, জাপানের ইয়োকোহামা বন্দরে ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাহাজে নতুন করে ৭৮ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে।এ নিয়ে অবরুদ্ধ (কোয়ারেন্টাইন) জাহাজটিতে এক কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তাসহ আক্রান্ত বেড়ে ৬২০ জন হয়েছে। বুধবার দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাটসুনোবো কাতো জানান, নতুন করে জাহাজের ৮৮ জনের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সকল যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। এছাড়া জাহাজের যাত্রীসহ জাপানে আক্রান্তের সংখ্যা ৭০৫ জন এবং নিহত ১ জন।

তিনি আরও জানিয়েনে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে জাপানের ইয়োকোহামা বন্দরে আটকে আছে জাহাজটি। এখন পর্যন্ত জাহাজের ৬২০ যাত্রীর শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

‘ডায়মন্ড প্রিন্সেস’ নামের ওই বিলাসবহুল যাত্রীবাহী জাহাজে ২ হাজার ৬৬৬ জন যাত্রী ও ১ হাজার ৪৫ জন ক্রু রয়েছে।সকল যাত্রীদের পরীক্ষা করার জন্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জাহাজে রয়েছেন।যাত্রীদের জাহাজে নিজ রুমে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ওই হাজাজে পূর্বে ভ্রমণ করা এক যাত্রীর শরীরে ২৫ জানুয়ারি হংকংয়ে করোনা ভাইরাস হলে, জাপান সরকার জাহাজটিকে অবরুদ্ধ করার এ পদক্ষেপ নেয়।এছাড়াও জাহাজে ভ্রমণকারী ৮ যাত্রীর শরীরে জ্বর ছিল, যা করোনা’র একটি আলামত।

৩ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি জাপানের ইয়োকোহামা উপসাগরে আসে বলে জানান দেশটির সরকারের মুখপাত্র ইয়োশিদে সুগা।

গত ডিসেম্বরে চীনে উদ্ভূত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা।এখন পর্যন্ত চীনের বাইরে বিশ্বের ৩০টি দেশে ১ হাজার ১৪৯ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। শুধু চীনেই আক্রান্তের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৫৭৬ জন।

যেসব দেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে-

চীন- ৭৪ হাজার ৫৭৬ জন, জাপান- ৭০৫ জন, সিঙ্গাপুর- ৮৪ জন, দক্ষিণ কোরিয়া- ৮২ জন, হংকং- ৬৫ জন, থাইল্যান্ড- ৩৫ জন, তাইওয়ান- ২৪ জন, মালয়েশিয়া- ২২ জন, জার্মানি- ১৬ জন, ভিয়েতনাম- ১৬ জন, অস্ট্রেলিয়া- ১৫ জন, যুক্তরাষ্ট্র- ১৫ জন, ফ্রান্স- ১২ জন আক্রান্ত, ম্যাকাও- ১০ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত- ৯ জন, যুক্তরাজ্য- ৯ জন, কানাডা- ৮ জন, ফিলিপাইন- ৩ জন আক্রান্ত, ভারত- ৩ জন, ইটালি- ৩ জন, ইরান- ২, রাশিয়া- ২ জন, স্পেন- ২ জন, বেলজিয়াম- ১ জন, কম্বোডিয়া- ১ জন, মিশর- ১ জন, ফিনল্যান্ড- ১ জন, নেপাল- ১ জন, শ্রীলঙ্কা- ১ জন, সুইডেন- ১ জন।