সরকারি ব্যাংকে প্রথমবারের মতো তুলনামূলক খেলাপি কমেছে

গণছাড়েও থামছে না খেলাপি

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০

ঢাকা: খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপিদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। খেলাপি আইন শিথিল, অবলোপন নীতিমালায় ছাড়, গণছাড়ের আওতায় পুনঃতফসিল, স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থাসহ দেওয়া হয়েছে আরও বিশেষ সুবিধা। এসব ছাড় গ্রহণ করে অর্ধলাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর পরও বছর শেষে খেলাপির পরিমাণ বাড়লই। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। ব্যাপক হারে পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ায় গতবছর প্রথমবারের মতো বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ১১ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। মোট ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। তবে গত সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজর ২৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ২২ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমিয়ে ফেলেছে ব্যাংকগুলো। তবে আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ৪২০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করায় খেলাপি ঋণ কমে এসেছে। ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক

৩২ শতাংশ, আগের প্রান্তিকে যা ছিল ১১ দশমিক ৯৯। এ খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ ছাড়ে পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সুবিধা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

সূত্র জানায়, গত বছরের শুরুতে নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না বলে ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ জন্য প্রথমে আন্তর্জাতিক মানের খেলাপি নীতিমালায় শিথিলতা আনা হয়। আগে ৩ মাস অনাদায়ী থাকলেই তা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করতে হতো। এটি সংশোধন করে ৬ মাস এবং সর্বোচ্চ ১২ মাস করা হয়। অন্যদিকে খেলাপিদের গণছাড় দিতে বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালা জারি করা হয়। গত বছরের মে মাসে জারি করা এক সার্কুলারে বলা হয়, ঋণখেলাপিরা মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের মেয়াদে মাত্র ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। আবার নতুন করে যারা ঋণ নেবেন তাদের জন্য নয়-ছয় জোর করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইতোমধ্যে আমানতকারীদের সুদহার ৬ এবং ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। গণছাড়ের আওতায় ১৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নবায়ন করেছে ব্যাংকগুলো। যার অর্ধেকই করেছে সরকারি ব্যাংকগুলো। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েও গত বছর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫২ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে বিপুল পরিমাণ ঋণ অবলোপন করেছে ব্যাংকগুলো। তবে পুনঃতফসিল ও অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ এখনো জানা যায়নি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ছাড় দিয়ে পুনঃতফসিল ও অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো হয়েছে। এতে ব্যাংকের সাময়িক লাভ হলেও কাঠামোগত দুর্বলতা থেকেই যাচ্ছে। খাতা-কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখানো যাচ্ছে কিন্তু অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলো আরও প্রবল হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য অনাদায়ী ঋণের আদায় বাড়াতে হবে। নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। যাচাই-বাছাই করে ভালো উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে হবে। খারাপ উদ্যোক্তা যারা ঋণের টাকা আত্মসাৎ করেছেন তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন এ অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিতরণ করা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২৪ শতাংশ বা ৪৩ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। আগের বছর ১ লাখ ৬২ হাজার ৫২০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ৪৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। গত বছর শেষে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৪৪ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণকৃত ৭ লাখ ৬৩ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা ঋণের ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আগের বছর খেলাপি ঋণ ছিল ৩৮ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। অনেক বছর ধরেই খাতওয়ারী হিসেবে সরকারি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ বেশি ছিল। কিন্তু গতবছর বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ২ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত তিন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৫৯ কোটি টাকা; আগের বছর যা ছিল ৪ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা।

২০১৫ সালে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। সে হিসাবে পাঁচ বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। পরের বছর তা আরও বেড়ে হয় ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। আলোচ্য বছরগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ ছিল ২০১৮ সালে। গত বছর বিপুল পরিমাণ ছাড় দেওয়ার কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪২০ কোটি টাকা। তার আগের বছর খেলাপি ঋণ বাড়ে ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে খেলাপি ঋণ বাড়ে ১২ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। আর ২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বাড়ে ২০১৬ সালে।